প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আলোয় ফিরেছে পাবনা

নিউজ ডেস্ক: পাক ভারত উপমহাদেশের প্রথম হোসিয়ারি শিল্পশহর পাবনা গড়ে উঠলেও দেশ ভাগের পর ধস নামলে জীবন জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে নগরবাড়ী-আরিচা ফেরি চলাচল শুরু হলে উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে জেলা গুরুত্ব লাভ করে। এরপর ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু সিরাজগঞ্জে চালু হলে নগরবাড়ি নৌবন্দরে ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জেলার ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। উন্নয়নহীনতা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে জেলাবাসী যখন হতাশাগ্রস্ত সে পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট, স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণসহ ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ায় সাধারণ মানুষ যেন অনুন্নয়নের ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর নিশানা খুঁজে পায়। জেলা সদর থেকে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যন্ত পাকা সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়ায়। গ্রামে শহরের মতো পাকা দালানকোঠা ও মার্কেট গড়ে উঠে। গ্রামীণ অর্থনীতি এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে ইউনিয়নে ফ্রিজ কালার টিভির একাধিক শোরুমসহ উপজেলা পর্যায়ে মোটরসাইকেল বিক্রির দোকান গড়ে উঠেছে। জনকণ্ঠ

রকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত চাহিদা মোকাবেলায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করছে। সোয়া লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করায় জেলাবাসী উৎফুল্ল ও গর্বিত। দাশুড়িয়া চৌরাস্তার মোড় থেকে কুষ্টিয়ামুখী ২ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই চোখে ধাঁধানো রূপপুর গ্রীন সিটি থেকে প্রকল্প শুরু। গ্রীন সিটিতে ২০তলা ১৩টি ১৬তলা ৮টি দৃষ্টিনন্দন ভবন যেন আকাশ ছুয়েছে। এ ভবনে পারমাণবিক প্রকল্পের রাশিয়ান ৫-৬ হাজার স্টাফের আবাসস্থল। গ্রীন সিটির দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলো যে কোন আগন্তুক প্রথম দর্শনে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে এটা বাংলাদেশ না কি উন্নত কোন দেশ। গ্রীন সিটিতে ঢাকার বিভাগীয় বিপণি স্বপ্ন শাখা খুলেছে।

বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে চলছে হুলস্থুল নির্মাণ কান্ড। অসংখ্য সুউচ্চ ভারি ক্রেন আর নাম না জানা নানা আকৃতির মেশিন সমারোহে কয়েক হাজার কর্মকর্তা আর শ্রমিকদের বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের মহোৎসব। ১ হাজার ৬২ একর জমির ওপর নির্মিত দেশের প্রথম এ পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ২ ইউনিট থেকে ২০২৪ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রিডে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত যোগ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পারমাণবিক চুল্লী স্থাপনে নিজ হাতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঈশ্বরদীর রূপপুরে ২০১৩ সালে ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিদ্যুতকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটোম প্রকল্পটিতে কারিগরি ও নির্মাণ সহায়তা দিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক রিএ্যাক্টর-ভিভিইআর-১২০০ বসানো হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করতে আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং’র পর আরও ০.৫ মিটার পুরুত্বের আরও একটি কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং যুক্ত করা হয়েছে যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা থেকে প্লান্টকে সুরক্ষিত করবে। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এ প্লান্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ৮ মাত্রার ভ‚মিকম্পেও প্রকল্পটি নিরাপদ থাকবে। এছাড়া ৫.৭ টন পর্যন্ত ওজনের বিমানের আঘাতে ও এটি অক্ষত থাকবে। সর্বশেষ প্রজন্মেও অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে রিএ্যাক্টর বিল্ডিং থেকে ৮০০ মিটারের বাইরেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যাবে। এ প্রকল্পটি চালু হলে দেশের জিডিপিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। আর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রকে ঘিরে ঈশ্বরদীর অর্থনীতি বর্তমানে ব্যাপক গতিশীল হয়েছে। কয়েক হাজার রাশিয়ান কর্মকর্তা ও স্টাফকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীতে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেসরকারী উদ্যোক্তরা ৫ তারকা হোটেল নির্মাণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে পারমাণবিক প্রকল্পের এ মহাকর্মযজ্ঞে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর তাগিদ অনুভব করছে সংশ্লিষ্টরা। ঈশ্বরদী বিমান বন্দরটি চালু করা গেলে বিদেশী কর্মকর্তাদের যাতায়াত সহজ হলে প্রকল্পের কাজ আরও বেগবান হবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।

সরকার ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করে পাবনাবাসীর দীর্ঘকালের প্রাণের আকুতি পূরণ করেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। স্বাধীনতার পরপরই পাবনার মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এ রেললাইনের দাবি তোলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানুষের ভালোবাসার মর্যাদায় ১৯৭৪ সালে ঈশ্বরদী-পাবনা রুটে রেলপথ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু ৭৫ পরবর্তী সরকার এ প্রকল্প বাতিল করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা সংসদ নির্বাচনে ভিডিও কনফারেন্সে ক্ষমতায় গেলে এ রেললাইন নির্মাণের ঘোষণা দেন। ২০১৩ সালের ২ ফেব্রæয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈশ্বরদী পাবনা-ঢালারচর রেলেপথের কাজ উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ এ বন্দর নির্মাণ করছে। ১৪ জুলাই সরকারী এ্যাডওয়ার্ড কলেজ মাঠে জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উদ্বোধন করেন। এ ট্রেন চালুর ফলে এখন জেলাবাসী প্রতিদিন সকালে রাজশাহী গিয়ে তাদের ব্যবসাসহ নানা কর্মকাণ্ড শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ঈশ্বরদীতে ৩০৯ একর জায়গা নিয়ে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকার ২০০৫ সালে এ ইপিজেড নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এখন এ ইপিজেডে অস্ট্রেলিয়া, চীন, হংকং, তুর্কিস্থান, ভারতের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এখানে তামার তার, এংলো, ফ্লাট টিউব, সোয়েটার, পলিথিন দ্রব্যগার্মেন্টস, মোজা, ব্যাটারি, বিদ্যুত, তুলা, ফেব্রিক্স। ঈশ্বরদী ইপিজেডে ২০-২২ হাজার লোকের কর্মসংস্থানসহ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে।

দেশের ২য় বৃহত্তম বিলগাজনা সংস্কারে ৪১৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গাজনার বিল প্রকল্পে তালিমনগরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট লিঃ প্রায় ২২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ডুয়েল পদ্ধতির পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করছে। বহুমুখী এই প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত কৃষিজ পণ্য ও মাছ উৎপাদন হবে। এতে প্রকল্প এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ প্রকল্পটিতে এক ফসলি জমি দুই ফসলি এবং দুই ফসলি জমি তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হবে। ফসলের উৎপাদন ১৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০০ শতাংশে উন্নীত হবে। এতে করে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত কৃষিজ পণ্য উৎপাদন হবে। গাজনার বিল, বিল গ্যারগা, গাঙভাঙ্গার বিল ও মোস্তার বিলের অভয়াশ্রম থেকে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার দেশীয় উৎপাদন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলে পাবনাসহ সারাদেশেই উন্নয়নের যে মহাসমারোহ চলছে তা দৃশ্যমান। এভাবেই জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বলে তিনি জানান।

সরকার ৫১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরবাড়ীতে আধুনিক নৌবন্দর নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এ বন্দর নির্মাণ করছে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ২৭ ফেব্রæয়ারি এ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে তিনটি প্যাকেজে আরসিসি (পাকা) জেটি, নদীতীর রক্ষায় অবকাঠামো ও বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে এ বন্দর দিয়ে বছরে ৩০ লাখ টন পণ্য নিরাপদে উঠানামা করতে পারবে। বঙ্গবন্ধু সেতুর বিকল্প হিসেবে এ বন্দরের ব্যবহার বাড়বে ও সেতুর ওপর চাপ কমবে। বিআইডবিøউটিএ জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সার, সিমেন্ট, বালি, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য পাবনার বেড়া উপজেলায় অবস্থিত নগরবাড়ী নৌবন্দরে আসে। সেখান থেকে সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা পরিবহন করা হয়। একইভাবে উত্তরাঞ্চলের মালামাল এ বন্দর দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ, দুটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ, জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামায় মোবাইল হারবার ক্রেন বসানো, পণ্য রাখার গুদাম, শ্রমিকদের বিশ্রামাগার, জাহাজের পাইলট ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহম্মদ ফিরোজ কবির জানান এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাÐ আরও গতিশীল হবে। তিনি আরও জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার সেবামূলক সরকার তাই যেখানে যা প্রয়োজন তা সরকার পূরণ করতে সচেষ্ট।

সরকার ৪টি আন্তর্জাতিকমানের মেরিন একাডেমির মধ্যে ১টি বেড়া উপজেলার নাটিয়াবাড়ি মৌজায় ১২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিআইডাবিøউটিএ’র ১০ একর অধিগ্রহণকৃত জায়গায় মেরিন একাডেমি করা হয়েছে। এখানে ১০টি বহুতল ভবন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ডেক ক্যাডেট, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ক্যাডেট প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ব্যবস্থা থাকবে। চার বছর মেয়াদী মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ২শ’ ক্যাডেট পড়াশুনার সুযোগ পেলেও প্রথম অবস্থায় এই একাডেমিতে ৫০ জন নটিক্যাল ও ৫০ জন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং করার সুযোগ পাবে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে বর্তমানে ছাত্র ভর্তিও প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বেড়ায় ৫শ’ ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ২ ফেব্রæয়ারি পাবনা সফরকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিদ্যুত কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুত ঘাটতি কমানোর জন্য জেলার বেড়া পৌর এলাকার বৃশালিখা মহল্লার বেড়া পাম্প স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন পিকিং পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ করে। বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত¡াবধানে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই হ্যাভি ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড বিদ্যুত কেন্দ্রটি ২০১০ সালের ৫ আগস্ট নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১১ সালের ৮ অক্টোবর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ পাওয়ার প্লান্ট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

১৯ বছর পর সরকার কাজিরহাট থেকে আরিচা ফেরি সার্ভিস চালু করে ব্যাপক আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছে। নাব্যতা সঙ্কটে ২০০২ সালে আরিচা থেকে ফেরিঘাট পাটুরিয়ায় স্থানান্তর হলে কাজিরহাট ঘাটের ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গত ২৭ মে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘকাল পর ফেরি সার্ভিস চালুর কারণে পাবনাসহ আশপাশের জেলার পণ্যবাহী মালামাল কম সময়ে ও অল্প ব্যয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৌঁছানো সহজ হচ্ছে। কাজিরহাটে দীর্ঘকাল পর ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকমাস ধরে আরিচা থেকে কাজিরহাট পর্যন্ত ড্রেজিং করে এ যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। কাজিরহাট ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় পাবনাসহ আশপাশের জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জেলায় ছোট বড় ১৫শ’ ঝুট কেন্দ্রিক হোসিয়ারী শিল্প গড়ে উঠেছে। এ শিল্পে ১ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত। হোসিয়ারী শিল্পের মূল কাঁচামাল গার্মেন্টস ঝুট ভারতে রফতানি হওয়ায় সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এ শিল্পের উৎপাদিত সিংহভাগ গেঞ্জি ভারতে রফতানি করা হয়। এরপর মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর, সৌদি আরবেও রফতানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ঝুট রফতানি বন্ধের দাবি তুলেছেন। তারা সহজশর্তে ঋণেরও দাবি করেছেন। তাঁতশিল্পে পাবনা জেলা সমৃদ্ধশালী। এখানকার শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। সহজশর্তে ঋণ দিয়ে পাবনার তাঁত শিল্পকে আরও উজ্জীবিত করা প্রয়োজন। তাঁত শিল্প উজ্জীবিত হলে বহু কর্মসংস্থান যেমন হবে তেমনি আরও বেশি শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাবনা পৌর মেয়র শরীফ উদ্দিন প্রধান জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের গতিধারায় পাবনাবাসীকে একটি সুন্দর কল্যাণমুখী পৌরসভা উপহার দিতে তিনি কাজ করছেন।

বেড়া উপজেলার নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়নের সাফুল্লা মৌজায় যমুনার তীরে সরকার ৭শ’ একর জমিতে অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে রেল সচিব সেলিম রেজা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আঃ রউফ তালুকদার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের যুগ্ম-সচিব হাসান আরিফ অর্থনৈতিক জোন এলাকা পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখানে বেসরকারী উদ্যোক্তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গণপূর্ত বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ারুল আজিম জানান, আওয়ামী লীগ সরকার জেলায় ৩ হাজার ৭শ’ ৫২ কোটি টাকার ভৌতকাঠামো নির্মাণ করেছে। তারমধ্যে চাটমোহর, ফরিদপুর, সুজানগর, পাবনা সদর, সাঁথিয়া, আটঘড়িয়া, রূপপুরে ও কাশিনাথপুরে ৮২ কোটি ৮২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ৮টি ফায়ার স্টেশন, পাবনা, সুজানগর, বেড়া ও চাটমোহরে ১৬ কোটি ৩০ লাখ ১ হাজার টাকা ব্যয়ে সাব-রেজিস্ট্রি ভবন, ৮ কোটি ১৪ লাখ ৬৬৩ টাকা ব্যয়ে ১৪টি ইউনিয়ন ভ‚মি অফিস ভবন, ১৩৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯টি মডেল মসজিদ, ৫৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে পুলিশ বিভাগের থানা ব্যারাক, হোস্টেলসহ ১৫টি প্রকল্প। ২৩ কোটি ৩০ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে জজ আদালত ভবন, ১৯ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয়ে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, ১০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মেরিন একাডেমি ভবন, ৪ কোটি ১৭ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে এনএসআই ভবন, ৫ কোটি ব্যয়ে সদর হাসপাতালের ভবন, ২১ কোটি ৬৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে সুজানগর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভবন, ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনা মেডিক্যাল একাডেমিক ভবন, ১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে মেডিক্যাল ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেল ভবন, ২১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ভবন, ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নার্সেস কলেজ, ১২ কোটি ২৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নার্সিং ইনস্টিটিউট, ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু হোস্টেল, ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পাসপোর্ট অফিস ভবন, ৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কিডনি ফাউন্ডেশন ইনস্টিটিউট, ২ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আনসার ব্যারাক, ১ কোটি ৫৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সার্ভার স্টেশন, সার্কিট হাউস উদ্ধমুখীকরণ ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৪১ হাজার, ৭৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ডিজিটাল এগ্রি ইনফরমেশন সেন্টার, ১ কোটি ৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে কৃষক প্রশিক্ষণ স্কুল,

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী মাতোয়ারা পারভীন জানান, জেলায় এ সরকার আমলে ১৩ হাজার ৯শ’ ৯২ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ব্যয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌত কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ১৯ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার ব্যয়ে ৭টি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ ভবন, ১৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পাবনা টেকনিক্যাল স্কুল এ্যান্ড কলেজ ভবন, ৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪টি কলেজ ভবন, ৬৪ কোটি ২৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪৮টি বেসরকারী কলেজের আইসিটি ভবন, ১৩ হাজার ৬শ’ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি নির্বাচিত বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ যা চলমান, ৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০টি বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উর্ধমুখী ভবন নির্মাণ (চলমান), ৮৫ কোটি ১০ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩০টি বেসরকারী মাদ্রাসা ভবন, ৮০ লাখ ৩ হাজার ৪ টাকা ব্যয়ে ৩টি সরকারী কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা উন্নয়নে ভবন নির্মাণ। পাবনাকে যুক্ত করে আরিচা-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় যমুনা-পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে পাবনায় ১৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার আমলে জেলায় রাস্তাঘাট, হাট বাজার এমন কোন জায়গা নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ ভাবতেও পারেনি গ্রামে পাকা সড়ক হবে বাস চলবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কল্যাণে সেসব গ্রামে আজ হাসি ফুটেছে। চাটমোহর উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার জানান, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় তিনি চাটমোহর উপজেলাকে ঢেলে সাজাতে কাজ করে যাচ্ছেন। তার উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

জেলাবাসীর এখন চাওয়া পাবনাকে যুক্ত করে আরিচা-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় যমুনা-পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়ন। এ দাবিতে ঢাকাস্থ পাবনা জেলা উন্নয়ন ফোরাম ১৪০ কিলোমিটার মানববন্ধন করেছে। পাবনা জেলা উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এসকে হাবিবুল্লাহ জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল নগরবাড়ী-আরিচাকে সংযুক্ত করে ব্রিজ নির্মাণের । তাই নগরবাড়ী (কাজীরহাট), আরিচা ও দৌলতদিয়া সংযোগকারী ওয়াই টাইপ সেতু নির্মাণে পাবনাবাসীর প্রাণের এ দাবি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করছেন। পাবনাবাসীর এ দাবি পূরণ হলে রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াতে ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাবে। পাবনায় নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। অন্যদিকে পৌরবাসীর প্রত্যাশা শহরের মধ্য দিয়ে এককালের সৌতস্বিনী ইছামতি দখলমুক্ত করে সচল করা। ইছামতি নদী উদ্ধার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও এখন ইছামতির উদ্ধার অভিযান বন্ধ রয়েছে। সরকার ইছামতি খননে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় তারা এর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত