প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শোয়েব সর্বনাম: আমাদের সভ্যতার আইডেন্টিটি আমাদের রান্নায়, ভোজনে, স্বাদে

শোয়েব সর্বনাম: এ দেশে চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলাতে চাইনিজ খাবারের নামে যা বানিয়ে বেচে সেইটা দেখলে চাইনিজ লোকেরা ফিট হয়ে যেতে পারেন। এসব চাইনিজ আইটেম চায়না দূরে থাক, সারা দুনিয়ার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোনো সন্দেহ নেই খাবারগুলো সুস্বাদু, তবে তার একটাও চাইনিজ রেসিপি নয়। এই চায়না বুদ্ধি কার মাথা থেকে আসছে গবেষণার বিষয়। ঢাকার প্রথমদিকের চাইনিজ মৌচাকের চাংপাই রেস্টুরেন্টের আইডিয়া এটা আই গেজ। ব্রিটিশরা আমাদের চায়ের মধ্যে দুধ চিনি মিশায়ে চা খাওয়া শিখিয়েছে, তবে চায়ের এই রেসিপিটা তারা লগে করে নিয়েও গেছে। এখন লন্ডনের অভিজাত হোটেলগুলাতে ইংলিশ ব্রেকফাস্টে দুধ চিনি দেওয়া চা পরিবেশন করা হয়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দেখতাম মুড়ি দিয়ে চা খেতেন। তিনি একদিন বললেন, চায়ের স্বাদ যারা বুঝে ফেলে, তারা প্রথমেই চায়ের থেকে দুধটা বাদ দিয়ে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে চিনিটাও ফেলে দেয়। প্রকৃত চাখোর খাবে দুধ চিনি ছাড়া একদমই র চা।

আমরা যে চা খাই, সেটা হলো চায়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ভার্সনটা, এজন্য দুধ চিনি লাগে। ভালো ভালো চা এই দেশে উৎপাদিত হলেও চলে যায় বিদেশে, এতো দামি চা আমরা খাবো না। শেরাটন হোটেল নিয়ে আলাপে আড্ডায় কথা ওঠলেই গরিব লোকেরা বলবে, ওইখানে নাকি এক কাপ চায়ের দাম আড়াইশ টাকা, ওই চায়ের মধ্যে তারা কী দেয়? আমি খেয়ে দেখেছি, গরম পানি ছাড়া কিছুই দেয় না, তারা উন্নতমানের চাটুকুই শুধু দেয়। ওই চা আসলেই এক্সপেনসিভ। তো, এই পোস্টটা লিখতে চাচ্ছি খাবারের রেসিপি ও স্বাদ নিয়ে, স্পেশালি ইলিশের স্বাদ নিয়ে, যেটা বেশিরভাগ বাঙালি ভুলে গেছে। বাঙালি ভুলেই গেছে রান্না একটা শিল্প। তার কারণ আছে, কারণটা দুই প্যারা বাদে বলছি। আমি বিশেষভাবে দাবি করবো, রান্না শুধু শিল্প নয়, রান্না আমাদের সভ্যতা। সভ্যতা শব্দের অর্থটা ব্যাপক। মিসরের পিরামিড যেমন সভ্যতার নিদর্শন, বিশালত্ব তাদের সভ্যতার সিম্বল। গ্রিকদের সভ্যতার সিম্বল সৌন্দর্য, রোমানদের ঐশ্বর্য।

আমাদের সভ্যতার আইডেন্টিটি আমাদের রান্নায়, ভোজনে, স্বাদে। ইউরোপ যখন কাঁচা মাংস পুড়িয়ে খায়, তার বহু আগে থেকেই আমরা নানা পদের মসলা দিয়ে সুস্বাদু মাংস রান্না করি। ওই মসলার লোভেই তো তারা এ দেশে এসে ঢুকে পড়ে। রান্নার যে সভ্যতা সেটা আমাদের প্র্যাকটিস, এই চর্চা বহু আগে থেকেই উপমহাদেশের নারীরা করে আসছে। এ কথা মাথায় আসলে কিছুক্ষণ নারীবাদীদের গালাগালি করতে মনে চায়, সেটা কেন, তা নিয়ে পরে আলাদা পোস্ট দিয়ে করবো। তো যা হোক, সম্প্রতি আমি খুঁজে দেখছি, পৃথিবীতে আর কোনো রুই মাছ অবশিষ্ট নেই। সব রুই মাছ হাইব্রিড হয়ে গেছে। পাঙ্গাশ, কৈ, শিং, মাগুর এভরিথিং হ্যাজ বিলুপ্ত। এখন দেশের সকল মাছের স্বাদই এক। সকল সবজির স্বাদ এক। লাউ আর চালকুমড়া রান্ধার পর স্বাদে আর আলাদা করা যাবে না। সকল ফলের স্বাদ এক। বাঙ্গি আর পেঁপে দেখতে দুই রকম, স্মেল কিছুটা আলাদা, অথচ না জেনে খাইলে আলাদা করা যাবে না দুইটার স্বাদই এক। লাস্ট কবে একটা অথেনটিক কলা খেয়েছেন কে মনে করতে পারেন? ফলে এগুলো এখন যতো রেসিপি দিয়েই রান্ধেন কোনো লাভ নেই।
শুধু ইলিশ মাছটা এখনো খাঁটি আছে, যেহেতু চাষবাস করা যাচ্ছে না। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কীভাবে পুকুরে ধরে এনে এই ইলিশ মাছের গুয়াটা মেরে দেওয়া যায়। এখন ইলিশ রান্নার হাজার হাজার রেসিপি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। সবগুলোই ভুয়া। হুমায়ূন আহমেদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মুঘলরা ইলিশ খেতে পায়নি বলে ইলিশের ভালো ভালো রেসিপি থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের অনেক রেসিপিই মুঘলরা বানিয়ে দিয়ে গেছে, তার বেশিরভাগই মাংসের। সেই ধারাবাহিকতায় সকল আমিষের একই রেসিপি, আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ আর পেঁয়াজ। আদা একটা অতি সুস্বাদু মসলা। বেহেশতে ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক হিসেবে আদার রস সার্ভ করা হবে ধর্মগ্রন্থে বলা আছে। অ্যালকোহল ফ্রি জিনজার বিয়ার সারা দুনিয়াতে জনপ্রিয়। তাই বলে দুনিয়ার সব কিছুর মধ্যে আদা মেরে দেওয়ার তো কিছু নেই। আমরা এখন কমন রেসিপি বানিয়ে ফেলছি, সব রান্নাতেই আদা রসুন বাটা, হলুদ মরিচ গুঁড়া, পেঁয়াজকুঁচি আর জিরা।

এখন আবার নতুন আমদানি হয়েছে টমেটো। সব তরকারির ভিতরে টমেটো, তার মানেটা কী? তার একটা মানে পেয়েছি গতকালকে ব্রাত্য রাইসুর পোস্টে। সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদ থিওরি তিনি সিম্পলি ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন ভাতের সঙ্গে সকল তরকারি মাখিয়ে খাওয়ার এক্সামপল দিয়ে। এই টমেটোকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ বানিয়ে দিয়েছেন এখনকার রাঁধুনিরা, পারলে দুধভাতের সঙ্গেও টমেটো মাখিয়ে খায়। কথা হচ্ছিলো ইলিশ নিয়ে। ইলিশে তীব্র স্মেল হয়। কিচেনে ইলিশ কাটার সময় সারাটা ঘর গন্ধে ভরে যায়। তার সঙ্গে যদি আদা, রসুন, জিরা, ধনেপাতা এর যেকোনো একটা ইউজ করেন তাহলেই এর স্মেলটা শেষ। ইভেন লেবুও নেওয়া ঠিক নয়। লালের সঙ্গে সবুজ মাখিয়ে দিলে সেই কালারের কোনো বিউটি নেই। লালের সঙ্গে দিতে হবে হলুদ, তাতে একটা সুন্দর কমলা হবে। ইলিশের সঙ্গে দেওয়া যাবে কাঁচামরিচ কিংবা সরষে, আর কিছুই না। তখন স্মেলটা জমবে। ইলিশ খাওয়ার সময় ইলিশের স্বাদটা পাবেন। তবে আদা রসুন বেটে জিরা ধনেপাতা গরম মসলা পেস্তা জয়ফল জয়ত্রি জাফরান গোলাপজল দিয়েও ইলিশ রান্না করা যাবে, ওইটাতে মোগলাই টেস্ট পাবেন, খেতেও খারাপ লাগবে না, বাট ইলিশের স্বাদটা ওইখান থেকে গায়েব হয়ে যাবে। শিম ও ফুলকপির সঙ্গে রুই মাছে আলু দেবেন কিউব করে।

ট্যাঙরা মাছের সঙ্গে আলু কেটে দিতে হবে চিকন ও লম্বা করে, রান্না শেষে জিরা টেলে গুঁড়া করে ছড়ায়ে দিতে হবে ঝোলে। পোনা সাইজের নদীর উপরিভাগের মাছ, যেগুলো স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে, তাদের কাটা থাকবে নরম, সেগুলো খাবেন আলু ও বেগুনের চচ্চরি করে, রান্নার শুরুতেই আস্ত জিরা তেলে ভেজে নিতে হবে, সঙ্গে অন্যান্য ফোড়ন। একই মাছ যদি খাল থেকে ধরে আনা হয় সেটার কাঁটা তুলনামূলক শক্ত, ভুনা খেতে ভালো। মাগুর জাতীয় মাছের ভুনায় থাকবে আদা রসুনের পেস্ট, কারণ এই মাছটা আমিষভোজি। বড় সামুদ্রিক মাছ খাবেন বারবিকিউ, মাঝারিগুলো ডোবা তেলে ভেজে। একেক মাছের একেক রেসিপি, এটা দুই দিনে আসেনি। এর সঙ্গে হাজার বছরের জলবায়ু, আবহাওয়া, ইতিহাস ও সংস্কৃতি জড়িত। আবার ইলিশে ফিরে আসি। ইলিশ মানেই পদ্মার ইলিশ নয়। সুস্বাদু ইলিশ মানেই ডিমছাড়া ইলিশ নয়। বাজারে যেদিন সব ডিমভর্তি ইলিশ, তখন আপনি ডাবল দাম দিয়ে ডিমছাড়া ইলিশ কিনে আনছেন? আপনি ধরা খেয়েছেন। বর্ষার শুরুতে সুস্বাদু ইলিশটা খেতে চাইলে তখন কিনতে হবে ডিমছাড়া ইলিশ। তারা মাত্র সমুদ্রের বড় ঢেউ থেকে পদ্মায় এসে ঢুকছে, নদীর হালকা ঢেউতে পরিশ্রম কমে গেছে, নদীর পলি থেকে পুষ্টি এসে শরীরে চর্বি হয়েছে, ডিম আসবে পেটে। ওইটা দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু ইলিশ। ওইটার রেসিপি একরকম। এই মাছটা ভাপা ইলিশ, সরষে ইলিশ, সাদা ইলিশের জন্য পারফেক্ট। এর কিছুদিন পর ইলিশের পেটে ডিম আসবে, ছোট ডিমের ইলিশের স্বাদও অসাধারণ। ডিমসহ ইলিশও সুস্বাদু, ইলিশের ডিমটাই তো অমৃত।

যখন গুঁড়িবৃষ্টি হবে, তখন ইলিশ খাওয়ার সিজন, বাঙালিরা ইলিশ খাওয়া সিজনের নাম দিয়েছে ইলশে গুঁড়ি। ওই বৃষ্টিতে ইলিশ মাছেরা ডিম ছাড়ে। এই ডিমভর্তি ইলিশের রেসিপি আরেক রকম। ডিমটা আলাদা রান্না করে এই মাছটা করেন মিষ্টিকুমড়া দিয়ে মাখামাখা। ঝোলতরকারিমার্কা এভরিথিং, ভুনা কিংবা দোপেঁয়াজা। ডিম ছেড়ে দেওয়ার পর ইলিশে না থাকে চর্বি, না থাকে ডিম। তখন বাজারে ডিমসহ ইলিশ পাওয়া গেলে ওইটাই বেস্ট। বৃষ্টি চলে গেলে ডিমছাড়া ইলিশ একটা পানশে জিনিস। ওইটা শুকনা মরিচ দিয়ে ডোবা তেলে ভাজেন। অনেক বেয়াকুব সেই সিজনে ডাবল দাম দিয়ে ডিমছাড়া ইলিশ কিনে রাজ্যজয়ের ভঙ্গিতে বাড়ি ফেরে। এই সিজনে ইলিশ কিনতে হবে পদ্মার আশপাশে যেগুলো ছিটকে গেছে। দক্ষিণে গেলে রূপসা, মধুমতি, নবগঙ্গাতে কিছু যাযাবর ইলিশ দিকভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়ায়, সুন্দরবন জোনের আশপাশে, জোয়ারে নোনা পানি আর ভাটিতে মিঠা পানি আসে এমন সব নদী দিয়ে সাগরে ফেরার পথে পথে তাদের শরীরে কিছু বিচিত্র পলির স্বাদ জমা হয়। ওই ইলিশটা পাওয়া গেলে কচু দিয়ে ঝোল করে খাইয়েন, ইলিশ নিয়ে আরো দুই হাজার শব্দ লিখে দিলেও সেটার স্বাদ বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ইলিশ মাছ মূলত সামুদ্রিক মাছ। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে ঘোরে।
একেকটা ইলিশের ঝাঁক কয়েক কিলোমিটার লম্বা ও চওড়া হয়। জেলেরা অনেক সময় ভারে তুলতে না পেরে জাল কেটে মাছ ফেলে দেয়। সমুদ্রে যখন ইলিশের ঝাঁক আসে, তখন কয়েক কিলোমিটার এলাকা রূপালি রঙে চকচক করতে থাকে। দিনের পর দিন জেলেরা সমুদ্রে ঘুরতে থাকে সেই ঝাঁক পাওয়ার আশায়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো একবার ট্রলারে করে সেই ঝাঁক দেখার, বন্ড সই দিয়ে ওই জেলেদের ট্রলারে ওঠেছিলাম। তাদের ট্রলারে বড় একটা কড়াইতে তেল ফুটতে থাকে। মাছটা সাগর থেকে তুলে এক কোপে দুই ভাগ করে নোনা পানিতে একধোয়া দিয়েই তেলে ছেড়ে দেয়। সঙ্গে ফেনাভেজা ধোঁয়াওঠা আগুনগরম ভাত। মাছ ওঠার পরদিন থেকে যতোদিন সমুদ্রে, ততোদিন ওইটাই জেলেদের খাবার। ওই ভাজা ইলিশের স্বাদ আমি সারাজীবনে ভুলবো না। এবার একটা স্পেশাল রেসিপি দিই। জ্যাক ডেনিয়েল পছন্দ করেন এমন লোকেরা একদিন সন্ধ্যায় সালাদের বদলে পেঁয়াজ কুঁচি করে মুড়ি মাখিয়ে ভেজে নিন, জিনিসটা গরম খেতে হবে। তারপর ডোবা তেলে শুকনা মরিচ দিয়ে ভাজা হবে ইলিশ, হলুদ মরিচ লাগবে না। ইলিশের তেলে মুড়ি মাখিয়ে মচমচে ইলিশের সঙ্গে জ্যাক ড্যানিয়েলে চুমুক দেওয়ার সময়, বিশ্বাস করেন, আপনার আমার কথা মনে পড়বেই। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত