প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মধ্যযুগীয় ইউরোপের যৌন প্রথা !

অনলাইন  ডেস্ক: পতিতাদের সমাজ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি, দেখবেও না। সমাজে যতোই নারী নিরাপদে থাকুক না কেন কিংবা সমাজ প্রণেতাদেরই সে ঘরে যাওয়া-আসা থাকুক আর নাই থাকুক আম জনতা পতিতাদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেবে না। সেটা প্রাগৈতাহাসিক যুগ হোক কী আজকের দিন কিংবা আগামীর কোন সময়, মানুষের রুচিবোধ পাল্টে যাবে না।

যে মানুষের দল দিন শেষে, রাতের আধাঁরে মনোরঞ্জণ খুঁজতে রঙ্গিন ঘরে পাড়ি দেয়, সেই তারাই দিনের আলো ফুটতে ছিঃ ছিঃ বলে সেই মেয়েদের ‘নষ্ট মানুষ’ বলে তাড়িয়ে দেয়।

তারপরেও পতিতাবৃত্তি চলবে সৃস্টির শেষ দিন অবদি। এ যে আদিম পেশা। না যায় ছাড়া, না যায় মানা!

মধ্যযুগীয় ইউরোপে পতিতাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। সেকালে, গির্জার যাজকেরা এ পেশা বন্ধ করতে কিংবা পতিতালয়ে না যেতে মানুষকে তেমন একটা বলতো না বলেই জানা যায়।

তাদের বিশ্বাস ছিল, যদি পুরুষদেরকে পতিতাদের সাথে মিলিত হতে মানা করা হয়, তাহলে এর ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। তারা ভাবতেন, এর ফলে পথব্রষ্ট সেসব পুরুষেরা আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে। সমাজে বেড়ে যাবে ধর্ষণের মতো অপরাধ। সম্ভ্রমহানির শিকার হবেন অভিজাত পরিবারের নারীরা এবং সর্বোপরি বেড়ে যাবে সমকামিতার হার। প্রথম যুক্তিটি আজ অবদি বলবৎ থাকলেও সমকামিতার বিষয়টি কিন্তু নিদেনপক্ষে অবান্তর।

তবে তাই বলে যৌনকর্মীরা নির্বিঘ্নে কাজ কারবার চালিয়ে যেতে পারত, ব্যাপারটা কিন্তু তাই ছিল না। তৎকালীন ইউরোপে যৌন ব্যবসার সাথে জড়িত নারীদের জন্য বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যাতে করে সমাজের চোখে তাদের নিম্ন মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এছাড়া তারা কেমন ধরনের পোশাক পরিধান করতে পারবে, সেটাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে করে সাধারণ নারীদের থেকে তাদেরকে সহজে আলাদা করা যায়।

পতিতা নারীরা সেকালেও শহরের নির্দিষ্ট কোনো এক জায়গায় থাকত। কোনোপ্রকার আইনী সহায়তা পাবার অধিকার তাদের ছিল না।

পতিতালয়গুলোও খোলাখুলিভাবে তাদের কাজ চালাতো না। সাধারণত বাথ হাউজ কিংবা শিল্পের দোকানের আড়ালে সেগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হতো।

 

যৌনতা সংক্রান্ত পাপের প্রায়শ্চিত্যকরণের উদ্দেশে তৎকালে নানাবিধ বিধানই প্রকাশিত হয়েছিল। এর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ থিওডোর অব টার্সাসের লেখা পিনিটেনশিয়াল থিওডোরি।

থিওডোরের বিধান অনুযায়ী, একজন পুরুষ অন্য কোনো পুরুষ কিংবা প্রাণীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে এজন্য তাকে ১০ বছর ধরে প্রায়শ্চিত্য করতে হবে।

অপরদিকে একজন নারী যদি অন্য কোনো নারীর সাথে এমন কাজে লিপ্ত হয়, তবে তাকে প্রায়শ্চিত্য করতে হবে তিন বছর পর্যন্ত।

একজন পুরুষ যদি হস্তমৈথুন করত, তবে পরবর্তী চার দিন তাকে মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হত। অন্যদিকে একজন নারীর বেলায় এই কাজের জন্য পওরো একবছর ধরে প্রায়শ্চিত্যের বিধান ছিল। এ বিধান ছিল কেবলমাত্র কুমারী ও বিধবাদের জন্য। বিবাহিত নারীরা এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে এর শাস্তি ছিল আরও কঠোর।

‘শারীরিক সম্পর্ক’ বিষয়টিকে বৈধতা হয় মূলত সামাজিক শৃঙ্খলতা টিকিয়ে রাখতে। যা প্রতিনিয়ত সংস্কার হতে বৈবাহিক বন্ধনের মতো আদি অথচ অমলিন এক বন্ধনের রুপ নেয়। সেই অর্থে ‘বিয়ে’ সম্পর্কটা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়।

মধ্যযুগীয় ইউরোপও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সেখানেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র এ সম্পর্ককে বৈবাহিক বন্ধনের দৃঢ়তার পেছনে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভাবা হতো। তবে দুজনের কেউ যদি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হত কিংবা সঙ্গীকে পরিতৃপ্ত করতে অক্ষম হত, তাহলে অপরজন আদালতে গিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারত!

এক্ষেত্রে স্বামী অক্ষম হলে তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হতো , তিনি এখনও একজন সক্ষম পুরুষ! নাহলে বিয়ে টিকতো না।

তৎকালীন ইউরোপে এরকম অনেকগুলো কাহিনীরই সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে নপুংসতার দরুন স্বামীকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।

এর মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাতটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১১৯৮ সালে। অভিযোগ আনা হয়েছিল ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারিনী ছিলেন ফিলিপের দ্বিতীয় স্ত্রী, যিনি একই সাথে ড্যানিশ রাজা ১ম ভ্যালডেমারের কন্যা ইঙ্গেবার্গ।

 

রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ

সেকালে, জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রথা চালুও ছিল। প্রাচীন রোম, গ্রিস, মিশর- সবখানেই নানা রকম পদ্ধতির কথা জানা যায়, যার সাহায্যে সেখানকার দম্পতিরা জন্মনিয়ন্ত্রণ করতো।ব্যতিক্রম ছিল না মধ্যযুগীয় ইউরোপও।

তবে এতদিন পর্যন্ত গবেষকদের ধারণা ছিল যে, মধ্যযুগে বোধহয় ইউরোপে জন্মনিয়ন্ত্রণের হার হ্রাস পেয়েছিল। কারণ সেকালে গির্জার যাজকেরা এ চর্চাকে বেশ খারাপ চোখেই দেখতেন। তাদের মতে, সন্তান হলো ঈশ্বরের উপহার।

আর বিয়ের আসল উদ্দেশও এটাই। এছাড়া উচ্চ শিশুমৃত্যু হারের কারণে নারীরাও জন্মনিয়ন্ত্রণে আগ্রহী ছিলেন না বলেই মনে করতেন গবেষকেরা।

 

জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ভালো চোখে দেখতো ধর্মীয় গুরুরা

 

তবে সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন গবেষণায় থেকে জানা গেছে, তৎকালে ৩০ বছরের উর্ধ্বে নারীদের মাঝে সন্তান জন্ম দেওয়ার হার বেশ কমে গিয়েছিল। এর অর্থ একটাই হতে পারে। তারা কোনো না কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রথার দ্বারস্থ হচ্ছিল।

তবে তারা ঠিক কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, সেই সম্পর্কে লিখিত তেমন কোনো দলিল নেই বললেই চলে। জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি গির্জার কঠোর বিরুদ্ধাচরণই এ দুষ্প্রাপ্যতার পেছনে মূল নিয়ামক বলে মনে করা হয়।

এসময় নারীরা যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করত, সেগুলো মূলত বিভিন্ন ধাত্রীদের মাধ্যমেই তারা শিখে নিত। বীর্যপাতের পূর্বে পুংজননাঙ্গ সরিয়ে নেওয়াও ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণেল একটি মাধ্যম। সেই সাথে উদ্ভিজ্জ নানা উপাদানের প্রতিও মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

মধ্যযুগীয় ইউরোপের সাথে যে কথাটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে,ত সেটা হলো ‘ডাইনি’, আরও ভালো করে বললে ‘ডাইনি নিধন’। এই ‘উইচ হান্ট’ তথা ডাইনি নিধনের পাল্লায় পড়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী।

তখনকার ইউরোপীয় সমাজে এতটাই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল যে, কারো মধ্যে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই তাকে ডাইনি বলে মনে করা হত। জোয়ান অব আর্কের মতো দুঃসাহসী যোদ্ধার এ আইনের কারণে হত্যার স্বীকার হয়েছিলেন।

১৪৮৪ সালে পোপ ৮ম ইনোসেন্ট উম্মিস ডিসাইডারেন্টস অ্যাফেক্টিবাস নামক অধ্যাদেশ জারি করে ডাইনিদের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে এবং তাদের শাস্তি দেওয়ার বিধান বলবৎ রাখলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়।

 

 

এর কিছুদিন পরে হেইনরিখ ক্রেমার নামক এক ধর্মসভার বিচারক ম্যালেয়াস ম্যালিফিকেরাম নামে একটি বই লেখেন, যা ডাকিনীবিদ্যা সংক্রান্ত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ বই বলে মানা হয়। সেখানে তিনি দাবি করেন, ক্যাথলিক বিশ্বাসের সবচেয়ে ক্ষতি করেছে ধাত্রীরা!

তিনি দাবি করেন, ধাত্রীরা তরুণীদেরকে শয়তানের সাথে যৌন মিলনে প্রলুব্ধ করে এবং ব্যাপ্টাইজ না হওয়া শিশুদের ডাকিনীবিদ্যার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়!

ক্রস-ড্রেসিং অর্থাৎ বিপরীত লিঙ্গের মতো পোশাক পরিধানের বিষয়টি অজকের বিশে^র অনেক জায়গাতেই যেখানে বাঁকা চোখ দেখা হয়, সেখানে মধ্যযুগে যে এটাকে আরো খারাপভাবেই দেখা হবে, তাতে খুব একটা আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে এই ক্রস-ড্রেসিংকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অবশ্য তারপরেও যে এটা থেমে গিয়েছিল তা বলার জো নেই।

 

 

কেননা ১৫ শতকে ইংল্যান্ডে ১৩ জনের মতো নারীর কথা জানা যায়, যারা ক্রস-ড্রেসিংয়ে অভ্যস্ত ছিলেন। একই চর্চা প্রচলিত ছিল পুরুষেদের মাঝেও।

অবশ্য অধিকাংশ ক্রস-ড্রেসাররাই আসলে ছিল দেহব্যসায়ী গোত্রের, যারা তাদের নিজেদের কিংবা সঙ্গীর মানসিক চাহিদা মেটাতেই অমন অদ্ভুত কাজটা করত।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত