প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রফি হক : বাংলাদেশে কবি, লেখক ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব আছে।

রফি হক : বাংলাদেশে কবি, লেখক ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব আছে। সাতচল্লিশ উত্তর দেশবিভাগের সময়কালে পঞ্চাশের দশকে এ চিত্র ছিলো না। পশ্চিমা দেশের মতো ক্যাফে কেন্দ্রিক আড্ডা না থাকলেও রেস্টুরেন্ট কেন্দ্রিক আড্ডা ছিলো। গুলিস্তানে রেক্স হোটেল কিংবা বিউটি বোর্ডিং আড্ডা ছিলো। কবি লেখক সাংবাদিক মিউজিক ফিল্মের লোকেদের মধ্যে একটা ভাব বিনিময়ের কথা, আড্ডার কথা মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, বিজন চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, কাজী আব্দুল বাসেত, সৈয়দ শামসুল হক, মুর্তজা বশীরের মুখে শুনেছি। সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক আড্ডাতেও শিল্পী কবি লেখকদের যোগাযোগের একটা বিষয় ছিলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা উত্তরকালেও এ ধারাটি ছিলো। এমন কি পুরো আশির দশক জুড়েও ছিলো এই যোগাযোগ। কিন্তু এখন দেখি না। এখন দেখি— ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, ফাইভ স্টার হোটেল, অমুক হাই কমিশন, তমুক দূতাবাস ইত্যাদি। যেখানে স্পষ্টতই বিভাজন ধনী আর গরীবের। অথচ এই আমিই দেখেছি শামসুর রাহমানের জন্মদিন চারুকলার বকুল তলায়। এভাবে নির্মলেন্দু গুণ, আনিসুজ্জামান, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের জন্মদিন উদ্যাপনে সকলের অংশ নিতে। এই যে বিভাজন, যোগাযোগের অভাবে প্রধানত ও সূভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন শিল্পীরা এবং লেখকেরা। ফিল্ম ও অন্যান্য মাধ্যমের কথা না বলি। সাহিত্যে শিল্প ও ভাস্কর্যের গুণ দেখি না। অনেক ঝরঝরে লেখা পড়তেও কষ্ট হয় না। হুমায়ুন আহমেদের মতো। টর টর করে পড়ে ফেলা যায়। আগে একজন হুমায়ুন আহমেদ ছিলো, এখন দেখি অনেক হুমায়ুন।

বর্তমানের বেশিরভাগ লেখাতে পেইনটিংসের কোনো উপাদান বা স্কাল্পচারের থ্রি ডাইমেনশনাল ভল্যুম দেখি না। বেশির ভাগ লেখাতে অবজারভেশনের ব্যাপারও নেই। আবার চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে নতুন ধারা, নতুন দর্শন নেই। বিমূর্তধারা, আধা বিমূর্তধারা বা ফিগর কেন্দ্রিকধারা কোথাও কোনো নতুন দর্শন নেই। টেক্সচার, টেকনিক ইত্যাদি দক্ষতার চ‚ড়ান্ত আছে। যেন আঁশ আছে শাঁস নেই। সবার কথা বলছি না, বেশিরভাগই এমন । ১৯১৩ সালে ছাপা হয়েছিলো অ্যাপোলিনেয়ারের প্রবন্ধ, ‘দ্য কিউবিস্ট পেইন্টার’। তখন পাবলো পিকাসো ও জর্জ ব্রাক— দ’জনই অল্পখ্যাত। নাম-টাম খ্যাটি-ফ্যাতি হয়নি কারো। ব্রাক আর পিকাসো এই দুই বন্ধু মিলে চিত্রশিল্পে যে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন অ্যাপোলিনেয়ারের প্রবন্ধেই তা বিশদভাবে উঠে আসে। এবং যা শিল্প-সাহিত্যের লোকদের, চিত্রকলা সংগ্রাহক কিউরেটরদের কাছে মনোযোগযোগ্য হয়ে ওঠে। শেষবারের মতো প্যারিস ছেড়ে তাহিতি দ্বীপে চলে যাচ্ছেন পল গঁগ্যা। যাবার আগে প্যারিসে তার সমস্ত পেইন্টিং ও জিনিসপত্র নিলামে চড়িয়েছিলেন আহত অভিমানী গঁগ্যা— তখন গঁগ্যার ছবির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন মালার্মে। শিল্পী গঁগ্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে কবি মালার্মে সেই বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন,‘এত রং অথচ তবু এতো রহস্য’। কে জানতো তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দামে নিলামে বিক্রি হবে একদিন গঁগ্যার ছবিই। তার একটি ছবিই বিক্রি হয়েছে কয়েক বছর আগে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায়। ‘এতো রং তবু এতো রহস্য। ভাস্কর রদ্যাঁর প্রথম জীবনের দূর্বিপাকে সাহায্য করতে এসেছিলেন মালার্মে। জার্মানী থেকে রিলকেও এসেছিলেন রদ্যাঁর জীবনী লিখতে।

গত শতাব্দীর আগের শতাব্দীর শেষ দিকে চিত্রশিল্পে রিয়েলিজমের প্রসারে যখন তুমুল বাদ-প্রতিবাদ ওঠে, তখন এদুয়ার মানে’র স্বপক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন এমিল জোলো । কুরবে –এর সমর্থনে এসেছিলেন প্রুধোঁ এবং সাপফ্লেরি। দে’লাক্রোয়ার মৃত্যুর পর এক পত্রিকার সম্পাদকের কাছে বোদলেয়ার দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন। যা চিত্রশিল্পে ও সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছে। ফরাসি সংস্কৃতির সুবর্ণ যুগে সাহিত্য ও চিত্রকলায় কতোটা ঘনিষ্ঠ ছিলো লেখক কবি শিল্পীদের যোগাযোগ তা আমরা অনেকটা জানি। সিম্বলিজম : দাদাইজম : সুররিয়ালিজম এই আন্দোলনগুলো সাহিত্য ও চিত্রকলায় সমানভাবে অঙ্গাঙ্গী। ইপ্রশনিস্টদের থেকে আলাদাভাবে বোঝাবার জন্য যখন একসপ্রেশনিজমের জন্ম ফরাসি চিত্রশিল্পে, সেই এক্সপ্রেসনিজম্ই আবার ছবির বদলে সাহিত্যকে প্রভাবিত করলো জার্মানিতে। সাহিত্য ও শিল্পের এই মিলেমিশে থাকা পরবর্তী নতুন নতুন মতবাদগুলোতেও এসেছে নিবিড়ভাবে। সেখানে আঁদ্রে মলরো, আঁরি মিলো, রেনে শার, ইভ বেনফেলয়া তারা প্রত্যেকে ছিলেন শিল্পী ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ এবং সমালোচক। এখন, আমাদের দিকে যখন তাকাই তখন মন খারাপ হয়। আমাদের চিত্র সমালোচনা করেন কারা? নিউজপেপারের বারোয়ারি ফিচার এডিটর। আর যে নিউজ পেপারের আদতে কোনো মূল্যই নেই। তবু ছবি ছাপা হবে, খুব নাম হবে, লোকজন দেখবে আমরা শিল্পীরা তাই ই ভাবি। এই যে সস্তা নাম কামাবার অন্তসার শূন্য বিষয়টি কি একবারও ভেবেছি? উত্তর: না, ভাবিনি। আমি ভেবেছি, আরেকজনের পেপারে ছবি উঠে খুব নাম হয়েছে, আমারও হতে হবে। বারোয়ারি ফিচার এডিটর, নিউজের রিপোর্টার তারাই আমাদের দেশের শিল্পীদের কাছে পূজনীয়। যারা জীবনে কোনো সেরা কোনো মডার্ণ আর্ট মিউজিয়াম দেখেনি, যারা জীবনে কনটেম্পোরারি কোনো বিখ্যাত অরিজিন্যাল শিল্পকর্মই দেখেনি কাছ থেকে তারা করে শিল্পসমালোচনা। তো এদেশে আর্ট কিউরেটিং, মডার্ণ আর্ট গ্যালারি, কনটেম্পোরারি মডার্ণ আর্ট মিউজিয়াম কনসেপ্ট কী করে আসবে। আমি জানি আমাকে অনেকে গালাগালি করবেন, করুন।

