প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিঝুম মজুমদার: জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি দলের কর্মীরাই করুক

নিঝুম মজুমদার: বলা হয়ে থাকে ২১ আগস্টের বোমা হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী অবিশ্বাস এনে দিয়েছে। কথাটা আসলে মিথ্যা না। আমি অবশ্য দু’কাঠি বাড়িয়ে মনে করি অবিশ্বাসের সাথে সাথে অসংখ্য ক্রান্তিকাল পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক রাজনীতিবিদ আরেক রাজনীতিবিদকে কিছুটা হলেও যে সম্মান করতেন, সেটিতেও ২১ আগস্ট একধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে সাধারণ জনতার কাছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কিংবা মিশ্র রেটিংসের শিকার হতে পারেন। মানে দাঁড়ায় ভালো কিংবা মন্দ। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে অন্য দলের প্রধানকে গ্রেনেড মেরে মেরে ফেলবার কলঙ্ক কিংবা পরিবারসুদ্ধ বা দলসুদ্ধ একেবারে চিরতরে শেষ করে দেবার মতো কলঙ্ক বোধকরি বাংলাদেশের এই প্রাচীন দলটির কাঁধে আজ পর্যন্ত নেই। জানি না, নেই বলেই কি এই দলটিকে বরণ করতে হয়েছে ১৫ আগস্ট কিংবা ২১ আগস্টের মতো এমন বেদনাবিধুর ষড়যন্ত্রের বিষ?

২১ আগস্ট বোমা হামলার নিম্ন আদালতের রায়ের পরে অনেকের কাছেই অনেক কিছু অবিশ্বাস্য লেগেছে। কিন্তু রায়ের আগে বেশি অবিশ্বাস্য লেগেছিলো জাতীয়তাবাদী দলের নিষ্ঠুর তত্ত্বটি। শেখ হাসিনা নাকি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড এনে নিজেই নিজের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। এমন একটি ঘটনার পর আপনি যতোই খারাপ এবং অস্বাভাবিক মানুষ হন না কেন, আপনার প্রাথমিক ভূমিকা বোধকরি হবে চুপ করে থাকা। আপনার আমলে এমন একটি লজ্জাজনক ও ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, কোথায় আপনি অবনত মাথায় দ্রুত তদন্তের পথে বা বিচারের পথে হাঁটবেন, সেটি না করে আপনি অতি দ্রুততার সাথে বের করে ফেলেছেন এই আক্রমণ আওয়ামী লীগ নিজেই করেছে।
৩০ মে ১৯৮১ সালে স্বৈরশাসক জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর অনেকেই ভেবেছিলো বিএনপি কিংবা খালেদার পরিবার অন্তত এইটুকু বুঝেছে যে ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটলে কিংবা ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত হলে ফলাফলটা হয় এমন তীব্র মৃত্যু। কিন্তু দেখা গেলো ব্যাপারটা আসলে তা নয়। বাপ যেমন গাল শেইভ করতে করতে বলেছিলো,‘প্রেসিডেন্ট মরে গিয়েছে তো কীহয়েছে? ভাইস প্রেসিডেন্ট তো রয়েছে’। ঠিক বড় অদ্ভুতভাবে তারেক যেন বাপের পুরো চরিত্রটিকে এতো কুৎসিতভাবে হৃদয়াঙ্গম করেছে যেখানে আর ষড়যন্ত্রের সাথে পেছন থেকে কলকাঠি নয়, একেবারে হাওয়া ভবন কার্যালয়ে খুনিদের নিয়ে প্রথম সভাটিই করেছে সে। এবার শুধু শেখ হাসিনাই নয়, পুরো দলকে শেষ করে দিতে হবে তার। এতিমের টাকা মেরে দেবার মামলায় খালেদার শাস্তি হবার পর পর জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থকেরা প্রথমে বড় হই হই করে ওঠে। তাঁরা বলে ওঠেন, ‘ধুর এই টাকা খালেদা মেরে দেয়নি’। কিন্তু বছর না যেতেই আমি নিজে সাক্ষী হিসেবে শুনেছি জাতীয়তাবাদী দলের নেতা-কর্মীরা বলছেন অন্য কথা। তাঁরা বলছেন, কতো মানুষ হাজার কোটি টাকা মারে, আর খালেদাকে মাত্র তিন কোটি টাকার জন্য ধরে রেখেছে, এটা অন্যায়। এতো কম টাকার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া অন্যায়। মানে দাঁড়ায়, আপনি আস্তে আস্তে বুঝে ফেলেছেন টাকাটা সে মেরেছে কিন্তু এটি ভেবে নিয়েও আপনি নিজেকে শান্তনা দিচ্ছেন, যে টাকার অংক তো আসলে অনেক কম। এতো কম টাকার এতো বড় শাস্তি অনুচিৎ। মানে আপনি দুর্নীতির মধ্যে একটা কম্পারিজনে চলে গেছেন। অমুকে এতো টাকা মারে আর আমি এতো কম মেরে হলাম নির্বংশ। ব্যাপারটা এমন।

ঠিক একইভাবে ২১ আগস্টের বোমা হামলায় তারেকের যাবজ্জীবন হওয়ার প্রাথমিক জোশের জজবায় জাতীয়তাবাদী মুরিদেরা ব্যাপারটিকে মেনে নিতে না পারবার মতো হালুম-হুলুম করেছিলো। এই যেমন ধরেন, ‘এই বিচার মানি না, মানবো না’, ‘তারেকের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’-এমন। কিন্তু বছর না যেতেই আড়ালে আবডালে বিএনপির চাচা জাতীয় নেতারা বা যুবক জাতীয় মুরিদেরা বলছেন, ‘এই হারামজাদাটার জন্যই আজ দলের এই অবস্থা’। আমি এমন কথা বিএনপির অসংখ্য নেতা ও কর্মীদের মুখে শুনেছি। কিন্তু প্রকাশ্যে তারা এসব বলার সাহস রাখেন না। তবে তারেকের জাফরুল্লাহ চাচা বেশ কিছুদিন আগে তারেককে লন্ডনে আইন পড়বার পরামর্শ দিয়েছেন ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপাতত নাক না গলাবার পরামর্শ দিয়েছেন। এই থেকেও তারেকের প্রতি জাতীয় ঐক্যজোটের মুরুব্বি চাচাদের মনোভাবের কিছুটা অন্তত টের পাওয়া যায়।
আমি অবাক হই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সৌহার্দ্যময় নানাবিধ ভূমিকায়। নির্বাচনের আগে খালেদার সাথে সংলাপের চেষ্টা, কোকো মারা যাবার পর খালেদার বাড়িতে যাবার ঘটনা কিংবা খালেদাকে প্যারোলে মুক্ত করবার এই ঘটনাগুলো আমি সমর্থন করতেই পারি না। উনি অপাত্রে উনার বড় মনের পরিচয় দিয়েছিলেন।

এই রাজনৈতিক সৌহার্দ্য অনেক হয়েছে। অনেক ভদ্রতা দেখানো হয়েছে এই দলটির প্রতি। আর নয়। আপনার কি ধারণা আজকে ১৩ বছর লন্ডনে থেকে তারেক ষড়যন্ত্রের রাস্তায় হাঁটা বন্ধ করেছে? আপনার কি মনে হয় ডিজিএফআই-এর আচ্ছা পিটুনি সে ভুলে গেছে? ভারতের একটি উইংয়ের সাথে তারেক বহু চেষ্টা করেছে গত ইলেকশনের আগে। সিআইএর কাছে পাত্তা পাচ্ছে না। চীন কিংবা পাকিস্তানেও হচ্ছে না তারেকের। গত ১৩টি বছর ধরে এই যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত চরিত্রটি একটুও থামেনি। কিশোরদের নিরাপদ সড়ক আন্দলোনে কীভাবে সে মদদ দিতে চেয়েছে, সেটি পরিষ্কারভাবে একটি টেলিফোন কনভার্সেশনে ফুটে উঠেছে। জামায়াত-শিবিরের প্রাক্তন কর্মী তথাকথিত ভিপি নূরুকে টাকাপয়সা দিয়ে তারেকেরই একটি উইং চালায় এই লন্ডন থেকে। আমার কথা হচ্ছে, এই দেশে আর যেই রাজনীতি করুক বা করতে পারুক কিন্তু জিয়ার ফ্যামিলির কেউ যেন না হয়। এই পরিবারটিকে অসংখ্যবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাস্তা থেকে তারা সরে আসেনি।

ইদানীং প্রায়ই শুনি তারেকের স্ত্রী জোবায়দা কিংবা তারেকের মেয়ে যাইমা জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরবে লন্ডন থেকে এসে কিংবা তাদের পরিবারের কেউ। তেলাপিয়া পাছ যেভাবে পুকুরে মাঝরাতে ঘাই মারে, এসব খবরও কালে ভদ্রে রাজনীতিতে ঘাই মারে। আমি বলি, নো। জিয়ার পরিবারের কেউ তো দূরের কথা, এদের বাসায় বেড়ে ওঠা একটা গাছের পাতাও যেন লোকালয়ে না পড়ে। চিরজীবনের জন্য এদের রাজনীতি শেষ করে দিতে হবে। জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি করুক দলের ত্যাগী নেতা কর্মীরা কিংবা এই দলের শিক্ষিত অংশ কিন্তু কোনোভাবেই জিয়ার ফ্যামিলির কেউ না। ১৫ আগস্টের পর এই সাপেদের ফনায় দেশটা রক্ত ক্ষরণে ক্ষরণে শেষ। এই পরিবারের কেউ রাজনীতিতে থাকা মানেই হচ্ছে ষড়যন্ত্র, গুলি, পেট্রোলবোমা, গ্রেনেড নয়তো রক্ত। জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি দলের কর্মীরাই করুক। তারা ভাষণ দিক। তারা ভোটের কথা বলুক, মানুষের কথা বলুক। কিন্তু তারেক কিংবা জিয়া পরিবারের কেউ? নো ওয়ে। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত