প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঠাকুরগাঁওয়ে হাসপাতালে ঠাঁই নেই, চিকিৎসা গাছতলায়

ডেস্ক রিপোর্ট: ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের মূল ফটকের পাশে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গাছ। নিচে খানিকটা জায়গাজুড়ে পড়েছে সেসব গাছের ছায়া। ওই ছায়ায় বিছানা পেতে শুয়ে-বসে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। সঙ্গে তাঁদের শিশু রোগী। এখানে রেখেই অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন অভিভাবকেরা।

এই হাসপাতালের শিশু বিভাগের ওয়ার্ড, মেঝে ও বারান্দায় রোগী রেখে চিকিৎসা কার্যক্রম চললেও গত কয়েক দিন ধরে আর স্থান সংকুলান না হওয়ায় অভিভাবকেরা হাসপাতালের গাছতলায় রেখে শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। প্রথম আলো

হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডটিতে গত সোমবার ভর্তি ছিল ২০৩ শিশু। গতকাল মঙ্গলবার ভর্তি ছিল ১৯৩ শিশু। এই শিশুদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়ায় ভুগছে। সরেজমিন দেখা যায়, সংকুলান না হওয়ায় এক শয্যায় দুই থেকে তিন শিশুকে রাখা হচ্ছে। ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও অভিভাবকদের বসার জায়গায় রেখেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। যাঁরা ওই সব জায়গায়ও স্থান পাননি তাঁরা আশপাশের ভবন, এমনকি গাছতলায় বিছানা পেতে শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। আর রাতে তাঁরা জায়গা নেন হাসপাতালের অন্য পাকা জায়গায়।

ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শিশুদের কোলে নিয়ে বসে আছেন চারজন নারী। তাঁদের একজন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লালাপুর গ্রামের শিউলি রানী (৪১)। তিনি বলেন, তাঁরা চারজন বিছানা ভাগাভাগি করে শিশুদের চিকিৎসা নিচ্ছেন। দিনের বেলা এদিক-ওদিক গিয়ে সময় কেটে যায়। কিন্তু রাতে সমস্যায় পড়তে হয়। জায়গা না থাকায় শিশুদের নিয়ে পালা করে ঘুমাতে হচ্ছে। বিছানায় থাকার সময় পার হয়ে গেলে বাকি সময় শিশুকে কোলেই রাখতে হয়।

শিশু ওয়ার্ডের ৫০ মিটারে দূরে হাসপাতালের ভেষজ বাগানের গাছের ছায়ায়, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনের ফাঁকা জায়গায় অনেকে শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন। ওয়ার্ডের বারান্দায় মেয়ে সুমাইয়াকে (৩) নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম। সদর উপজেলার জামালপুর থেকে এসেছেন তাঁরা। খানিকটা সময় পর মেয়ের হাতে ক্যানুলা পরানো হলে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলেন তাঁরা। পরে তাঁদের দেখা মিলল হাসপাতালের ভেষজ বাগানের একটি অর্জুন গাছের নিচে।

মোহাম্মদ ইসলামের ভাষ্য, গত রোববার মেয়ের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। চিকিৎসক মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। হাসপাতালে এসে দেখেন, কোথাও জায়গা নেই। উপায় না দেখে হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের সামনে রাত কাটান। তিনি বলেন, ‘রাতে এখানে থাকি, দিনের বেলায় চলে আসি গাছের তলায়। আমার মতো অনেকেই শিশুদের নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন।’

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলা থেকে ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসেছেন সালেহা বেগম (৩৯)। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডের থেকে গাছতলাতেই ভালো আছি। যেখানে ২০ জনের মানুষ থাকার কথা, সেখানে ১০০ জন থাকেন। গরমে টেকাও যায় না। এইখানে (গাছতলায়) একটু হলেও বাতাস পাওয়া যায়। যখন শিশুর অক্সিজেন প্রয়োজন পড়ে, তখন আবার ওয়ার্ডে ঠাঁই নিই।’

ঠাকুরগাঁওয়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যালয় নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিয়মিত এখানে তাপমাত্রা রেকর্ড করে। ওই দপ্তরের তথ্যমতে, গত কয়েক দিনে জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঠাকুরগাঁওয়ে দিনের বেলায় অতিরিক্ত গরম পড়ছে। আবার রাতে তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু বিভাগের চিকিৎসক শাহজাহান নেওয়াজ বলেন, হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তাদের বেশির ভাগই শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, সর্দি, জ্বর ও পেটের ব্যথায় আক্রান্ত। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এমনটা হচ্ছে। এ সময় অভিভাবকদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের প্রচুর তরল ও ভিটামিন সি-জাতীয় খাবার দিতে হবে। শিশু ঘেমে গেলে জামাকাপড় পরিবর্তন ও ঘাম মুছে দিতে হবে।

এই চিকিৎসক জানান, স্বাভাবিক সময়ে ৬০ থেকে ৭০ শিশু ভর্তি থাকে। এখন ১৭০ থেকে ১৮০ শিশু ভর্তি থাকছে। গতকাল ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ১৯৩ শিশু রোগী। এর মধ্যে নবজাতক ৩৬। সবচেয়ে বেশি ৯৩ শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নাদিরুল আজিজ বলেন, হাসপাতালে শিশু রোগীর সেবা মানসম্মত হওয়ায় আশপাশের জেলার অনেক এলাকার অভিভাবক তাঁদের শিশুদের এখানে এনে চিকিৎসা করান। এ কারণে এই হাসপাতালে সব সময় শিশু রোগীর চাপ থাকে। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীদের শয্যায় গাদাগাদি করে, মেঝেতে ও বারান্দায় থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত