প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরিফুল হাসান: দেশে সুশাসন আসবেই, শুধু জানি না কবে হবে!

শরিফুল হাসান: চিত্রনায়িকা পরীমনিকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পাশাপাশি আইন অমান্য করা হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি কীসের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট পরবর্তী দুই দফায় পরীমনির রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন উচ্চ আদালত। বিষয়টা আমার বেশ ভালো লেগেছে। আসলে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, পুলিশি তদন্ত, প্রশাসন কোনোটার ওপর থেকেই আমি কখনও পুরোপুরি আস্থা হারাইনি। নানা অনিয়ম সংকট ছিলো, আছে, সামনের দিনেও থাকবে তারপরেও সবসময় একটু আশা দেখতে চেয়েছি। সবসময় মনে হয়েছে, কোনো একটা ঘটনায় সব পক্ষ যেন মিলেমিশে না যায়, কোথাও এক জায়গায় যেন একজন মানুষ ন্যায়বিচার পায়। নায়িকা পরিমনির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাকে আমার পরিস্কারই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছিলো, পুলিশ চাইলেই যে তুচ্ছ ঘটনায় কাউকে ইচ্ছেমতো হয়রানি করতে পারে সেটা পরিমনির ঘটনায় সেটা পরিস্কার। আফসোস হচ্ছিলো, আমাদের সাধারণ মানুষজন ঘটনাটা ধরতেই পারছে না। আশা ছিলো আদালত বিষয়টা দেখবে।

কিন্তু যখন দেখলাম নিম্নআদালত বারবারই তাকে জামিন না দিয়ে রিমান্ডে পাঠাচ্ছে আমি খুবই অবাক হচ্ছিলাম যে পুলিশ আর আদালত কী মিলেমিশে এক হয়ে গেল? দেরিতে হলেও এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনায় দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা জাগিয়েছে। হাইকোর্ট পরিস্কার করে বলেছে, ‘এই মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পাশাপাশি আইন অমান্য করেছেন যা ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলায় প্রতিবন্ধকতা। তাছাড়া দুই দফা রিমান্ড আবেদন মঞ্জুরে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে এতো সন্তুষ্ট হলেন, যা আমাদের বিচারিক ঐকমত্যকে বিদ্ধ করেছে।’জামিন আবেদনের শুনানির দিন দেরিতে ধার্য নিয়ে পরীমনির করা এক আবেদনের ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট ২ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক আদেশে এসব কথা বলেছেন। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আদেশে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিপরীতে গিয়ে পরীমনিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে।

আইনের মীমাংসিত নীতি সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ না করে কোনো নাগরিকের অধিকার এভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায় না। একইভাবে প্রতিটি নাগরিককে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। আদেশে বলা হয়েছে, দেশের উপযুক্ত কোনো আদালত থেকে সিদ্ধান্ত আসার আগে কারও ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাধীনতা নিয়ে ‘ট্রলিংয়ের’ মতো অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত করা উচিত নয়। সংবিধানের ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদ বলেছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। আদেশে বলা হয়, সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন হতে পারে। অভিযুক্তকে চার দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়। কোনো তথ্য বা উপাদান থাকলে তা বের করার জন্য অবশ্যই এটি যথেষ্ট সময়। কিন্তু এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমাণ্ডের আবেদন করেন। কিসের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালত সন্তুষ্ট হয়ে রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন?

শুনে ভালো লেগেছে যে দুই বিচারক জামিন না দিয়ে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন তাদের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে হাইকোর্ট। কোন ঘটনা ও পারিপার্শ্বিকতায় তারা অভিযুক্তের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুরে উৎসাহিত হলেন এর কারণ ব্যাখ্যা করতেও বলা হয়েছে। ব্যাখ্যা ও স্পষ্টীকরণ সন্তোষজনক না হলে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে। পুলিশের প্রতি আদালত বলেছেন, কোনো অপরাধ এককভাবে পুলিশের জন্য সমস্যা নয়, সমাজের সমস্যা। পুলিশ বিভাগকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে মানবজীবন অত্যন্ত মূল্যবান। কোনো অভিযুক্তের জন্য রিমান্ড নেওয়ার আগে পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনি ও মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রথমে চিন্তা করতে হবে। কিন্ত পরিমনীর মামলায় মনে হচ্ছে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পাশাপাশি আইন অমান্য করেছেন, যা ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলায় প্রতিবন্ধকতা। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কারণ ব্যাখ্যা করলে ন্যায়বিচার দৃশ্যমান হবে। তাই নিজের অবস্থান, কারণ ব্যাখ্যা ও স্পষ্টীকরণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে মামলার সিডি (নথি) নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হলো।

আপনাদের অনেকের কাছে এই নির্দেশনাগুলো কঠিন মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে ভীষণ ভালো লেগেছে। পরীমনিকে ৪ আগস্ট রাতে তার বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে আটক করে র‌্যাব। পরে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। এ মামলায় পরীমনিকে তিন দফায় প্রথমে চার দিন, দ্বিতীয় দফায় দুই দিন ও তৃতীয় দফায় এক দিনসহ মোট সাত দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মোট ২৬ দিন তিনি কারাগারে ছিলেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত হয়ে বলছি, আমার নিজের ধারণা পুলিশও জানতো এই মামলায় পরিমনির বিরুদ্ধে খুব বেশি অভিযোগ তারা আনতে পারবে না। কাজেই যতো দিন ইচ্ছা তাকে রিমান্ডে রেখে ক্ষোভ মেটাতে চেয়েছেন। আবার এ ঘটনায় পুলিশের এক কর্মকর্তা যেভাবে সম্পর্কে জড়িয়েছেন পরীমনির সঙ্গে সেটাও ভীষণ দৃষ্টিকটু। এখানে আরেকটা ঘটনা না বললেই নয়। আমাদের পুলিশ বাহিনী একটা ছোট অপরাধের কারণে পরিমনীর বিরুদ্ধে যেভাবে নেমেছে সেভাবে কিন্তু অনেক বড় অপরাধ দমনে নামে না। আমি এই মুহূর্তে একটা ঘটনার উদাহরণ দেই। কয়েকদিন আগে দেশ ছেড়ে পালানোর পর ভারতে গ্রেপ্তার ঢাকার বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানার বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। নামে- বেনামে থাকা তার সম্পদের মধ্যে ঢাকার অভিজাত এলাকায় ৫টি ফ্ল্যাট, ৯ কোটি টাকা মূল্যের একটি বাণিজ্যিক ভবনে জায়গা ‘স্পেস’, ২টি প্লট ও ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কিন্তু পুলিশ যথাসময়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

এখন তদন্ত করলে দেখা যাবে চাকরি জীবনে তিনি কতো মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন। এমন বহু ঘটনা বলা যাবে। এ দেশের প্রত্যেকটা দপ্তরে এমন বহু লোক যারা মানুষকে কষ্ট দেয়। স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করতে যাচ্ছি আমরা। অথচ এ দেশের শিক্ষা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, ভূমি থেকে শুরু করে পুলিশ আদালত, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে ওয়াসা, তিতাস, সড়ক পরিবহন, রেল প্রতিটি সেবাখাত দুর্নীতিগ্রস্ত। কোথাও সেবা নিতে গেলেই বাস্তব অবস্থাটা টের পাওয়া যায়। এখানে পিয়ন, অফিস সহকারী থেকে শুরু করে বহুজেনর কোটি কোটি টাকা। বড় স্যারদের অনেকের তো দেশে বিদেশে বাড়ি। আফসোস তাদের বিরুদ্ধে কার্যত ব্যবস্থা দেখি না। বরং নানাভাবে তারা রাষ্ট্রের আনুকুল্য পায়। এই যেমন দেখেন, দুর্নীতির মামলায় সাময়িক বরখাস্ত কারা উপমহাপরিদর্শক পার্থ গোপাল বণিককে খাস কামরায় জামিন দিয়ে অতি গোপনে জামিন আদেশ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছে, এ ধরনের ঘটনা লজ্জাজনক এবং আইনের সঙ্গে সংগতিহীন। ৮তারিখ বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১২ পৃষ্ঠার একটি রায় প্রকাশ করেন।

ওই রায়ে আদালত এসব মন্তব্য করেন। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিচারকেরা বলেন, ‘আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে জেলা জজ পর্যায়ের একজন বিচারকের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ ও কর্ম প্রত্যাশিত নয়। তার এ ধরনের আদেশ উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা এবং যা আদালত অবমাননার শামিল। হাইকোর্ট বিভাগ ইতিপূর্বে আসামির জামিন নাকচ করে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিজ্ঞ বিচারক আসামিকে জামিন প্রদান করে হাইকোর্টের আদেশকে অবজ্ঞা করেছেন।’আসলে এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটে। যদিও আমরা বলি আইন সবার জন্য সমান কিন্তু বাস্তবে এ দেশে যতো অন্যায় ঘটে সব দুর্বল মানুষের সঙ্গে। এই যেমন জুমন দাস ছয় মাস ধরে জেলে। এতো দিনে ও জামিন হলো না তার। অথচ প্রভাবশালীরা খুন করেও পার পেয়ে যায়। কিন্তু আমি সত্যিই চাই এ দেশে আইন সবার জন্য সমান হবে। আমি খুব করে চাই আমাদের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, আমাদের পুলিশ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ দেশে একদিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে সুশাসন আসবে। শুধু জানি না কবে হবে। তবুও আশা করে থাকবো। ভালো থাকুন সবাই। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত