শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৯ জুন, ২০২১, ০১:০৪ রাত
আপডেট : ২৯ জুন, ২০২১, ০১:০৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং, আমাদের উচ্চশিক্ষা

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: পাকিস্তানের দুটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছঝ ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং হলো ৩৫৫ এবং ৩৭৩! আর কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানের তৃতীয় সেরা প্রতিষ্ঠান যার ওয়ার্লড র‌্যাংকিং হলো ৪৫৪! অর্থাৎ তাদের ৩টি প্রতিষ্ঠান ৫০০-র মধ্যে। আর ৬৫১-৫০০-র মধ্যে আছে আরো একটি প্রতিষ্ঠান। আর আমাদের ১ থেকে ৮০০-র মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এইটা আমার অহমবোধে মারাত্বক আঘাত হেনেছে। এই জন্য আমি এটা ভুলতে পারছি না। আমি ভাবি আমার রাষ্ট্রের কর্নধার যারা তাদের অহমবোধে লাগে না? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যারা চালায় তাদের অহমবোধে লাগে না? যারা চালায় তাদের কাছে কেন জবাবদিহি দাবি করা হচ্ছে না?

আমার কিউরিয়াস মাইন্ড কিউরিয়াস হয়ে কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট টি একটু ঢু মারতে গেছিলাম। আগে বলে নেই আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঢু দিলে মনেই হবে না এইটা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট। বরং মনে হতে পারে কোন রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট। তারপর ওদের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পেইজে গিয়ে বুঝলাম কেন তারা র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে। প্রথম যেটা স্ট্রাইক করেছে সেটা হলো ওদের সকল শিক্ষকের ন্যূনতম যোগ্যতা পিএইচডি। বিশ্ববিদ্যালয় হলে এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয় স্ট্রাকিং পয়েন্ট হলো সকল শিক্ষকের ভালো মানের ভালো সংখ্যক প্রকাশনা আছে এবং সেগুলো তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন বিভাগের ওয়েবসাইটে ঢুকলে ৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে বড়জোর ২ থেকে ৬ জনের ডাটা পাবেন। রেঙ্কিং-এ ভালো করার কিভাবে আশা করেন?

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তান কায়েদে আজম বলে ডাকে। তিনি পাকিস্তানের জাতির পিতা। সেই জাতির পিতার নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৬৭ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি পাকিস্তানের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক হলে র‌্যাংকিংয়ে এটি আরো ভালো করত। কিন্তু যেহেতু এটি অনেকটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কলা এবং বাণিজ্যিক অনুষদও আছে তাই রেঙ্কিং-এই একটু পিছিয়ে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামেও একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে প্রধানতমটি হলো গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যেটি শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষে ২০০১ সালে স্থাপিত হয়। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তাই ধরে নিলাম তারা এটাকে অবহেলা করেছে। কিন্তু আজ প্রায় ১২ বছরের অধিক সময় ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায়। এই সময়ে এটাকে একটি অনন্য উচ্চতায় নেওয়ার কোন প্রচেষ্টা দেখেছি? বরং উল্টোটা দেখেছি। সবচেয়ে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ একজন ভিসি নিয়োগ দিয়ে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ ও আন্দোলন সত্বেও পূর্ন মেয়াদ পার করতে দেওয়া হয়েছে। জাতির পিতার নামে যেই বিশ্ববিদ্যালয় সেই বিশ্ববিদ্যালয় যদি জাতির পিতার কন্যা ক্ষমতায় থাকতেই এত অবহেলিত থাকে তাহলে এইটা নিয়ে কি আর কোন আশা করা যায়? এই বিশ্ববিদ্যালয় কি বঙ্গবন্ধুর নামের সাথে যায়? এইরকম প্রতিষ্ঠান উনার নামে থাকার চেয়ে না থাকা শ্রেয়। বঙ্গবন্ধুর নামে কোন প্রতিষ্ঠান থাকলে সেটি এমন হওয়া উচিত যেটি উনার নামের উচ্চতার সাথে সমানুপাতিক হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব বিশ্বের দরবারে যে মানুষটি সবচেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে সেই মানুষটির নাম এস এন বোস বা সত্যেন বোস। উনার হাত ধরেই আমাদের কার্জন হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের অফিস কক্ষে কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের জন্ম হয়। সেই উনার নামেও একটি সেন্টার আছে। সেটিও ৫৬টি গবেষণা সেন্টারের মধ্যে জাস্ট এনাদার ওয়ান! সত্যেন বোসের নামেও কোন প্রতিষ্ঠান থাকলে সেটি এমন হওয়া উচিত যেটি উনার নামের উচ্চতার সাথে সমানুপাতিক হয়। ৫৬টি গবেষণা সেন্টার থেকে বছরে ১০টি করে গবেষণাপত্রও যদি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হতো তাহলেওতো র‌্যাংকিংয়ে আমরা অনেক ভালো করতাম। ৫৬টি গবেষণা সেন্টারের অনেকগুলোকেই যতদ্রুত সম্ভব বন্ধ করা সম্ভব। বেঁচে যাওয়া বরাদ্দ দিয়ে যেগুলো বেঁচে থাকবে সেগুলোকে অর্থায়ন করলে তারা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারতো।

এইখানে আমাদের এলামনাইরা অবদান রাখতে পারতো। তারা বোস সেন্টারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এখানে যদি আন্তর্জাতিক মানের ২০ থেকে ৩০ জন পোস্ট-ডক নিয়োগ দেওয়া যেত তাহলে এর মান বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যেত। তাছাড়া এর কোন ভালো ভৌত অবকাঠামো নাই। আছে কেবল পরিচালকের জন্য একটি এবং অফিস হিসাবে ব্যবহারের জন্য একটি রুম। কি লজ্জার। কলকাতার বোস সেন্টার থেকে মাঝে মাঝে স্কলাররা যখন বেড়াতে আসে খুব লজ্জা পাই। এই লজ্জা কেবল আমার না। জাতি হিসাবে আমাদের সবার। তাই অবকাঠামো নির্মাণেও এলামনাইরা ভূমিকা রাখতে পারে। কেবল বোস সেন্টার এবং উনার নামের উছিলাতেই আমরা কিন্তু বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতাম। আর এর ফলে আমাদের নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতো ফলে দেশ উন্নত হতো। এই উন্নয়ন হলো আসল উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন।                   লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়