গালাগালি শুনতে শুনতে, অপমাণিত আর বঞ্চিত হতে হতে এ পর্যন্ত এসেছি। সত্যিকার অর্থেই আমাদের শিল্পচর্চা হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। বিশেষ কোনো দর্শনের প্রকাশ করতে পারিনি। আমাদের দেশে একজন চিত্রশিল্পীর সার্থকতা বলতে কী বোঝায়? শিল্পীর ছবি কিছু অপরিমিত বিত্তবান বা বিত্তবতীরা কিনে নিয়ে যাবেন, অথবা বৈদেশিক দূতাবাসে বা সরকারি-বেসরকারি বড় কিছু প্রতিষ্ঠান রেখে দেবেন। কেউ সুরম্য হর্ম্যের অভ্যন্তর সুশোভিত করবেন কেউ সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে নিজের সংগ্রহে রাখবেন। এটিই কী শিল্পী ও শিল্পের সার্থকতা? এই ঊনিশ কুড়ি কোটি মানুষের দেশে এর বাইরে কিন্তু আর শিল্পীদের ছবি দেখার সুযোগ নেই। এতো বিশাল জনসংখ্যা, বিত্তবানও কম নেই। বিত্তের দিক দিয়ে তুলনায় অন্তত পঞ্চাশ লাখ মানুষ তো পেইন্টিং সংগ্রহের ক্ষমতা রাখেন। ছবি সংগ্রহ করেন মাত্র হাতে গোণা কয়েকজন। ইউরোপ আমেরিকাতে প্রতিটি ছোট শহরেও আছে: MoCA (Museum of Contemporary Art)। সবাই যে ছবি বোঝেন তা নয়। কিন্তু শহরের সবাই কম বেশি কাজের ফাঁকে মিউজিয়াম ভিজিট করেন। শিশুদের চিলড্রেন কর্ণার আছে।শিশুরা তাঁদের মতো মিউজিয়াম উপভোগ করে। ছবি আঁকে। একটা রুচি তৈরি হয়। তাতে নগরের বা শহরের ইজ্জত বাড়ে। চিত্রশিল্পেরও বিকাশ ঘটে। সাধারণ মানুষেরও বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম দেখার সুযোগ মেলে। আর ধরুন, আমাদের বিত্তবানেরা বিত্তবতীরা যাঁরা চিত্রকলা সংগ্রহ করছেন,তাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেটা নাও করতে পারে। তাই বাইরের দেশের সংগ্রহকেরা তাদের সংগ্রহের সবটা অথবা বড় একটি অংশ মিউজিয়ামকে দান করে যান। তাতে পেইন্টিং যতেœ থাকে। আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছায়। বহু মানুষ একসঙ্গে দেখতে পান। আর্ট কালেক্টর মানেই বিত্তবান হতে হবে, এ কোনো কথা নয়। এ একটা প্যাশন। পৃথিবীর একজন বিখ্যাত আর্ট কালেকটর ছিলেন পোস্ট অফিসের কেরানী মাত্র। তিনি হলেন মডার্ণ আর্টের বিরাট সংগ্রাহক । তিনি শিল্পীদের কাছ থেকে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ করতেন। তার সব সংগ্রহ মাত্র কয়েক বছর আগে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ণ আর্টে দান করে গেছেন। তার নাম ভোগেলস। ভাবুন, ভোগেল দম্পতি জীবনে একটি ছবিও বিক্রি করেননি।

ধরুন, বহু শিক্ষিত রুচিবান মানুষ ঢাকার বাইরে থাকেন। ছবি দেখার সুযোগ তাদেরও হয় না। ফলে কোনো স্বভাব দৃষ্টিও গড়ে ওঠে না। আমাদের যাকিছু তার সবই ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে যে বিশাল জনগোষ্ঠী আছে তাদেরকে ছবি দেখার সুযোগ করে দিতে হবে। এবং তা অবশ্যই আধুনিক মডার্ন কন্টেম্পোরারি আর্ট মিউজিয়ামের মাধ্যমে। আমাদের তরুণেরা আজকাল নতুন ধারায় কাজ করছে। আমি বলব, তারা নিজেদের সামর্থ ও চেষ্টায় যা কিছু করছে তার মূল্য কম না। তাদের উৎসাহের জায়গাটি আরও প্রসারিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে সঙ্গে আজকের তরুণদের আধুনিক চিত্রকলাকে আলোচনায় আনতে কবি সাহিত্যিকদের গুরুত্ব জরুরি। আজকের তরুণ শিল্পীদেরকেও কবি লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ নিবিড় করতে হবে। যোগাযোগ বাড়লে পরস্পরের জমে থাকা আড়ষ্টতাও কাটবে ধীরে ধীরে। আর পরস্পরের সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হলে তা আরও সুন্দর হবে। ভাবুন, অমুক তরুণ শিল্পীর কাজ নিয়ে ভাবছেন লিখছেন অমুক তরুণ কবি সাহিত্যিক। ভাবনার এই দৃশ্যটিই আনন্দের। ছবি : আনা পলিক্কফ এবং রফি হক। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত