প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মান্ধাতার পদ্ধতিতে মাছ ধরা, নদী দূষণ: মারা পড়ছে ডলফিন

নিউজ ডেস্ক: এক মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড সমুদ্র উপকূলেই শুধু চারটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। এছাড়া গত এক বছরে শুধু কক্সবাজার উপকূলে মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে ২১টি। সমুদ্র ছাড়াও হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে ডলফিনের মৃত্যু একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠছে। যান্ত্রিক নৌকা, জেলেদের মান্ধাতা পদ্ধতির মাছ শিকার এবং শিল্প কারখানার বর্জ্যে পানি দূষণে ডলফিনের মৃত্যু বাড়ছে, এমনই বলছেন বিশ্লেষকরা। তবে ডলফিন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে তদন্ত কমিটি এবং গবেষণার প্রয়োজন মনে করেন পরিবেশবাদীরা। ডলফিন চট্টগ্রামের স্থানীয়ভাবে উতোম বা শুশুক হিসেবে পরিচিত। সাধারণত দূষণমুক্ত পরিষ্কার পানিতে এরা বিচরণ করে। স্তন্যপায়ী এই প্রাণী খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য আঘাত, নৌযানের শব্দ এবং জালে আটকা পড়েও মারা যায় বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। জনকণ্ঠ

গত এক মাসে দেশের পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, রংপুরের তিস্তা, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ও আনোয়ারা সাগর উপকূল থেকে ১৪টি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। অল্প সময়ে এত বেশিসংখ্যক ডলফিন মারা যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সর্বশেষ গত বুধবার সীতাকুন্ডে তিনটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে উপকূলীয় বাসিন্দারা জানান, মঙ্গলবার বিকেলে জোয়ারের সঙ্গে মৃত ডলফিনগুলো ভেসে আসে। এর আগে গত ২০ আগস্ট সীতাকুন্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের সাগর উপকূলীয় বনে পাওয়া যায় প্রায় ২ মণ ওজনের একটি ডলফিন।

উপজেলা মেরিন ফিশারিজ অফিসার আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ধারণা করা হচ্ছে ভেসে আসা মৃত ইরাবতী প্রজাতির ডলফিনগুলো কোন বড় জাহাজের পাখার আঘাতে অথবা জেলেদের জালে আটকে মারা গেছে। এগুলো মিঠা পানির ডলফিন, যা পাঁচ থেকে সাত দিন আগে সাগরে মারা গিয়ে থাকতে পারে।

এদিকে, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে ২০১৮ সালে ডলফিন ছিল ১৬৭টি। ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত শুধু হালদায় ২৯টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে বিভিন্ন কারণে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে গাঙ্গেয় প্রজাতির ডলফিন দেখা যায়। ২০১৭ সাল থেকে গত জুলাই পর্যন্ত হালদা নদী থেকে ২৯টি মৃত ডলফিন উদ্ধার হয়। তবে কর্ণফুলী নদীতে গত ১৪ জুলাই একটি এবং ১ আগস্ট আরেকটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। জুলাইয়ে পাওয়া ডলফিনটি ওজনে ১০০ কেজি, লম্বায় ৭ ফুট। সেটি বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদন্ডিতে কর্ণফুলী নদীর শাখা ছন্দারিয়া খালে ভেসে ওঠে। পরে স্থানীয় লোকজন প্রশাসনকে খবর দিলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃত ডলফিনটি উদ্ধার করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে শরীরের বেশিরভাগ অংশ পচে যাওয়ায় ডলফিনটি মাটি চাপা দেয়া হয়।

ডলফিনের মৃত্যু শুধু যে জালে আটকে পড়ে হচ্ছে তা নয় উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, যেভাবে মৃত ডলফিন ভেসে আসছে এটা অশনি সঙ্কেত। হঠাৎ করে দুই তিন মাসের মধ্যে বেড়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন বিভাগের এভাবে ডলফিন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান তদন্ত করা প্রয়োজন।

হালদাপাড়ের কুসংস্কার এখনও আছে ॥ হালদাপাড়ের গ্রামগুলোতে এখনও কিছু কুপ্রথা চালু আছে। ডলফিনের চর্বি দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী সুস্থ হয়। এই কুসংস্কারের কারণে অনেকে ফাঁদ পেতে ডলফিন শিকার করে। যদিও এই বিশ্বাস আগের চাইতে কমে গেছে বলে জানা গেছে। তবে হালদাপাড়ের বাসিন্দারা এখনও মনে করেন, মাছ ধরার জালে ডলফিন আটকালে আর কখনই মাছ ধরা পড়বে না। এমন কুসংস্কার আছে হালদার তীর থেকে কর্ণফুলীর পাড়েও।

সাগরে ডলফিনের গতিপথ অনুসরণ করে মৎস্য শিকার ॥ সাগরে যেখানে ব্যাপক মাছের উপস্থিতি সেখানেই ডলফিন বিচরণ করে, খেলা করে। এই বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়ে এখনও অনেক জেলে মাছ ধরে। এছাড়া ডলফিনের মাথায় আঘাতের কারণেও মৃত্যু হয়। সারাদেশে চলতি বছরের গত জুলাই ১০টি ও আগস্টে ১৩টি এবং চলতি মাসের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে।

তবে এটিই সত্য, বাংলাদেশের জলসীমায় কত সংখ্যাক ডলফিন মারা গেছে এ বিষয়ে পরিসংখ্যান নেই কারও। এমনকি এ বিষয়ে সরকারী দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রসঙ্গে কথা বলতে চান না। ডলফিন ও সাগরে জলজ প্রাণী রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হলে এসবের কার্যকারিতা কতটুকু কিংবা অগ্রগতির বিষয়ে কোন তথ্য নেই। এমনকি সরকারী সংস্থাগুলো উদাসীন ডলফিন রক্ষায়।

২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারে ২১টি ডলফিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ।’ তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজার সমুদ সৈকতসহ টেকনাফ, উখিয়া, কুতুবদিয়া এবং সেন্টমার্টিনে মোট ২১টি ডলফিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ ন ম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ডলফিন স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা বাতাসের অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে। তবে জেলেদের জালে আটকা পড়ে অক্সিজেন নিতে না পেরে অল্প সময়েই মারা যায়। জেলেরা এখনও কারেন্ট জাল ব্যবহার করে, যা ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। তবে গত বছর কক্সবাজার উপকূলে বেশি ডলফিন মারা গেছে। এবার সীতাকুন্ড, কুয়াকাটা উপকূল এলাকায় বেশি মারা যাচ্ছে। জেলেরা অসচেতন এবং মান্ধাতা পদ্ধতিতে মাছ শিকার করেন। মাছের ঝাঁক যেখানে বেশি, সেখানেই কিন্তু ডলফিন খেলা করে। মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে বেড়ায়, এটাই ডলফিনের স্বাভাবিক প্রবণতা। যারা অভিজ্ঞ জেলে তারা পুরো এলাকাটি ঘিরে জাল ফেলে এবং ওই জালেই আটকা পড়ে ডলফিন। তখন জাল থেকে বের করতে ডলফিনকে মাথায় আঘাত করে।

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ডলফিন খুবই সংবেদনশীল প্রাণী। এটি স্ট্রোক করেও মারা যায়। প্রাণীটি তার শরীরের শব্দ শুনেও মারা যায়। অনেক সময় জালসহ টেনে নিয়ে চলে যায় তখন জাল বাঁচাতেও জেলেরা আঘাত করে ডলফিনকে। অনেক সময় লেজে রশি বেঁধেও জাল থেকে বের করে। আধুনিক মাছ ধরার পদ্ধতি না থাকায় এবং পরিবেশের জন্য ডলফিনের গুরুত্ব না বুঝায় এমন পরিস্থিতি বাড়ছে। ডলফিন রেসকিউ সম্বন্ধেও জেলেদের প্রশিক্ষণ নেই। পরিবেশ বন বিভাগের বেশ কিছু প্রকল্প আছে ডলফিন রক্ষায়। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু হচ্ছে তা প্রশ্ন থেকে যায়। জেলেরা যদি তাদের থেকে প্রশিক্ষণ পেত এই অবস্থা হতো না। বিজ্ঞানের যুগে অনুমাননির্ভর কথা চলে না। ডলফিনগুলোর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব।

সর্বাধিক পঠিত