প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডিজিটাল সুদের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ চীনে,‘র‌্যাপিড ক্যাশে’র ফাঁদে অসংখ্য গ্রাহক

নিউজ ডেস্ক : প্রথমে ফেসবুক পেজে ‘ঋণ’ দেওয়ার কথা বলে শুরু হয় প্রচারণা। পেজের অ্যাডমিনরা নিজেরাই ‘ঋণদাতা’ ও ‘ঋণগ্রহিতা’ সেজে প্রশংসামূলক কমেন্ট করতে থাকে পোস্টগুলোতে। দেওয়া হয় অ্যাপসের লিংক। অনেকেই ঋণ নেওয়ার আগ্রহ দেখান। ইন্সস্টল করেন অ্যাপসগুলো। তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় কাগজপত্র, এনআইডিসহ ব্যক্তিগত নানা তথ্য।

ঋণ দেবে ২ হাজার টাকা। ৭ দিন পর ফেরত দিতে হবে ২ হাজার ৫ টাকা। মাত্র ৫ টাকা সুদ দিতে হবে জেনে অনেকেই রেজিস্ট্রেশন করেছেন ‘র‌্যাপিড ক্যাশ’ নামে একটি অনলাইন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের অ্যাপে। নিবন্ধনকারীদের অধিকাংশই আবেদন করছেন সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা ঋণের জন্য।.

তবে মোবাইলে ঋণের টাকা জমা হওয়ার বার্তা আসার পরেই চিন্তা শুরু হয় গ্রাহকের। ২ হাজার টাকার পরিবর্তে টাকা আসে ১৬৮৫। ৭ দিনের মধ্যে ১৬৮৫ টাকার বিপরীতে জমা দিতে হবে ২০০৫ টাকা। না দিতে পারলে সুদ প্রতিদিন ১০০ টাকা। এক মাস পর থেকে সুদ প্রতিদিন ২০০ টাকা। এর এক সপ্তাহ পর থেকে সুদ ৪০০ টাকা।

এদের কেউ চড়া সুদে ঋণ পান, কেউ পান না। কিন্তু অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল মাইক্রোফাইন্যান্সের এই প্রক্রিয়া দেশে সম্পূর্ণ অবৈধ। তারপরও এমন কিছু পেজ ও অ্যাপস সচল আছে দেশে। যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও সার্ভার রয়েছে চীনে।

দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে দীর্ঘদিন এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে। ধারণা করা হচ্ছে এতে প্রতারিত হয়েছে অন্তত ৭ লাখ মানুষ।

এমনই এক চক্রের পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গ্রেফতারকৃতরা হলো ইমানুয়েল এডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান, শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব, শুভ গোমেজ ও মো. আকরাম। গত ৫ ও ৬ অক্টোবর রাজধানীর ধানমন্ডি, বনানী ও মিরপুর এলাকা হতে এদের গ্রেফতার করে গোয়েন্দাদের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। তাদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ‘করোনাকালীন কর্মহীন মানুষদের বিনা জামানতে ঋণ প্রদানের লোভ দেখিয়ে আসছে অ্যাপসভিত্তিক অবৈধ ঋণ প্রদানকারীরা। অ্যাপসের মাধ্যমে কৌশলে ঋণগ্রহিতাদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। এসব ডকুমেন্টস দিয়ে পরে ভয়ভীতিও দেখানো হয়। ঋণের বিপরীতে আদায় করা হয় মাত্রাতিরিক্ত টাকা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মেজবাউল হক জানায়, আইন অনুযায়ী গ্রাহকের আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের কোনো কার্যক্রম করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়। র‌্যাপিড ক্যাশ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের লাইসেন্স দেয়নি।

যাচাই করে দেখা গেছে, নির্ধারিত দিনে গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বা আরও কিছুদিন টাকা দিতে না পারলে শতকরা হিসেবে বার্ষিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেয় র‌্যাপিড ক্যাশ। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সুদ হারের প্রায় সাড়ে ৫ গুণ বেশি। এছাড়া ভ্যাটসহ আবেদন প্রক্রিয়াকরণের নামে তারা যে ফি নিচ্ছে তা বৈধ কোনো ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নেয় না।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার জানান, অবৈধভাবে ওরা গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করেছে। গ্রাহকরা অ্যাপসগুলো ইন্সটল করলেই সেগুলো মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও ধারণ, কনটাক্টস, লোকেশন, স্ট্যাটাস, মেসেজ সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে নিতো। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য পড়ে যেতো চরম নিরাপত্তা হুমকিতে।

তিনি আরও জানান, ‘গ্রেফতারকৃতরা সরকারি অনুমোদন ছাড়া থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড, নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতো।’

গ্রাহকদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে র‌্যাপিড ক্যাশ

আশরাফুল আলম নামে একজন গ্রাহক বলেন, ‘আমি র‌্যাপিড ক্যাশ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে নির্ধারিত সময় পরিশোধ করতে পারিনি। ৭৬ দিন পর তারা আমাকে ৮১৯৬ টাকা পরিশোধের ম্যাসেজ পাঠায়। অথচ ঋণ নেওয়ার সময় অতিরিক্ত সুদের বিষয়ে কিছু জানায়নি। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা আমাদের সামাজিকভাবে হয়রানি করছে। আমার দুই জিম্মাদারসহ বাবা-মা ও পরিবারের বেশ কয়েকজনকে ফোন দিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করছে।’

শাহানা বেগম নামে আরেক গ্রাহক বলেন, আমার ৩ হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে ৩০ দিনের সুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকার মতো। আগে থেকে আমাকে এ বিষয়ে কিছুই বলেনি। আমি তাদের বলেছি এত টাকা দিতে পারব না। তখন তাদের একজন আমাকে ফোন করে বলে, ‘যারা টাকা দেবে না তাদের জন্য অন্য ব্যবস্থা আছে।’

প্রতারিত প্রায় সাত লাখ

গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যে জানা গেলো, তাদের সুদসংক্রান্ত অ্যাপসগুলোর মধ্যে রয়েছে- টাকাওয়ালা (পার্সোনাল লোনস অনলাইন), র‍্যাপিডক্যাশ, আমার ক্যাশ, ক্যাশ ক্যাশ, স্বাধীনসহ আরও কিছু। এসব অ্যাপস ডাউনলোড হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত। এরমধ্যে র‌্যাপিড ক্যাশ ডাউনলোড হয়েছে অন্তত দশ লাখবার। ঋণ নেওয়ার জন্য যারা এগুলো ডাউনলোড করেছেন, তাদের সবার ব্যক্তিদের তথ্য চীনাদের হাতে ইতোমধ্যে চলে গেছে। তাদের অনেকের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি ঋণ। দেশে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন অন্তত সাত লাখ মানুষ।

সুদ না দিলেই হুমকি

চক্রটি এরইমধ্যে অনেককে ঋণ দিয়েছিল। বিনিময়ে চড়া সুদ না দিলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিতো। গ্রাহক তিন হাজার টাকার জন্য আবেদন করলে প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা কাটা হতো। দেওয়া হতো ২১৯০ টাকা। সাত দিন শেষেই গ্রাহককে পরিশোধ করতে হতো ৩,০১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন উচ্চহারে সুদও দিতে হতো। এ ছাড়াও অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা ও ভ্যাটের নামে ১৫ টাকা কেটে রাখতো ওরা।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুক্তভোগী গ্রাহক। জিডিতে ওই গ্রাহক উল্লেখ করেন, র‌্যাপিড ক্যাশ থেকে ফোন করে আমার কাছ থেকে সুদ হিসেবে যথাক্রমে ২৫০০, ৩৫০০ এবং সর্বশেষ ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় তারা আমার মোবাইলের অ্যাকসেস নিয়ে আমার স্ত্রী, মা ও বাবাকে ফোন দিয়ে হেনস্তা করেছে।আমার শ্বশুরকে ফোন করে ৭৮ হাজার টাকা দাবি করেছে। সর্বশেষ তারা আমাকে খুন করে আমার স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

গুলশান থানা সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকমাস ধরেই বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটের বিরুদ্ধে টাকা ফেরত না দেওয়াসহ প্রতারণা ও হুমকি দেওয়ার বহু জিডি ও মামলা হচ্ছে। সেগুলোর তদন্তভার ডিবি ও সিআইডিকে দেওয়া হচ্ছে। থানা পুলিশের কাছে প্রাযুক্তিক সক্ষমতা না থাকায় সাধারণত এগুলো তদন্ত করা হয় না। এই জিডির ক্ষেত্রেও এমনটিই হয়েছে।

র‌্যাপিড ক্যাশের বিরুদ্ধে জিডির তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই বায়েজীদ বোস্তামি। তিনি বলেন, ‘আমরা জিডির তথ্য ও অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করছি।’

এখনও সক্রিয় ডিজিটাল সুদ কারবারীরা

‘স্বাধীন’ নামের একটি অ্যাপস ও পেজ থেকে ঋণ দেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হতো। পেজটির অ্যাডমিন মো. বখতিয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। পেজটিতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দেওয়া হয়েছে। ঋণ নিতে চাইলে ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। বখতিয়ারের ওই নম্বরে ফোন দিলে তিনি নিজেই রিসিভ করেন। তারপর জানান, ‘আমি আগে ঋণ দিতাম। এখন দেই না।’ এরপর তিনি কল কেটে দেন। এই ‘স্বাধীন’ নিয়েও সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে প্রতারণার অভিযোগ করেছেন অনেকে।

নজরদারিতে শতাধিক পেজ

ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শুরু করেছে ডিবি। গ্রেফতারকৃতদের চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। এমন আরও পেজ রয়েছে নজরদারিতে। হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে যাদের সম্পৃক্ততা পাবো, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেবো।’ বাংলাট্রিবিউন, ঢাকাপোস্ট

 

 

 

সর্বাধিক পঠিত