প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: করোনা সংক্রমণে বদলেছে জীবন। ভয়ংকর ভাইরাস প্রভাব রেখে গেছে বা যাচ্ছে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে। এই আবহে দারিদ্র্য বেড়েছে, বেড়েছে বাল্যবিবাহও। দীর্ঘ ১৮ মাসের করোনা অতিমারিকালে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাদেশে বাল্যবিয়ের মহামারি লেগেছে। বাংলাদেশে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি, করোনাকালে সেটা যেন আরও গতি পেয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে৷ এরমধ্যে শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরের কম বয়সে।

অবস্থাটা কেমন তার কিছু চিত্র উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। করোনার বন্ধে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৫০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য স্কুলের একই চিত্র। কোনও কোনও উপজেলায় শতাধিক মেয়ের এই পরিণতি হয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোয় এখন অর্থাভাব। ফলে কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই নিরাপদ ভাবছে এসব পরিবার। স্কুল বন্ধ থাকা, পরিবারের আয় কমে যাওয়া ও নিরাপত্তাহীনতায় মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। করোনার আগে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যে রকম প্রশাসনিক এবং সামাজিক উদ্যোগ ছিলো, সেই উদ্যোগে ভাটা পড়েছে, এমনটা অনেক জনপ্রতিনিধিই বলছেন। এর বাইরে আছে অর্থনৈতিক কারণ। বেশিরভাগ পরিবার তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তারা অসম্ভব দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। ২০১৪ সালে সরকার ঘোষণা করেছিল, ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। তবে এর পর পর সরকার নিজেই মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনে।

স্থানীয় স্তরে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা, জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতার ফলে অনিয়ন্ত্রিত বাল্যবিয়ে। কোনও কোনও জেলা-উপজেলায় প্রশাসনের লোকজন জানতে পারলে কিছু বিয়ে ঠেকাতে উদ্যোগী হন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এগুলো করেন সমাজপতিদের ম্যানেজ করে। করোনাকালে এই প্রবণতা বাড়লেও, কিছু অঞ্চলে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপক প্রবণতা যেসব উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি, সেখানকার মেয়েরা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি নিপতিত। এসব দুর্যোগ তাদের পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়, যা পরিবারগুলোকে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

অর্থনৈতিক কারণ অবশ্যই আছে। করোনাকালে সেটা আরও বড় হয়েছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে নানা কুযুক্তিও চালু আছে সমাজে। ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় বিয়ে আসলে ভাগ্য-নির্ধারিত। সেখানে কারও হাত নেই। বেশিরভাগ পরিবার এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলে, ভালো ছেলে পাওয়া গেছে, দাবিদাওয়া নেই, তাই এমন পাত্র হাতছাড়া করা যায় না। আরেকটা বড় কারণ গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের নিরাপত্তা। তারা একটু বড় হলেই বখাটে ও মাস্তানদের নজরে পড়ে, এ নিয়ে একেকটা পরিবার অনিরাপদ হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা তো পায়ই না, উল্টো এলাকা ছাড়ার অবস্থা হয় অনেক সময়।

বাল্যবিয়ে রোখার পথটা সুগম নয়। আইন প্রণীত হয়। কিন্তু অনেক ধীরগতিতে মানুষের মনে পরিবর্তন আসে। পুরুষতান্ত্রিকতা ও বয়ঃপ্রাপ্ত মেয়েদের নিয়ে এক গভীর সামাজিক অনিশ্চয়তাই বাল্যবিয়ের মতো রোগকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় মেয়েদের উপার্জনক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে ভাবতে না পারার সামাজিক ব্যর্থতা।

বাল্যবিয়ে নামের যে সামাজিক ব্যাধি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, তা থেকে রেহাই পেতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন। প্রশাসনিক পদক্ষেপ অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক মাধ্যমে মৌলবাদী গোষ্ঠী নিরন্তর বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচার প্রয়োজন সরকার ও সমাজের সচেতন মহল থেকে। প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থান এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় এতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। স্কুলে-স্কুলে, পাড়ায়-পাড়ায় বাল্যবিয়েবিরোধী ক্লাব করা প্রয়োজন। উদ্যোগটা আগে শুরু হতে পারে সরকারি স্কুলগুলোতে। ধর্মীয় নেতা, ইমামসহ সমাজপতিদের এ বিষয়ে দায়বদ্ধ করে তুলতে হবে।

একসময়ের নিয়মিত প্রচারে বাল্যবিয়ের কুফল যেভাবে মানুষ জানতে পেরেছিল সেগুলো যেন এখন ভুলতে বসেছে। অনেক শিক্ষিত পরিবারও মেয়েদের দ্রুত পাত্রস্থ করার পক্ষে। বাল্যবিয়ে নারী শরীরের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও পুষ্টিতে অন্তরায়। বাল্যবিয়ে সুস্থ সন্তান জন্মের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নারীর সম্ভ্রম-সম্মান-গুরুত্ব কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনেরও অন্তরায়- এ কথাগুলো নতুন করে জোরেশোরে বলার সময় এসেছে আবার।

তাই বলছি, বাল্যবিয়েবিরোধী প্রচারে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেটা আবার বদলে যাচ্ছে। পথ এখনও দুর্গম এবং গন্তব্য দূরবর্তী। নতুন নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে প্রশাসনকে ফাঁকি দেওয়ার। যেখানে বাল্যবিয়ে ঠেকানো হচ্ছে সেখানে কোনও স্থানীয় প্রভাবশালীর নেতৃত্বে পাত্রপাত্রীকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই বিষয়ে সংবেদনশীল করে তুলতে না পারলে প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।

বাংলাদেশে তো নানা প্রকল্প হয়। এবার নতুন একটি প্রকল্প হোক। প্রতিটি ঘরে প্রতিটি কন্যার জন্মকে উদযাপন করে তাকে আদরের সঙ্গে বরণ করে নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত