প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিক্রি হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পত্তি

নিউজ ডেস্ক: সিমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ডুবতে বসা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের একটি বড় অংশ বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। বৈঠকে জানানো হয়, এ বিষয়ে তার সম্মতি পাওয়া গেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। যুগান্তর

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম মিলিয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের জমি আছে প্রায় ৭০ একর। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। অথচ এই পরিমাণ সম্পদ নিয়েও ট্রাস্টের আর্থিক অবস্থা খুবই করুণ। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে অবদান রাখা তো দূরের কথা, বিপুল সম্পদ থেকে নিয়মিত ব্যয়ের টাকাই জোগাড় করতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না থাকায় ট্রাস্টটি ডুবতে বসেছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাস্তবমুখী কল্যাণ নিশ্চিত করতেই মূলত দীর্ঘদিন পরে থাকা অব্যবহৃত সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এই সম্পদ সরকারের কাছে বিক্রি করা লাভজনক হবে নাকি প্রতিযোগিতামূলক দরে স্থানীয় বাজারমূল্যে বিক্রি করা লাভজনক হবে, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এজন্যও তারা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতামত নেবে বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করে সোমবার মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কল্যাণ ট্রাস্টের যেসব সম্পদ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলো বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে কী করা যায়, তা ভাবছি।’

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সোমবার বলেন, ‘ট্রাস্টের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, যা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে কিংবা বেদখলের পথে। আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছিলাম এসব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। অবশেষে কল্যাণ ট্রাস্ট এই উদ্যোগটি নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ট্রাস্টের সব সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা স্থায়ী আমানত করে ব্যাংকে জমা রাখাও ভালো। এতেও মাসে একশ থেকে দেড়শ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে শাজাহান খান বলেন, বঙ্গবন্ধু যে উদ্দেশ্যে ট্রাস্ট করেছিলেন, অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার কারণে সেই উদ্দেশ্য হয়তো পূরণ হয়নি, এরপরও কিছু কল্যাণ হচ্ছে। তবে আরও অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল।

জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের স্থাবর-অস্থাবর জমি থেকে মাসে আয় হয় ২ কোটি ৬ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত ব্যয়ের ঘাটতি মেটানো হয় ট্রাস্টের ১৯২ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত থেকে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ৩২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে রাজধানীর টয়েনবি সার্কুলার রোডে পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশনটি চলছে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। ৩২টির মধ্যে এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা এখনো সচল। অলাভজনক দেখিয়ে গেল বছর এই প্রতিষ্ঠানটিকেও ভাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও ট্রাস্টের কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি লোকসানে ছিল না কখনোই। একসময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠান কোকা-কোলা উৎপাদনকারী তাবানী বেভারেজও বন্ধ হওয়ার পর ভাড়া দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, বর্তমানে মতিঝিলে ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয়ের আংশিক, গুলিস্তান কমপ্লেক্স, পুরান ঢাকার মদনপাল লেনের মডেল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, তেজগাঁওয়ের সিরকো সোপ অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, মিমি চকলেট লিমিটেড, তেজগাঁও ও মিরপুরের তাবানী বেভারেজ, ঢাকার কলেজ গেটের মুক্তিযুদ্ধ টাওয়ার, চট্টগ্রামের বাক্সলী পেন্টস, ইস্টার্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, দেলোয়ার পিকচার্স, মাল্টিপুল জুস কনসেনট্রেট প্র্যান্ট এসব প্রতিষ্ঠানের জমি ও স্থাপনা ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এছাড়া ট্রাস্টের মালিকানাধীন চট্টগ্রামের টাওয়ার একাত্তরের একাংশ এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের দুই খণ্ড জমি ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এর মধ্যে তাবানী বেভারেজসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের জমি ও স্থাপনা ভাড়া দেওয়া হয় গত দুই বছরে। এছাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকার এক একর জমি ভাড়া দেওয়া হয় মাসে ১২ লাখ ২০ হাজার টাকায়। মিরপুরের সোয়া সাত একর ভাড়া দেওয়া হয়েছে মাসে ২৫ লাখ ২৬ হাজার টাকায়। ট্রস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ট্রস্টের কোনো সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর বা দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা (লিজ) দেওয়ার সুযোগ নেই।

জানা যায়, ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ায় এখন পড়ে থাকা অব্যবহৃত সম্পদ বিক্রি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কল্যাণ ট্রাস্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা বিক্রয়যোগ্য সম্পদের তালিকাও তৈরি করেছে।

স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে ট্রাস্টটি গঠন করেন। কথা ছিল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট তার অধীনে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে আয় করবে এবং সেই আয় দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। এ উদ্দেশ্যে ওই সময়ে ‘লাভজনক’ মোট ১৮টি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের অধীনে দেওয়া হয়। পরে যোগ হয় আরও ১৪টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত