প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কল্লোল মোস্তফা: সরকারের বক্তব্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো সংকট নেই

কল্লোল মোস্তফা: সরকারের বক্তব্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো সংকট নেই, তাহলে বিদ্যুৎ-জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির বিশেষ আইনটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা লাগবে কেন! সরকারি হিসেবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২২ হাজার মেগাওয়াট আর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় অনেক বাড়তি সক্ষমতা রয়েছে, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভাড়া গুণতে হচ্ছে। তাহলে কোন যুক্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়াতে চায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়! ২০১০ সালে এই আইনটি করার সময় যুক্তি দেখানো হয়েছিলো প্রতিযোগীতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে গেলে সময় বেশি লাগবে তাই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বিনা টেন্ডারে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য এই আইনটি প্রয়োজন।

আইনের শুরুতেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ‘চরম ঘাটতির’ কথাটি বলা আছে এভাবে- ‘যেহেতু দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর ঘাটতি চরমভাবে বিরাজ করিতেছে;’ তারপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আটকে থাকার কথা বলা হয়েছে- ‘যেহেতু বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহের জন্য উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নূতন সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, প্রযুক্তির বিকাশ, দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচী, কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হইতেছে এবং জন জীবনে অস্বস্তি বিরাজ করিতেছে;’ এবং প্রচলতি আইন মেনে ঘাটতি মেটাতে গেলে সময় বেশি লাগার যুক্তি দেখানো হয় এভাবে- ‘যেহেতু বর্তমানে প্রচলিত আইনের অধীন প্রতিপালনীয় পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর ঘাটতি এবং অপর্যাপ্ততা নিরসন সময় সাপেক্ষ;’।

এই ‘চরম ঘাটতি’র অযুহাত দিয়েই এই আইনের ৩ ধারার মাধ্যমে সরকারি ক্রয়নীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যহতি দেয়া হয় এবং ৯ ধারার মাধ্যমে এই আইনের আওতায় করা কোনো চুক্তি নিয়ে আদালতেও প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ রহিত করা হয়! তারপর ১০ বছর ধরে এই আইনের অধীনে পছন্দের বিভিন্ন কোম্পানির সাথে বিনা টেন্ডারে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল, আইপিপি ইত্যাদি নানা ধরণের চুক্তির মাধ্যমে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলো, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকী দেয়া হলো, বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের সফলতা ঢাকা ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলো। এতো কিছুর পরেও কি চুক্তির শুরুতে উল্ল্যেখ করা সেই ‘চরম ঘাটতি’ কি এখনো আছে? এখনো কি বিদ্যুতের ঘাটতির জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে, জন জীবনে অস্বস্তি বিরাজ করছে? এর উত্তর যদি ‘হ্যা’ হয় তাহলে বিদ্যুৎখাত নিয়ে সরকারি সাফল্যের গল্প প্রচার বন্ধ করতে হবে। আর সরকার যদি দাবি করে গত ১০ বছরে বিদ্যুৎখাতের সক্ষমতা আসলেই বৃদ্ধি পেয়েছে, তাহলে তো বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর মেয়াদ বৃদ্ধির আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না!

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সরকার একদিকে বিদ্যুৎখাতে ব্যাপক সাফল্যের কথা প্রচার করেছে অন্যদিকে ‘চরম ঘাটতির’ দোহাই দেয়া বিশেষ আইনটির মেয়াদ বছর বছর বাড়িয়ে চলেছে! প্রথমে দুই বছরের কথা বলে আইনটি করার পর পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ তিন বছর এ আইনের মেয়াদ বাড়ানো হয়, যা শেষ হবে চলতি বছর। এবার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়াতে আইনটি সংশোধনে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে আর ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদে বিল আকারে তা উত্থাপন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সংসদে এই আইনটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিল তুলবার সময় যুক্তি দেখিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার লক্ষ্যে এ খাতে দ্রুত অধিকসংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন, আর সেই জন্যই এই বিশেষ আইনটির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন! কিন্তু এই আইন তো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ‘চরম ঘাটতি’ দ্রুত মেটানোর জন্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর জন্য তো নয়! তাছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য সরকার যতো খুশি প্রকল্প হাতে নিতে পারে, কিন্তু বিনা টেন্ডারে বিশেষ জ্বালানি আইনের আশ্রয়ে কেন নিতে হবে? ১০ শতাংশ লক্ষমাত্রা তো আজকে ঘোষিত হয়নি, তাহলে এতোদিন কি করেছে সরকার? আসলে এগুলো সবই অযুহাত, বিনা টেন্ডারে বিভিন্ন ব্যক্তি/গোষ্ঠী/কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তির যে ‘মজা’ সেটা তারা ছাড়তে চাইছেন না বলেই বার বার দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির কথা বলে বিশেষ জ্বালানি আইনের মেয়াদ বাড়াচ্ছেন। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত