প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বকৃত নোমান: লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো নিন্দা আমার গায়ে লাগে না

স্বকৃত নোমান : একদিন সাকুরা রেস্তোরাঁ ও বারে এক আড্ডাশেষে বের হওয়ার সময় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির হুইস্কিতে আসক্ত ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়া জনৈক লেখক আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘লেখার তো সময় পাই না, আমাকে দিয়ে আর বুঝি লেখা হবে না।’ আমার বোধের গভীরে বেজে উঠল একটা টঙ্কার। কেন তিনি লেখার সময় পান না? কেন তাকে দিয়ে লেখা হবে না? একজন ঔপন্যাসিকের জীবনধারা কেমন হওয়া উচিত? জীবনটাকে কীভাবে সাজালে এবং কোন নিয়ম-নীতি অনুসরণ করলে তিনি উপন্যাস লেখার মতো সময় বের করতে পারবেন?

বাসায় ফিরে লিখতে বসে গেলাম ঔপন্যাসিকের জীবনধারা নিয়ে, উপন্যাসশিল্পের একজন কর্মী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। প্রায় দেড় হাজার শব্দের প্রথম পর্বটি লিখে মধ্যরাতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে দেখি লেখাটিতে বিস্তর লাইক-কমেন্ট। শেয়ারও শতাধিক। অনেকে প্রশংসা করলেন এবং লেখাটি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিলেন। উৎসাহ পেয়ে লিখে ফেললাম দ্বিতীয় পর্ব। লেখা চলতে লাগল। একেকটি পর্ব লিখি আর ফেসবুকে পোস্ট করি। কেউ প্রশংসা করেন, কেউ নিন্দা করেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো নিন্দা আমার গায়ে লাগে না। আমার কাজ লেখা, বেঁচে আছি লেখার জন্যই, লিখতে পারি বলে জীবনটাকে অর্থপূর্ণ মনে হয়। বিষয় যা-ই হোক, আমাকে লিখে যেতে হবে। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শ এবং সপ্তাহে কমপক্ষে তিন হাজার শব্দ। বেশি লেখাকে আমি দোষণীয় মনে করি না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সংখ্যা এত বেশি যে, এক জীবনে পড়ে শেষ করা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, তরাশঙ্কর, মানিক, বিভূতির মতো লেখকগণও কম লেখেননি। বিপুল তাঁদের রচনা। লিখতে পারা একটা বড় ক্ষমতা। লিখে লিখে এই ক্ষমতার শাণ দিতে হয়, ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে তুলতে হয়। নিন্দা বরং আমার লেখাকে সুসংহত করে, আরো বেশি লেখার তাড়না তৈরি করে।

ঔপন্যাসিকের জীবনধারা নিয়ে এই লেখাগুলো ফেসবুকে পড়লেন মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজন শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। তাঁর সঙ্গে একদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তিনি এসব লেখার প্রশংসা করলেন এবং আরো বিস্তারিতভাবে লেখার পরামর্শ দিলেন। বেড়ে গেল উৎসাহ। চালিয়ে যেতে লাগলাম লেখা।

এরই মধ্যে আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে ভাইরাল হলো একটি ভিডিও, যেখানে বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুল অভিযোগ তুলেছেন আমি নাট্যকার সেলিম আল দীনের লেখা চুরি করেছি। আমার প্রথম উপন্যাস নাকি সেলিম আল দীনের লেখা! বাংলা ভিশন টেলিভিশনের অনেক পুরনো ভিডিও ক্লিপ। মেহেরুন্নেসার জীবৎকালে ভিডিওটি ফেসবুকে আসেনি, যেই না তিনি প্রয়াত হলেন অমনি নিন্দুকেরা সেটি ভাইরাল করে দিল। ক্লিপটির সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে হেনস্তা করতে লাগল তারা। তাদের মন্তব্য পড়ি আর হাসি। আহা বুদ্ধির মুক্তি না-ঘটা মানুষেরা! তারা বুঝতে পারে না গোলাপ আর কলমিফুলের সৌরভের ফারাক। কোনটা প্রখ্যাত সেলিম আল দীনের লেখা আর কোনটা অখ্যাত স্বকৃত নোমানের লেখা, তা তো সাহিত্যবোধসম্পন্ন যে কোনো পাঠকেরই বোঝার কথা। তখন মনে হলো, আচ্ছা, আমার উপন্যাসগুলো রচনার পেছনে তো লুকিয়ে আছে অনেক ঘটনা, অনেক গল্প; অল্প কজন বন্ধু ছাড়া যা আর কেউ জানে না। আমি তো লিখতে পারি বইগুলো রচনার সেসব ইতিবৃত্তও। শুরু করলাম লেখা।

ঔপন্যাসিকের জীবনধারা এবং উপন্যাস সম্পর্কে এসব কথায় আগামী দিনে আমি পুরোপুরি স্থির নাও থাকতে পারি, পরিবর্তন হতে পারে আমার চিন্তা। কেননা চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। আজ যা সত্য কাল তা মিথ্যায় পর্যবসিত হতে পারে। যা পরিবর্তন হয় না তা শ্মশান। শ্মশানে সৃষ্টি হয় না, ধ্বংস হয়। তবু তোলা থাকুক কথাগুলো। ৩৬-৪০ বছর বয়সে আমার চিন্তা-ভাবনা কী ছিল, কোন পথ কোন ঘাট পাড়ি দিয়ে আমি শিল্পতীর্থের দিকে একটু একটু করে অগ্রসর হচ্ছি, জানা থাকুক সবার। উপন্যাস সাহিত্যের কোনো পথিক বইটি পড়ে পেয়ে যেতেও পারেন কাক্সিক্ষত দিশা।

বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে, আলোঘর প্রকাশনী থেকে। ২০২০ সালে বইটি আবার সম্পাদনা করি। যোগ করি অনেক কিছু। এই বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশের জন্য খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঠক সমাবেশর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহিদুল ইসলাম বিজুকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আগের সংস্করণটি বাতিল ঘোষিত হলো। প থ যা ত্রা র আ গে। প্রকাশিতব্য বই : উপন্যাসের পথে। পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। লেখক : কথাসাহিত্যিক

সর্বাধিক পঠিত