প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম: আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক ওস্তাদদের ‘ডেমোক্রেসি’র একধরনের ডেমো দেখা গেছে

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম: আফগানিস্তানে এতোদিন আন্তর্জাতিক (পুঁজির) ওস্তাদদের ‘ডেমোক্রেসি’র একধরনের ডেমো দেখা গেছে। যে ডেমোতে ভদ্র গোছের ‘শিক্ষিত’ ‘সুশীল’ লোকজন ‘পাবলিক ম্যান্ডেটে(!)’ ক্ষমতার স্বাদ পান। যে ক্ষমতা ব্যবহৃত হয় ওপর ভাসা প্রশাসনিক কাঠামো ও ফাঁপা মিলিটারি বহর তৈরির নামে ওস্তাদদের মুনাফা-উচ্ছিস্টের লুটপাটে। পরনির্ভরশীল ও গণবিচ্ছিন্ন এই ‘ডেমো’ ডেমোক্রেসির দৌড় কতোটুকু তাও দেখা গেলো আশরাফ গনি/ঘানি সাহেবের পলায়নের মধ্যদিয়ে।

আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক ওস্তাদদের সহায়তায় যারা ক্ষমতায় ছিলেন, অযোগ্য হলেও, দুর্নীতি, লুটপাট করলেও তারা অনেকের কাছে ছিলেন ‘মন্দের ভালো’Ñ কেননা তারা ছিলেন ‘ডেমোক্রেটিক’, অর্থাৎ দেশব্যাপী নির্বাচনের মতো ‘ইভেন্ট’ মঞ্চস্থ করে ক্ষমতায় ছিলেন এবং তালেবানদের মতো ‘মন্দ’কে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পেরেছিলেন!

মার্কিন দখলদার ও তাদের তাঁবেদার ‘মন্দের ভালো’ সরকারের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধ আন্দোলন সেভাবে গড়ে ওঠেনি বা উঠতে দেয়া হয়নি। ফলশ্রুতিতে, গত ২০ বছরে কোনো প্রগতিশীল মতাদর্শভিত্তিক জনঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দলও গড়ে ওঠেনি৷ এনজিওগুলো বা ‘উন্নয়ন সহযোগী’ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত থেকেছে কিছু খণ্ডিত ‘উন্নয়ন’ মার্কা ইস্যু নিয়ে, যে উন্নয়ন নিওলিবারেল জামানার বাজার ও কনজিউমার তৈরির জন্য কাজে লাগে। একটা রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে রাজনৈতিক মতাদর্শিক উপাদান লাগে, তা গড়তে সহায়তা করতে সংগত কারণেই ‘আন্তর্জাতিক’ ওস্তাদদের আগ্রহ ছিল না। তালেবান চলে আসবে, এই ভয় দেখিয়ে তাই কারজাই, গনি/ঘানি এবং ‘আন্তর্জাতিক’ (পুঁজির) ওস্তাদেরা তাদের ক্ষমতা ও দখলদারিত্বের পক্ষে সম্মতি আদায় করেছিল।

‘আন্তর্জাতিক’ ওস্তাদেরা নিজেদের স্বার্থানুযায়ী একবার মন্দ পোষে, তো আরেকবার ‘মন্দের ভালো’, যখন যা দিয়ে কাজ হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত প্রভাবাধীন শাসন রুখতে আজকের ‘মন্দ’কে তাদের একসময় কাজে লেগেছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর অজুহাতে, দীর্ঘমেয়াদে মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং তাদের খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই ‘মন্দ’কে সরিয়ে দেওয়া দরকার ছিল। এখন, মন্দই যদি গ্যাস-তেলের পাইপলাইন বসাতে দেয়, তাহলে পয়সা খরচ করে ‘মন্দের ভালো’ পোষা কেন? চাপিয়ে দেওয়া সিস্টেমের ইনইফিসিয়েন্সি ‘মন্দের ভালো’র ওপর চাপিয়ে, ‘মন্দ’কে একটু শাসন-সোহাগে রেখে কিছুদিন স্পেস দিলে ক্ষতি কি? মন্দের ‘বর্বরতা’, নারী অধিকার হরণ, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি প্রজেক্টেড না হলে ওস্তাদদের মুনাফাপন্থী সিভিলাইজেশনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে কি করে?

আজকের দুনিয়ার একেকখানে একেকভাবে, মন্দ ও মন্দের ভালোর বাইনারির মধ্যে আমাদের আটকে রাখে আন্তর্জাতিক ওস্তাদগণ ও তাদের সহযোগীরা। এমনকি এসব আন্তর্জাতিক ওস্তাদেরা নিজ দেশের জনগণকেও একইভাবে ধোঁকা দেয়। লিবারেল- কনজারভেটিভ- ডেমোক্রেটিক- সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ইত্যাদি নামে তারা সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়ানো কৃত্রিম রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করে। কখনো জাতিবাদী-বর্ণবাদী-ধর্মীয় আইডেন্টিটি পলিটিক্স উসকে দিয়ে, কখনো তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, পাবলিকের দৃষ্টি সিস্টেমের মূল সংকট থেকে সরিয়ে, তারা তাদের মুনাফা ও লুটপাটের সিস্টেমকে রক্ষা করে। তাদের স্টেট ও নন-স্টেট এপারেটাসগুলো তাদের রেসিপিতে একেক জায়গায় একেকভাবে ‘মন্দ’ ও ‘মন্দের ভালো’ ধারণা তৈরি করে, আর আমাদের তার মধ্যে বেছে নেওয়ার ‘স্বাধীনতা’ দেয়! সিচুয়েশনকে ম্যানুপুলেট করে, দেশে দেশে এসব ওস্তাদেরা মাফিয়াদের মতো এমন এমন অফার হাজির করে, যা রিফিউজ করার শক্তি-সামর্থ্য-সাহস কিংবা সক্ষমতা আমাদের থাকে না।

ওস্তাদদের বানানো এক মন্দরে বড় করে দেখে, আরেক মন্দরে ছাড় দেওয়া, কিংবা এক মন্দকে হঠাতে আরেক মন্দের ওপর ভর করা, কিংবা এসব কিছুর মধ্যে হতোদ্যম ও নিষ্ক্রিয় হয়ে চুপচাপ বসে খেলা দেখা, দিনশেষে ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’ টাইপের বিলাপসর্বস্ব পরিস্থিতিকেই কেবল ডেকে নিয়ে আসে। কারো মুখাপেক্ষী না থেকে, মন্দগুলোর মধ্যে মন্দের ভালো না খুঁজে, সমষ্টিগতভাবে নিজেদের ‘ভালো’র জন্য সচেতন মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।

এই ‘ভালো’র সংগ্রামকে বিমূর্ত ও খণ্ডিত চেহারায় উপস্থাপন করাও ওস্তাদ ও তাদের সাগরেদদের আরেকটা ভণ্ডামি। সামষ্টিক ভালোর জন্য অর্থবহ সংগ্রামের রাজনৈতিক লক্ষ্য একটাই হতে পারে। সেটা হলো, প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থায় আধিপত্যকারী মুনাফাকেন্দ্রিক, পুঁজিবাদী, নিওলিবারেল সিস্টেমের ওস্তাদ ও তাদের নানা রংয়ের স্থানীয় সহযোগী- অনুসারী- উচ্ছিস্টভোগীদের ক্ষমতার উচ্ছেদ। এই মূল লড়াইটা সামনে আনতে পারলেই কেবল ওস্তাদদের পাশাখেলার ময়দান থেকে এবং নানা চেহারার মোল্লা ওমর- কারজাই- গণি/ঘানি- বারাদারদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত