প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতে জনসংখ্যা উর্বরতা ও জন্মহার হ্রাসে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

রাশিদ রিয়াজ : দিল্লিতে ‘ফার্টিলিটি রেট’ ১.৬, মুম্বাইয়ে ১.৫, হায়দ্রাবাদে ১.৮, পুনেতে ১.৭ ও চেন্নাইতে ১.৪ শতাংশ, পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে এ হার ১.৭ শতাংশ হলেও কোলকাতায় এ হার নেমেছে ১ শতাংশে। ভারতের গবেষক, জনসংখ্যা ও সমাজ বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন ‘উৎকণ্ঠার ঘন্টা বাজছে’। তারা এ জন্যে দায়ী করেছেন উচ্চাকাঙ্খা, আর্থিক চাপ ও গর্ভনিরোধক ব্যবহার বৃদ্ধিকে। গত তিন দশক ধরে কোলকাতায় ‘ফার্টিলিটি রেট’ হ্রাস পাচ্ছে, শুধু ২০১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছিল ১.৪ শতাংশে। এমনকি জন্মহার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। দি প্রিন্ট

ভারতের স্বাস্থ্য শুমারি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পরিসংখ্যান বলছে ৪৪ লাখ জনসংখ্যার কোলকাতায় গত বছর ৪২ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। কোলকাতায় জন্মনিরোধক ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭.৫ শতাংশ যা ২০১৫-১৬ সালের চিত্র থেকে ৩ শতাংশ বেশি। ভারতের গ্রামীণ জনসংখ্যার মাঝে জন্মনিরোধক ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ, যা ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের আর্থিক সহায়তায় গবেষণা করছেন অধ্যাপক শ্বাশত ঘোষ, তিনি বলেন গত ৩০ বছর ধরে কোলকাতার নারীদের মধ্যে উর্বরতা ও সন্তাজন জন্মদানের হার উভয়ই কমছে। বিষয়টি রীতিমত উদ্বেগজনক। সন্তান নিতে অনীহা দম্পতিদের মধ্যে অন্যতম এক প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অভিজাত ও শিক্ষিত দম্পতিদের মধ্যে এ অনীহা সর্বাধিক। ৪০ বছর আগেও কোলকাতায় ফার্টিলিটি রেট ছিল ২.২ শতাংশ। কিন্তু এ নিয়ে সামাজিকভাবে দম্পতির মধ্যে সন্তান নেওয়ার জন্যে কোনো আগ্রহ সৃষ্টির সুযোগ নেই। ১৯৪৭-৪৮ সালের দিকে কোলকাতার ৩০ শতাংশ শিক্ষিত দম্পতি জন্মনিরোধক ব্যবহার করত। শাশ্বত ঘোষ বলেন পশ্চিমা ধ্যান ধারণার প্রভাব, শিক্ষা, উদার চিন্তাধারণার কারণে সন্তান জন্মদানে খুব একটা উৎসাহ বোধ করেন না কোলকাতার দম্পতিরা। তাছাড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের একটা প্রভাব তো রয়েছেই। এর পাশাপাশি রয়েছে ওলন্দাজ ও ফরাসিদেরও প্রভাব। কিন্তু এখন অভিজাত, অভিজাত নয়, শহুরে, গ্রামীণ, হিন্দু ও মুসলিম দম্পতিরা নির্বিশেষে বিষয়টি নিয়ে চোখে ঝাপসা দেখছেন। তাদের জন্মহার ও উর্বরতার হার দুই ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। ভারতের স্যাম্পল রেজিষ্ট্রেশন সিস্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিম বাংলা রয়েছে জন্মহার ১৫ শতাংশেরও নিচে। যা এখন ১৪.৯ শতাংশ। তামিল নাড়ুতে তা সাড়ে ১৪ ও পাঞ্চাবে ১৪.৭ শতাংশ।

ভারতের সামাজিক বিজ্ঞানীরা বলছেন জন্মহার ও জনসংখ্যার উর্বরতার হার একটি অপরিশোধিত পরিমাপ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং বছরে প্রতি হাজার জনসংখ্যার জীবিত জন্মের সংখ্যা জানান দেয়। অথচ সর্বভারতীয় স্তরে জন্মের হার গত চার দশকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে যা ১৯৭১ সালে ৩৬.৯ থেকে ২০১৯ সালে ১৯.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গ্রামীণ-শহুরে পার্থক্যও এক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। গত চার দশকে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় জন্মের হার অবশ্য কিছুটা হলেও বেড়েছে।

বেঙ্গল ডিরেক্টর অব হেলথ সার্ভিসের অজয় চক্রবর্তী বলেন, সারা বাংলায় জন্মহার এবং প্রজনন হার কমার জন্য বেশ কিছু কারণ রয়েছে। জন্মহারে গ্রামীণ ও শহুরে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যে স্বতন্ত্র পার্থক্য ছিল তা এখন লোপ পাচ্ছে। এর কারণ বাঙালিরা সন্তানের গুণমান এবং পরিমাণের মধ্যে সচেতন প্রবণতার একটা মাপকাঠি খুঁজছেন। বাঙালী সমাজে ছেলেদের জন্য কোন প্রকাশ্য পছন্দ ছিল না, যা প্রায়ই ভারতের উত্তরের রাজ্যগুলিতে একটি দম্পতিকে আরও সন্তানের জন্ম দিতে বাধ্য করে এমন নয়। ভারতের ওসব প্রদেশের চেয়ে পশ্চিমবাংলায় নারী ভ্রুণহত্যা কম এবং একটি গড়পড়তা বাঙালি পরিবার কন্যাসন্তান লালন-পালনের ধারণার প্রতি বিরূপ নয়। তবে প্রাথমিক কারণ হল আয় ও আর্থিক চাপ কমে যাওয়া। পশ্চিম বাংলা বেকারত্ব, চাকরি হারানোয় ভুগছে, যখন বেশিরভাগ গ্রামীণ পরিবার সরকারি সহায়তায় বেঁচে আছে। কৃষি সম্পূর্ণরূপে অলাভজনক হয়ে উঠেছে, এবং রাজ্যের জমির ধারণক্ষমতা ব্যাপকভাবে খণ্ডিত। গ্রামীণ জনসংখ্যার জন্য এক বা সর্বাধিক দুটি শিশু বেছে নেওয়ার এই কারণগুলির দিকে ইঙ্গিত করেন অধ্যাপক শ্বাশত ঘোষ।

ভারতে দেখা যাচ্ছে উর্বরতার হার হিন্দুদের মধ্যে ৩.১ থেকে ২.১ এবং মুসলমানদের মধ্যে ৪.১ থেকে ২.৭ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে – প্রতি নারীর ক্ষেত্রে যা ১.৪ শতাংশ শিশুর পতন বা সে আর পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। ভারতের সমস্ত দক্ষিণের রাজ্যগুলি ছাড়াও, বেশিরভাগ উত্তর-পশ্চিম রাজ্য এবং পূর্ব রাজ্যগুলি ২০১১ সালে সামগ্রিক স্তরে জন্মহার বৃদ্ধির ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, গুজরাট, কর্ণাটক এবং কেরালার মতো বেশ কয়েকটি রাজ্য রয়েছে, যেখানে মুসলমানদের মধ্যে উর্বরতার হার বেশ কিছুটা বৃদ্ধির দিকে। কিন্তু হরিয়ানা, আসাম, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খন্ডের মতো রাজ্যগুলিতেও মুসলিম নারীর প্রতি সন্তানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে (নারী প্রতি প্রায় দুইটি শিশু)।

ভারতের এক সিনিয়র গবেষক কাকলি দাস, যিনি বিগত চার বছর ধরে বাংলার গ্রামীণ নারীদের মধ্যে উর্বরতা হ্রাস নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বলেছেন একটি কারণ হল যে বাংলার গ্রামীণ নারীদের মধ্যে কাজের অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো ছাড়াও, গর্ভনিরোধের সরঞ্জামগুলিও সহজলভ্য ও কার্যকর হয়েছে। গ্রামীণ নারীরাও তাদের দারিদ্র্য এবং এই ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে একটি মানসম্পন্ন সন্তান লালন-পালনের অক্ষমতা নিয়ে আজকাল যথেষ্ট ভাবেন ।

সর্বাধিক পঠিত