প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কল্লোল মোস্তফা: দেশের সকল জেলার পাবলিক হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেনের মতো ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধাটুকুও থাকবে না!

কল্লোল মোস্তফা: উন্নয়নের এতো গল্প শোনানো হলো অথচ করোনা মহামারি শুরুর পর জানা গেলো চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য একেবারে ন্যূনতম অপরিহার্য কতোগুলো আয়োজন যেমন: সেন্ট্রাল অক্সিজেন, আইসিইউ, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ইত্যাদি দেশজুড়ে তো দূরের কথা এমনকি দেশের সকল জেলা সদরের পাবলিক হাসপাতালগুলোতেও নেই!

স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরেও একটা দেশের সকল জেলার পাবলিক হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেনের মতো ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধাটুকু থাকবে না, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মহামারির শুরুতে আইসিইউ কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেন না থাকাকে যদি চিকিৎসা ব্যবস্থার বিশাল ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে মহামারি শুরুর ১ বছরের বেশি সময় পরও সকল জেলার পাবলিক হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা না করাকে মারাত্বক অপরাধ বলতে হবে। কারণ এই অবহেলার কারণে এখন মানুষের মৃত্যু ঘটছে যে মৃত্যুগুলোকে হয়তো প্রতিরোধ করা যেতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, গত এক সপ্তাহে যতো মৃত্যু ঘটেছে তার সাড়ে ৭৭ শতাংশই হয়েছে আইসিইউ সুবিধা কম থাকা সাত বিভাগে। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় আইসিইউ সুবিধা এমনিতেই কম, যাও আছে তার বেশির ভাগই আবার ঢাকা বিভাগে। দেশের মোট ১১৯৫টি আইসিইউর মধ্যে ঢাকা মহানগরেই আছে ৮২৬টি যার বেশির ভাগই (৪৪২টি) আবার বেসরকারি যেগুলোর মারাত্বক ব্যয় বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়। তাহলে কী দাঁড়াল? দেশের মোট আইসিইউর ৭৫ শতাংশই আছে ঢাকায় আর আইসিইউ’র অভাবে রোগী বেশি মারা যাচ্ছে ঢাকার বাইরে। এমনকি ঢাকা বিভাগের এমন সব জনবহুল গুরুত্বপূর্ণ জেলায় কোনো আইসিইউ নেই যে অবাক হতে হয়, এরকম আইসিইউ না থাকা জেলার তালিকায় রয়েছে: মাদারীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর এবং কিশোরগঞ্জ। এসব জেলায় কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বা আইসিইউ প্রয়োজন হলে আশপাশের অন্য জেলায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে। (সূত্র: ৫২% হাসপাতালে আইসিইউ নেই, ৪ জুলাই ২০২১, প্রথম আলো)

চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনীর সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ২০ শয্যা হাসপাতাল, কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ নেই। রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল, রংপুরের তাজহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, হারাগাছ ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, লালমনিরহাট সরকারি কলেজ (আইসোলেশন সেন্টার) এবং রেলওয়ে হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীতে করোনা রোগীদের জন্য কোনো আইসিইউ নেই।

রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাট সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই। ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা ও শেরপুর সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা নেই। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল, দক্ষিণ সুরমা ও রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং খাদিমপাড়া ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই।

ইনফ্যাক্ট দেশে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ১০০টি হাসপাতালের মধ্যে ৫২টিতেই আইসিইউ সুবিধা নেই যার মধ্যে ৩৫টি হাসপাতালই জেলা সদর হাসপাতাল! চিন্তা করেন জেলা সদর হাসপাতালে একটিও আইসিইউ নেই! করোনা মহামারি শুরু হওয়ার ১ বছরেরও বেশি সময় পরে কি ভয়াবহ করুণ অবস্থা! (সূত্র: ৫২% হাসপাতালে আইসিইউ নেই, ৪ জুলাই, ২০২১, প্রথম আলো)

শুধু আইসিইউ-ই নয়, করোনা আক্রান্ত রোগীকে বেশি মাত্রায় অক্সিজেন দিতে হলে যে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার প্রয়োজন হয় সেটাও দেশের সকল জেলার পাবলিক হাসপাতালগুলোতে করা হয় নি এক বছরের বেশি সময় পাওয়ার পরও!… পর্যন্ত সারা দেশে করোনার জন্য নির্ধারিত ১০০টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ২১টিতে এই ব্যবস্থা করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। (সূত্র: হঠাৎ বাড়ল অক্সিজেন সিলিন্ডার, কমল হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, ৪ জুলাই, প্রথম আলো)

আর এই অতিপ্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকার কারণে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে তা বগুড়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়। হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা সংকটের কারণে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টায় সাতজনের মৃত্যু হয়ে এবং আরও অন্তত ১০ জনের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ২০০ শয্যার ওই হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকলেও হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা মাত্র ২টি থাকায় দু’জনের অতিরিক্ত আর কোনো রোগীকে উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয়নি ফলে অনেক রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। (সূত্র: বগুড়ায় হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা সংকট: ১৩ ঘণ্টায় মৃত্যু ৭ সংকটাপন্ন ১০, সমকাল, ২ জুলাই ২০২১)
এটা শুধু একটা হাসপাতালের ঘটনার উদাহরণ, সারা দেশে যেসব হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা নেই, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সরবরাহ নেই, আইসিইউ নেই সেখানকার সংকটাপন্ন রোগী ও তাদের স্বজনদের প্রতিনিয়ত কি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে তা ভুক্তভোগী না হলে অনুমান করা কঠিন। অথচ সময় মতো যথাযথ উদ্যোগ নিলে এইসব সামগ্রীর সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব ছিল। মহামারিতে অনেক সময় অনেক মৃত্যুই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে, কিন্তু যে মৃত্যুগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা যেতো, যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সেগুলো যে প্রতিরোধ করা হলো না সেই আফসোস ও হাহাকার নিয়ে আমরা কিভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করব! ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত