প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পারমিতা হিম : বিদেশে আসলে দেশকে গালাগালি করা কি একটা ফ্যাশন?

পারমিতা হিম : বিদেশে এসে দেশকে গালাগালি করা একটা চরম ছোটলোকি। আর এগুলি মানসিকভাবে চরম ছোটলোকেরাই করে। তারই সতীর্থরা দেশে কত খারাপ আছে আর সে নিজে কত ভালো আছে (আসলে মোটেও ভালো নাই) এগুলি দেশের নাদান মানুষকে দেখানোর জন্য এরা করে। যাদের এইসব মানসিক দৈন্যতা নাই তারা দেশকে বেচে, দেশের নামে বাজে কথা বলে অন্য দেশে মিথ্যা আশ্রয়ও নেয় না, নিজের দেশকে কোনোদিন কারো কাছে ছোটও করে না। পশ্চিমে শুধু দেশকে গালাগাল করা বাঙাল না, শিক্ষিত বাঙালিরাও থাকে। তাদেরকে ফলো করবেন। দেখবেন বাংলা গান, বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা, সর্বোপরি বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে তারা কতটা গর্বিত এবং সেগুলিকে তারা কতভাবে চর্চা করে।

কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে হবে এ বাঙালিরা কারা? যারা পশ্চিমের চরম শ্রেণী বিভাজিত সমাজেও উচ্চস্তরে বাস করে। তারা ঐ সমাজের মেইনস্ট্রিমের লোক, তারা শিক্ষক, তারা গায়ক, তারা শিল্পী কিংবা মেইনস্ট্রিমের ব্যবসায়ী। তারা লোকাল বাজারে ঘরের লাউ বেচে না, তারা শুধু বাঙালিদের জন্য গ্রোসারি খোলে নাই, তারা সাদা চামড়ার মালিকের অধীনে প্রতি ঘণ্টার শ্রমের বিনিময়ে কাজ করে না। উল্টোটা দেখেন যারা দেশে উচ্চ মধ্যবিত্ত বা মধ্য মধ্যবিত্ত ছিলো, এখন পশ্চিমে নিম্ন মধ্যবিত্ত (আমাদের দেশের মত দুর্দশা অবশ্যই না, এখানে লোনে বাড়ি, গাড়ি সবই কিনতে পারে তারা, আমাদের দেশে লোন দেয় না—এই যা) তারা আসলে না পারে এ দেশের হতে, না পারে ফেলে আসা দেশের হতে। অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার ধরিয়া রাখার মত বিড়ম্বনা আর নাই।

ওদের তাই হইছে। ওরা আসলে দেশছাড়া হইছে, কিন্তু কোনো দেশের হয় নাই। কোনোদিন হতে পারবেও না। তাই ছিন্নমূল মানুষের মতই ওদের বাপ নাই, মা নাই, ভাই বোন নাই। ওরা সকাল শুরু করে মাকে গালি দিয়ে, মানে দেশকে গালি দিয়ে, আবার সকালে উঠে দেশের খবরই শোনে কারণ এখানের খবর বোঝার বা শোনার সামর্থ্যই তার নাই আর তারপরে শুরু করে দেশকে গালাগালি। সমালোচনা করা আর গালাগাল করা কখনোই এক জিনিস না। আপনি পশ্চিমে থাকেন। পশ্চিমের কাছ থেকে আমাদের কিছুই শেখার নাই সেটা তো না। কিন্তু সেটা কি আপনি নিজে শিখছেন না আপনার দেশের পরিবারকে শিখাইছেন?

উদাহরণ: পশ্চিমে এসব নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকজন বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে খুব হাসাহাসি করে, খুব বড় গলার সমালোচনা করে। ওদের বাসায় যান। ওদের পরিবারের সদস্যদের দেখেন গণতন্ত্রের ছিটেফোটাও পাবেন না। গণতন্ত্রের গ-ও যদি কেউ বোঝে, তাদের পারিবারিক কাঠামো অমন স্বৈরতান্ত্রিক হতে পারে না। অতিরিক্ত হাস্যকর এদের দেশীয় গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা— আমার কাছে।
আমার পশ্চিমা দেশে (আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড) বাঙালিদের সাথে মেশার অভিজ্ঞতা থেকে এগুলি বললাম। উচ্চবিত্ত- নিম্নবিত্ত সবার সাথে মিশে আমার অভিজ্ঞতা এটাই যে যাদের একদমই টাকা পয়সা নাই, শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য বিদেশে আসছে তারা নিজের দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসে। কারণ তারা কখনো নিজে বা নিজের সন্তানদেরকে বিদেশী করে ফেলার কথা ভাবে না (সামর্থ্য নাই বলেই হয়ত)। যারা শুধু আয়ের জন্য আসে নাই, একটু ফুটানি দেখানোর ব্যাপারও আছে তাদের মনভরা ঘৃণা দেখবেন দেশের জন্য। এটা আসলে ঘৃণা না। নিজের অক্ষমতা, আরেক দেশে সবসময় আদারস হিসেবে গণ্য হওয়ার গ্লানি। সে কোনোদিন এদেশের মেইনস্ট্রিম হতে পারবে না— এই যে একটা দুঃখ, এই যে একটা লজ্জা নিয়ে তাকে প্রতিদিন জীবনযাপন করতে হয়, এ লজ্জা থেকেই সে দেশকে গালাগাল করে, তুচ্ছ করে।

এই একই কথা দেশ থেকে আসা সেসব ডি-গ্রেডের সাংবাদিকদের জন্যও প্রযোজ্য যারা দেশ থেকে আসামাত্র দেশের সাংবাদিকতাকে তুলাধুলা করা শুরু করে। এদের এই হীনন্মন্যতার কারণও এটাই। এমন কোনো উন্নত জাতি নাই, এমন কোনো উন্নত পেশা নাই যারা নিজেরা নিজেদের সমালোচনা করে না। সমালোচনার মধ্য দিয়ে তারা অগ্রসর হয়। তবে সেটা সমালোচনা ও তার পাশাপাশি নিজেকেও সেভাবে পরিবর্তন করা। গালাগাল করা, অপমান করা, তুচ্ছ করাÑএগুলি চরম ছোটলোকি। এগুলিকে উৎসাহিত করবেন না। তাতে অনেক ছদ্ম ছোটলোক তৈরি হয়। মানে যে আসলে ছোটলোক না সেও সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে হয়ে যায়। এসব ছোটলোকিকে না বলুন। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত