প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অজয় দাশগুপ্ত: শেখ রাসেল ‘বেদনার লাল গোলাপ’

অজয় দাশগুপ্ত, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে: দেশের এই পরিবেশে অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগী হওয়া কঠিন। তারপর ও কিছু এমন দিন থাকে যখন চুপ থাকা যায় না। পঁচাত্তরের কালরাতে কী ঘটেছিলো তা বলার দরকার দেখি না আর। দুনিয়ার বহু দেশে সামরিক ক্যু হয়। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী নিহত হন। পরিবারসহ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে নানা দেশে। কিন্তু এমন নৃশংস ঘটনা বিরল। সে রাতে আর সবার সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলো ছোট রাসেল। এই ছেলেটির বুদ্ধিও ফোটেনি তখন। বাড়িতে প্রচণ্ড গোলাগুলি ঢুকে গেছে নরখাদক ঘাতকের দল। বন্দুক, মেশিনগান হাতে তারা সারা ঘরময় দাপটে ঘুরছিলো। যখন এই বাচ্চাটিকে তারা ধরেছিলো নিরীহ শিশু অবোধের মতো বলেছিলো তাকে যেন তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মাতো তখন রক্তে ভিজে পড়ে আছেন। তার প্রতাপশালী পিতা জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু তখন মৃত। পড়ে আছেন সিঁড়িতে উপুড় হয়ে। নিয়তির এই খেলায় অসহায় শিশুটি বাঁচতে চেয়েছিলো। জানতে চেয়েছিলো, তারা তাকে মারবে কিনা?

ঘাতকের দল ব্যঙ্গ করে বলেছিলো চল তোকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই। মায়ের কাছেই নিয়ে গিয়েছিলো তারা। তবে আত্মার টানে। মা-পুত্র সবাই তখন রক্তের স্রোতে ভাসমান। শেখ রাসেল বাঁচতে পারেনি। ঘাতকরা কোন আশঙ্কা থেকে সবাইকে হত্যা করেছিলো সেটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। তাদের ধারণা ছিলো, পরিবারের একজন পুরুষ সদস্য থাকলেও দেশের পরিবেশ অন্য ধরনের হয়ে যাবে। আর একটা অসৎ বুদ্ধি হয়তো কাজ করেছিলো যে, কোনোকালে যেন এ পরিবারের কেউ আর দেশ শাসন করতে না পারে। কিন্তু সে আক্রোশ কাজে লাগেনি। তাদের অশুভ অপচেষ্টা বংশ নির্বংশ করলেও আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসছিলো সময়। সময় জানে কে কখন কোথায় কার জন্য সবুর করে থাকে। সময়ের হাত ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা এলো দেশ শাসনে। যে কারণে আজ শেখ রাসেলকে নিয়েও চলে আহাজারি আর বন্দনা।

শেখ রাসেল মূলত একটা বেদনার নাম। আমার মনে হয় তাকে নিয়ে স্বার্থ আর ধান্দা করা অনুচিত। আজকাল কিন্তু সে প্লাবনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আসল রাসেল। যে রাসেল একজন শিশু উদীয়মান একটি বালক তাকে কিনা এভাবে মারা হলো। এই ঘটনাটা যদি সেভাবে প্রকাশ পেতো বা রাসেল যদি বেদনার প্রতীক হতে পারতো সমাজে শিশুদের ওপর অত্যাচার বলৎকার নির্যাতন বন্ধ হতো। শিশু রাসেল হত্যার বিচার হয়েছে আজ। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। রাসেলকে মারা হয়েছিলো গুলিতে। এখন সেভাবে মারা যায় না বটে তাদের ভবিষ্যৎ ও আশা মেরে ফেলা হয়। সচরাচর শিশু মানেই অবহেলা আর নির্যাতনের শিকার। রাসেলের জন্মদিনকে দেশে শিশুদের জন্য একটা বিশেষ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদযাপনও করা হয়। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সবকিছু যখন প্রশ্নবিদ্ধ তখন রাসেলকে নিয়ে মহতী আন্তরিক উদ্যোগ ও বিবেচনা করতে হবে যত্নসহকারে। রাসেলকে যে যেভাবেই দেখুক না কেন সে মূলত বেদনা আর ত্যাগের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রীর ছোট ভাই অকাল প্রয়াত। তিনি দেখবেন স্নেহ ও মমতায়। মায়ের মতো করে।

তিনি তাঁর বইতে লিখেছেন : ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইতো না। খুবই কান্নাকাটি করতো। তাকে বোঝানো হয়েছিলো যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা তাকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো। রাসেল, রাসেল তুমি কোথায়? রাসেলকে মা ডাকে, আসো, খাবে না, খেতে আসো। মা মা মা, তুমি কোথায় মা? মা যে কোথায় গেলো- মাকে ছাড়া রাসেল যে ঘুমাতে চায় না ঘুমের সময় মায়ের গলা ধরে ঘুমাতে হবে। মাকে ও মা বলে যেমন ডাক দিতো, আবার সময় সময় আব্বা বলেও ডাকতো। আব্বা তার জন্মের পরপরই জেলে চলে গেলেন।

৬ দফা দেওয়ার কারণে আব্বাকে বন্দী করলো পাকিস্তানি শাসকরা। রাসেলের বয়স তখন মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি। কাজেই তার তো সব কিছু ভালোভাবে চেনার বা জানারও সময় হয়নি। রাসেল আমাদের সবার বড় আদরের, সবার ছোট বলে তার আদরের কোনো সীমা নেই। আমাদের দেখতে হবে মানবিক দৃষ্টিকোণে। আমাদের মনে রাখা দরকার এ দেশে যেন আর কোনোদিন রাসেলের মতো কাউকে প্রাণ হারাতে না হয়। শেখ রাসেল এখন বেঁচে থাকলে বর্তমান বাংলাদেশের বদলে যাওয়া চরিত্রে কী আদৌ খুশি হতো? ওপার থেকেও কি সে বিস্ময় আর হতাশায় দেখছে না তাদের রক্তে ভাসা দেশে আবার অনাচার আর রক্তের হোলিখেলা? জন্মদিনে রাসেলের জন্য বেদনামাখা ভালোবাসা। লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত