প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানবপাচার সিন্ডিকেটের প্রধান সমন্বয়ক ইউরো আশিকসহ গ্রেপ্তার ৭

সুজন কৈরী: ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী, মাদারীপুর এবং গোপালগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে মানবপাচারের আন্তর্জাতিক চক্রের বাংলাদেশি এজেন্ট রুবেল সিন্ডিকেটের প্রধান সমন্বয়ক ইউরো আশিকসহ সাত সদস্যকে গ্রেপ্তর করেছে র‍্যাব।

শনিবার রাত ১টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৮ এর যৌথ অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- আশিক, আজিজুল হক, মিজানুর রহমান মিজান, নাজমুল হুদা, সিমা আক্তার, হেলেনা বেগম ও পলি আক্তার। তাদের কাছ থেকে ১৭টি পাসপোর্ট, ১৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ২টি এটিএম কার্ড, ১৫টি বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা প্রদানের বই, ২টি হিসাব নথি, ২টি এনআইডি, ১০টি মোবাইল ফোনসেট এবং নগদ ৫৬ হাজার ৬৭০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩৩টি অভিযান চালিয়ে ৮৯৬ জন মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ৭৭২ জন পুরুষ ও ২৩৪ জন নারীসহ মোট ১ হাজার ৬ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

র‌্যাব জানায়, গত দুই বছরে ৮০ বাংলাদেশিকে ইউরোপে পাচার করেছে চক্রটি। গ্রেপ্তার ও তাদের আত্মীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের পাওয়া গেছে। দেশে চক্রটির মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজস্ব এজেন্ট রয়েছে। প্রধান সমন্বয়ক আশিক আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে মানবপাচারের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন।

র‌্যাব জানায়, কেরানীগঞ্জের আশিক এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্যের পর মধ্যপ্রাচ্যে যান। লিবিয়ায় দুই বছর অবস্থান করে মানবপাচারের সিন্ডিকেটে জড়ান আশিক। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে কেরানীগঞ্জে থেকে অবৈধ মানবপাচারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন। দুবাইয়ে থাকা মামা রুবেলের মাধ্যমে গড়ে তোলেন ‘রুবেল সিন্ডিকেট’।

রুবেলের মাধ্যমে অনলাইন ভিসা, বাংলাদেশি সংগ্রহ ও নৌপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে দুবাইয়ে মানবপাচার করতেন আশিক। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ সদস্য। বর্তমানে রুবেল দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। চক্রটি বাংলাদেশের ভেতরে পাসপোর্ট বহনের ক্ষেত্রে কৌশলগত কারণে সাধারণত কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে থাকে।

রোববার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গত ২৮ ও ২৯ জুন অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরের তিউনেশিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে প্রায় ৪৩ জন নিখোঁজ হয়। তিউনিসার উপকূল থেকে বিধ্বস্ত নৌকা থেকে ৮৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ, সুদান, মিসর, ইরিত্রিয়া ও চাঁদের নাগরিক রয়েছে। রোববারও ৪৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধারের সংবাদ জানা গেছে।

কমান্ডার মঈন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি মানবপাচারের ঘটনায় র‌্যাব এই চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি বিদেশি চক্রের সঙ্গে যোগসাজসে অবৈধভাবে ইউরোপে মানবপাচার করছে। সিন্ডিকেটটি তিনটি ধাপে মানবপাচারের কাজ করছিলো।

বিদেশে গমনেচ্ছুদের বাছাই: বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচনের সময় চক্রটির দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। বিদেশ গমনেচ্ছুকদের পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকেট কেনাসহ যাবতীয় কাজ সিন্ডিকেট নিজস্ব চেইনে সম্পন্ন করতো। তবে পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথি পাচার চক্রের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিতো। পরে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। ইউরোপে যেতে তারা সাত থেকে আট লাখ টাকা নিতো। সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেয়।

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় প্রেরণ: চক্রটি বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মাধ্যমে লিবিয়া রুট ব্যবহার করছিল। পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি এজেন্টদের যোগসাজসে ৭/৮ দিন অবস্থান করায়। বেনগাজীতে (লিবিয়া) পাঠাতে বেনগাজী থেকে এজেন্টরা কথিত ‘মারাকাপা’ নামক একটি ডকুমেন্ট দুবাইয়ে পাঠিয়ে থাকে। যা লিবিয়াতে যাত্রার আগে দুবাইয়ে অবস্থানরত ইউরোপে মানবপাচারের শিকারদের হস্তান্তর করা হয়। ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্টদের সহায়তায় তাদের বেনগাজী লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়া পর্যন্ত যারা অর্থ পরিশোধ করে থাকে তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যপ্রাচ্যে ট্রানজিট করিয়ে সরাসরি লিবিয়ায় পাঠায়। মূল হোতা রুবেল দুবাই বসে সিন্ডিকেটের সব কার্যক্রম মনিটরিং করছেন।

লিবিয়া থেকে ইউরোপে প্রেরণ: পাচারের শিকার লোকদের ত্রিপলি পৌঁছানোর পর লিবিয়া এজেন্টদের সহায়তায় গাজী, কাজী ও বাবুল নামের তিন বাংলাদেশি তাদের রিসিভ করেন। ত্রিপলিতে ভিকটিমদের বেশ কয়েক দিন আটকে রাখা হয়। এ সময় সিন্ডিকেটটি বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রতিনিধিদের ইউরোপ গমনেচ্ছুকদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। এরপর ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের হস্তান্তর করে। কোনো এক ভোররাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যায়। পথে ভূমধ্যসাগরে দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং জীবনাবসানের ঘটনাও ঘটে।

গ্রেপ্তাকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ভূমধ্যসাগরের বিগত কয়েকটি নৌকাডুবি ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের এই চক্র পাচার করেছে। চক্রটির মাধ্যমে ৭০ থেকে ৮০ বাংলাদেশি অবৈধপথে ইউরোপে পাচারের শিকার হয়েছেন। অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানান, ২০১২-২০১৭ সাল পর্যন্ত লিবিয়া অবস্থানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে রুবেলের বিশেষ যোগসাজস হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়াতে মানবপাচার সংক্রান্ত রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় রুবেল দুবাইয়ে অবস্থান করে সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করছেন। রুবেল বাংলাদেশে তার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে মূল নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করছেন। এ চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে জড়িত রয়েছেন রুবেলের স্ত্রী গ্রেপ্তার সীমা, তার ভাগিনা গ্রেপ্তার আশিক, দুই বোন হেলেনা ও পলি। গ্রেপ্তাররা পাসপোর্ট সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

র‌্যাব জানায়, রুবেলের স্ত্রী সীমার একাউন্টে দেড় কোটি টাকা ও টালি খাতার তথ্যানুযায়ী আরও এক কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বেশ কয়েকটি একাউন্ট আছে বলে জানতে পেরেছে র‌্যাব। রুবেলের বোন হেলেনার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া চেক বইয়ের তথ্যানুযায়ী কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

এছাড়াও কয়েকজনের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা রয়েছে। গ্রেপ্তার আজিজ মোবাইল ব্যাংকিং ও ইলেক্ট্রনিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি মাদারীপুরে মাঠ পর্যায়ের বিদেশে গমনেচ্ছুদের নির্বাচন করে। গ্রেপ্তার মিজানের ওয়ার্কশপ ব্যবসা রয়েছে। মিজান মাঠ পর্যায়ে এজেন্টের সঙ্গে আঞ্চলিক এজেন্ট গ্রেপ্তার নাজমুলের সঙ্গে সমন্বয় করে থাকে। গ্রেপ্তার নাজমুলও মোবাইল ব্যাংকিং ও কসমেটিকস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদারীপুর, শরিয়তপুর, মুকসুদপুর এলাকার আঞ্চলিক পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করে। তারা এসব পেশার আড়ালে অবৈধ মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত।

 

সর্বাধিক পঠিত