প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামারশালায় দ্বিগুণ ব্যস্ততা, সাধুর হাতেও ছুরি চাকু

ডেস্ক রিপোর্ট: কোরবানি ঈদ ঘিরে ব্যস্ততার শেষ নেই। তবে অন্যরকম ব্যস্ততা কামারশালাগুলোতে। দ্বিগুণ কাজ হচ্ছে এখন। আজকের দিনে কামার কিংবা কামারশালার খোঁজ তেমন কেউ রাখেন না। কোরবানির ঈদ এলে চিত্রটা বদলে যায়। এবারও তা-ই হয়েছে। অনেক আগে থেকেই চলছে ছুরি চাকু দা বঁটি তৈরির কাজ। একদিকে তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্রি। সাধুর হাতেও এখন ছুরি চাকু। দেখে ঠিক বোঝা যায় কোরবানির ঈদ আসন্ন। অবশ্য এখন শুধু ‘আসন্ন’ বললে হবে না। একেবারেই দ্বারে। আগামীকাল পবিত্র ঈদ-উল আজহা। রাজধানীর কামারশালাগুলো তাই যারপরনাই কর্মচঞ্চল।

হ্যাঁ, এখন মূলত কোরবানি ঈদ এলেই কামার ও কামারশালার কথা মনে পড়ে। একসময় ব্যাপারটি তা ছিল না। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি সেচ ও গৃহকর্মে সহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরি করতেন কামাররা। গ্রামের কৃষকরা লাঙ্গলের ফলা, কাস্তে, নিড়ানি, কোদাল ইত্যাদি সংগ্রহ করতেন তাদের কাছ থেকে। গৃহকাজে ব্যহারের জন্য সংগ্রহ করা হতো দা বঁটি কুড়াল শাবল হাতুড়ির মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ। গাঁয়ের হাটে বা নিজের বাড়িতে ছোট পরিসরে এ কাজ করতেন কামাররা। এখন পেশাটির আগের অবস্থা নেই। কোনরকমে টিকে আছে। কোরবানি ঈদের সময়টা সবচেয়ে ভাল কাটান তারা।

ঢাকার অন্যতম আলোচিত কামারশালাগুলো কাওরান বাজারে অবস্থিত। এখানে ২৪টির মতো দোকান ও কামারশালা। পশু জবাই ও মাংস তৈরিতে যত রকমের ছুরি চাকু দা ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, সবই পাওয়া যাচ্ছে এখানে। সবকটি দোকানে ছুরি চাপাতি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর পেছনে কামারশালা। কয়লা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে লোহা পোড়ানো হচ্ছে। অনেকক্ষণ আগুনে থেকে লাল বর্ণ ধারণ করা লোহা চুবানো হচ্ছে লবণ পানিতে। তার পর ভারি হাতুড়ি দিয়ে ক্রমাগত পেটানোর শব্দ। দক্ষ হাতে পিটিয়ে দা বঁটি ছুরি চাপাতি তৈরি করা হচ্ছে। কামারশালাগুলো থেকে সরাসরি দা বঁটি চলে যাচ্ছে দোকানে। সবক’টি দোকান পাশাপাশি। সামনের অংশটুকু প্রায় একই রকম দেখতে। সেখানে ছুরি আর ছুরি! হঠাৎ দেখলে হাত পা কেমন ঠা-া হয়ে আসে। কোরবানির এসব উপকরণের কিছু শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কিছু নিচে সাজিয়ে রাখা। সবচেয়ে লম্বা যে ছুরিটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, কথা বলে জানা যায়, সেটি জবাই ছুরি। মানে, পশু জবাইয়ের কাজে এ ছুরি ব্যবহৃত হয়। ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চির মতো লম্বা। সামনের অংশ কিছুটা বাঁকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। এ ছুরি নাকি খুব শক্ত হাতে ধরতে হয়। তাই কাঠের বেশ মজবুত হাতল ব্যবহার করতে দেখা যায়।

পশু জবাইয়ের পরের কাজটি চামড়া ছাড়নো। একটু সতর্কতার সঙ্গে করা চাই। এ জন্য ছোট এক ধরনের ছুরি তৈরি করা হয়েছে। এ ছুরির নাম ‘ছিলা ছুরি’। মাঝারি সাইজের ছুরিটির নাম আবার ‘সাইজ ছুরি।’ কামাররা জানান, এ ছুরি দিয়ে মাংস ‘সাইজ’ করা হয়। কুপিয়ে ‘সাইজ’ করার ব্যাপার আছে। এটিকে তাই কোপ ছুরিও বলা হয়। কোন কোন দোকানি আবার এটিকে বলেন কামেলা ছুরি।

বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন আকার ও আকৃতির চাপাতি। লাঙ্গলের ফলা, রেললাইনের রেল গাড়ির স্প্রিং ইত্যাদি দিয়ে ভারি চাপাতি তৈরি করা হয়েছে। পশুর হাড় কাটার জন্য আরও আছে কুড়াল। আর দা বঁটি তো চাই-ই চাই। সব দোকানেই বেশি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আব্দুর রহমান নামের এক কামারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনাকালীন তাদেরও খারাপ যাচ্ছে। সবাই অপেক্ষা করছিলেন কোরবানির ঈদের জন্য। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় কিছুদিন আগে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। তখন ব্যবসা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই খুব বেশি কাজ করা হয়নি। এখন সব কিছু খুলে দেয়ায় অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে হচ্ছে। বিক্রিও যা আশা করেছিলেন সে অনুযায়ী ভাল বলে জানান তিনি।

প্রবীণ কামার সোবহান বলছিলেন, ‘বেচাকেনা খারাপ না। আবার ভালও না।’ তাই অন্য কাজও করার চেষ্টা করেন তিনি। তবে বাপ দাদার পেশার প্রতিই বেশি টান। একেবারে ছেড়ে যেতে চান না। পারেনও না। তাই এখনও এ পেশায় আছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা আছেন বলেই পশু কোরাবানির কাজটি সহজ হয়েছে। পশু কেনা হয়ে গেলে অনেকেই সরাসরি চলে আসছেন কাওরান বাজারে। প্রয়োজনীয় ছুরি চাকু চাপাতি ইত্যাদি কিনছেন।

সুমন নামের এক ক্রেতা বলছিলেন, গরু কেনা হয়ে গেছে। তাই ছুরি কিনতে এসেছি। এবার নিজেরাই সব কাজ করব। ভাল ছুরি না হলে জবাই থেকে শুরু করে মাংস বানানো দুটোই খুব কঠিন হয়ে যায়। তাই ভাল দেখে ছুরি কিনবেন বলে জানান তিনি।

আবুল হাশেম নামের মধ্য বয়সী এক ক্রেতা আবার পুরনো দা নিয়ে এসেছিলেন। কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, দাটা ভারি আছে। খুব কাজের। তাই একটু ঠিকঠাক করিয়ে নিতে এসেছি।

তবে দেশীয় ছুরি চাকুর পাশাপাশি এখানেও ঢুকে গেছে চাইনিজ পণ্য। চাইনিজ কুড়াল দেদার বিক্রি হচ্ছে। প্রকৃত কামারদের জন্য এ-ও এক দুশ্চিন্তা বৈকি।জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত