প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান মোরশেদ: তাজউদ্দীন কন্যা আপনাদের এই গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল প্রত্যাখান করলাম’

হাসান মোরশেদ: ‘মনে আছে নিশ্চয়ই, এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপের হাভাতে, স্বার্থ-তাড়িত, ধামাধরা মানসিকতাসম্পন্ন, লেজুড়বৃত্তির পরাকাষ্ঠা দেখানো, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল মার্কা, দুর্দম লোভী, উচ্ছিষ্টভোগী, আপাদমস্তক ভণ্ড বাঙালি ভ্রাতা ও ভগ্নিকুলের মধ্যে তানজিম আহমদ সোহেল তাজ-ই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মন্ত্রিত্বের পদ ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা বলয় ছেড়ে গিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়! সেই সঙ্গে বেতন-ভাতার অর্ধ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিয়েছিলেন’। -লিখেছেন সোহেল তাজের বোন মাহজাবিন আহমদ মিমি।
একজন প্রতিমন্ত্রী কী করে ‘সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতা বলয়’-এর অধিকারী ছিলেন সে প্রশ্ন বাকি থাক। মেনে নেওয়া যাক নিজের ভাইয়ের প্রতি তাঁর এই সত্যায়ন। এক. একক ব্যক্তি সোহেল তাজ ছাড়া বঙ্গীয় ব-দ্বীপের বাকি ষোলো কোটির প্রত্যেকে হাভাতে, স্বার্থ-তাড়িত, ধামাধরা মানসিকতা সম্পন্ন? এই সত্যায়নটুকুও মেনে নিতে হবে? এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখি মুক্তিযুদ্ধকালীন আরেক সত্যায়নে। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্বেয় তাজউদ্দীন আহমদ থিয়েটার রোডের অফিসে একটা খাটে শুতেন, নিজের হাতে কাপড় কাঁচতেন এবং পরিবারের সঙ্গেও দেখা করতেন না। এই আখ্যানের প্রচার আমরা পাই। নিশ্চয় তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর সর্ব্বোচ শ্রম ও ত্যাগ করেছেন। বাকিরা করেননি? বাকিরা বৌ-বাচ্চা নিয়ে আরামের দিন কাটিয়েছিলেন?

প্রবাসী সরকারের প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম খুব সুখে ছিলেন রাষ্ট্র অর্জনের সর্বাত্মক যুদ্ধে তাঁদের নেতা শেখ মুজিবের রহমানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, বিশেষ করে যখন তাঁর নিজের কিশোর পুত্র সশস্ত্র যুদ্ধে? কিংবা এএইচএম কামরুজ্জামান? যুদ্ধকালীন স্বরাষ্ট্র এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে তাঁর দিনগুলো খুব আরামের ছিলো? এককোটি শরণার্থীর জন্য পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরাজুড়ে গড়ে ওঠা শিবিরগুলোতে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হতো, সীমিত সামর্থ্যে শরণার্থীদের দাবি-দাওয়া মেটাতে হতো। ইয়ূথ ক্যাম্প থেকে মুক্তিবাহিনীর সদস্য সংগ্রহ, মুক্তিবাহিনীর রসদ, অস্ত্র, গোলাবারুদ ব্যবস্থাপণার নির্বাহী দায়িত্ব তাঁরই ছিলো। আর অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী তো পরিবার ছাড়াই সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তাঁর দেখা পেয়েছিলো কয়েক মাস পরে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তাঁদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে, তাঁরাও তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছেন। কোনোদিন তাঁদের সন্তানদের মুখে তো এরকম বাণী শুনতে হয়নি ‘বঙ্গীয় ব-দ্বীপের হাভাতে, স্বার্থ-তাড়িত, ধামাধরা মানসিকতাসম্পন্ন, লেজুড়বৃত্তির পরাকাষ্ঠা দেখানো’ ছোটলোকদের।

মিমি সবশেষে একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘আমাদের মনভোলা, স্মৃতি বিভ্রমে হরদম ভোগা, সর্বজ্ঞ ভ্রাতা-ভগ্নিকুলের জন্য আরও একটি ব্রেকিং নিউজ : এই বাংলাদেশে বাঙালিয়ানার তাবৎ গৌরবের প্রতীক দু’টি পরিবার- বঙ্গবন্ধু পরিবার ও বঙ্গতাজ পরিবার। ’ তো, বাঙালিয়ানার তাবৎ গৌরবের প্রতীক এই দুই পরিবার- এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার অথরিটি মিমি হলেন কবে থেকে? শেখ হাসিনা নিজেও তো কোনোদিন এই পর্যায়ের দাবি করেননি। স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার মানুষ বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে, ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে গ্রহণ করেছে এই জনপদের মানুষের অধিকার আদস্যে ব্যক্তি মুজিবের অসামান্য অবদানের জন্য, তাঁর পরিবারের পরিচয়ের জন্য না।

শেখ হাসিনা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন কেবল শেখ মুজিবের মেয়ে হিসেবে নয়, তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলন এবং এদেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে এক যুগ ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে। সেই তুলনায় আপনে, আপনারা কে? কিছুই না। কিচ্ছুই না। ‘হাভাতে, স্বার্থ-তাড়িত, ধামাধরা মানসিকতাসম্পন্ন, লেজুড়বৃত্তির পরাকাষ্ঠা দেখানো, গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল মার্কা, দুর্দম লোভী, উচ্ছিষ্টভোগী, আপাদমস্তক ভণ্ড বাঙালি’ বলে যাদের গালি দিলেন- আমি তাঁদের একজন। তাঁদের একজন হয়ে আপনার/আপনাদের এই গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লপণা প্রত্যাখান করলাম। লেখক ও গবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত