প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে টিকা

মানবজমিন: অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম। করোনা মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করছে করোনা প্রতিরোধী টিকাগুলো। শুরুতে এক আর দুই ডোজের টিকার প্রাধান্য দেয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকার কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন বুস্টার ডোজের কথা ভাবছে সংস্থাগুলো। এমনিতেই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উন্নয়নশীল

দেশগুলো বেশ পিছিয়ে। আবার টিকাদান কার্যক্রমও ধীরগতিতে চলছে এই দেশগুলোতে। এভাবে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। এই ক্ষতির মুখে পড়বে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো। ওদিকে, বুস্টার ডোজ নিয়ে কোটি কোটি ডলারের মুনাফা কামানোর স্বপ্ন দেখছে টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের টিকা প্রাপ্তির বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে না। টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো কোটি ডলার কামানোর ধান্দায় রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, জীবন বাঁচাতে পরে সেজন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরো সোচ্চার হতে হবে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে অন্য খাতের গুরুত্ব কমিয়ে টিকাদান কার্যক্রমকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে সরকারকে।

ওদিকে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকার সুষম বণ্টন না হলে শুধু পশ্চিমা দেশগুলোতে বুস্টার ডোজ প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়া হলে বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃত্যুহার আরও বাড়বে। কারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য এখনো করোনার টিকার প্রথম ডোজই নিশ্চিত করতে পারেনি। এজন্য বুস্টার ডোজ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত টিকা এসেছে ৩ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার ১৬০ ডোজ। এর মধ্যে ২ কোটি ৫২ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৯ ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। সেই হিসাবে এই মুহূর্তে ৬৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪১ ডোজ টিকা মজুত আছে। এর মধ্যে বিভিন্ন টিকার প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ২৮ হাজার ৩০২ জনকে। আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ৭৪ লাখ ৩০ হাজার ২১৭ জন। এগুলো দেয়া হয়েছে অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীনের তৈরি সিনোফার্ম, ফাইজার এবং মডার্নার ভ্যাকসিন। এদিকে, এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৩ কোটি ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৪৪ জন। গত ২৬শে আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো টিকাদান বিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করেছে ইআইইউ।

এএফপি জানায়, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্ষতির মুখে পড়বে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো। টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। ইতিমধ্যে উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের বুস্টার ডোজ দিতে শুরু করেছে। যেখানে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য টিকা সরবরাহের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অপ্রতুল রয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশ ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ টিকা দিতে ব্যর্থ হবে তারা ২০২২-২৫ মেয়াদে ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর সমান ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ইআইইউ বলেছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই ক্ষতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বহন করবে এবং উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক দূরত্ব বেড়ে যাবে। তারা সতর্ক করেছে, টিকা বিলম্বিত হওয়ায় অসন্তোষ বাড়তে পারে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা প্রায় মোট ক্ষতির তিন-চতুর্থাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোর মাত্র ১ শতাংশের তুলনায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ আগস্টের শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে একটি ডোজ পেয়েছে। বেশিরভাগ টিকার ক্ষেত্রে দুটি ডোজ নিতে হয়। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম মন্থর গতিতে এগিয়ে চলছে।

প্রতিবেদনের লেখক আগাথে ডেমারাইস বলেছেন, দরিদ্র দেশগুলোকে টিকা সরবরাহে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা কোভ্যাক্স তার সামান্য প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পারিপার্শিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষের টিকা প্রাপ্তির ব্যাপারে মানবিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে না। এমনিতেই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। আর টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হবে এই দেশগুলো। তাই সাধারণ মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, জীবন বাঁচাতে পরে সেজন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরো সোচ্চার হতে হবে। বাংলাদেশের টিকা প্রদান বিষয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে অন্য খাতের গুরুত্ব কমিয়ে টিকাদান কার্যক্রমকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে সরকারকে। তা না হলে আগামীতে টিকা পেতে আরও ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানান এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।
এদিকে, করোনা মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে শুরুতে এক আর দুই ডোজের টিকার প্রাধান্য দেয় টিকা উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকার কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় বুস্টার ডোজের পরামর্শ দিচ্ছে তারা। আর এই বুস্টার ডোজ নিয়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখছে টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে, বুস্টার ডোজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া দেশের তালিকা দিন দিনই বাড়ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বৃটিশ সরকার বুস্টার ডোজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বুস্টার ডোজের অনুমোদন দিয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানিও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে ইসরাইল ও চিলি তাদের বয়স্ক নাগরিকদের বুস্টার ডোজ দেয়া শুরু করেছে।
গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা মডার্না, ফাইজার ও তার জার্মান অংশীদার বায়োএনটেক শুধু চলতি বছরের জন্য বুস্টার ডোজ সরবরাহে ৭২০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যালস জায়ান্ট কোম্পানি ফাইজার ও তার জার্মান অংশীদার বায়োএনটেক এবং মডার্না ২০২১ ও ২০২২ সালে করোনা প্রতিরোধী টিকা বিক্রিতে ৬ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কোভিড-১৯ টিকা বিক্রি করে ২০২৩ সালে ফাইজার ও বায়োএনটেক ৬৬০ কোটি ডলার ও মডার্না ৭৬০ কোটি ডলার আয় করবে। এ আয়ের বেশির ভাগই আসবে টিকার বুস্টার ডোজ থেকে। এরপর এ টিকার বার্ষিক বাজার হবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লু টিকার প্রতি ডোজের দাম ১৮-২৫ ডলার। চলতি বছর টিকা প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ৪ থেকে ৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে ফ্লু টিকার। আর ফাইজার যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ ডলার ৫০ সেন্ট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১৯ ইউরো ৫০ সেন্ট মূল্যে প্রতি ডোজ করোনা টিকা সরবরাহ করছে।

বলা হচ্ছে যে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কোভিড টিকা তৈরি ও সরবরাহ করছে, তারা অতি মুনাফা না করলে মানুষ হয়তো পাঁচ ভাগের একভাগ দামে টিকা পেতো।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম ভালো অবস্থায় নেই। সেই হিসেবে দেশের অর্থনীতির ক্ষতিটা বড়ই হবে। কারণ দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও খুব বেশি আসছে না। যতদিন না টিকা প্রদান শতভাগ হচ্ছে ততদিন বিনিয়োগ পরিস্থিতি খারাপ হতেই থাকবে। তাই টিকাদানে জোর দিতে হবে সরকারকে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) যে তথ্য দিয়েছে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ টিকা কার্যক্রম দ্রুত না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান খুলতে পারছি না। যেমন; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পর্যটনসহ অনেক কিছু চালু করা যাচ্ছে না। আগের অবস্থায় কবে ফিরে যাবো বলা যাচ্ছে না। ফলে আমরা ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়ে আছি। এছাড়া আস্থা পাচ্ছি না। একটা অনিশ্চয়তায় পড়ে আছি। টিকা নেয়া হলে একটা আস্থার জায়গা পাওয়া যেতো। বিদেশি বিনিয়োগও আসা শুরু করতো। সুতরাং ইআইইউ’র যে গবেষণা তা ঠিকই আছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

সর্বাধিক পঠিত