প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফেসবুক হচ্ছে সাইবার অপরাধীদের ভয়ঙ্কর অস্ত্র !

ডেস্ক নিউজ: সোহাগ হোসেন (২৮)। ভয়ঙ্কর এক সাইবার অপরাধী। রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর থানাধীন শ্যামলী এলাকায় তার বসবাস। তিন মাস ধরে ফেসবুকের ভুয়া আইডি খুলে উস্কানিমূলক ও জঙ্গীবাদী ছবি আপলোড করে আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ জঙ্গীবাদ প্রচারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। সিটি ইন্টেলিজেন্স এ্যানালাইসিস ডিভিশনের সাইবার ইন্টেল টিম অনলাইন মনিটরিং করার সময়ে দেখতে পায়, গত ১ মার্চ থেকে গত ৫ জুন পর্যন্ত তার আইডি থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশে অপপ্রচার ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদান করে আসছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের নাম-পরিচয় গোপন করে ছদ্মবেশ ধারণ করে রাষ্ট্র বিরোধী মিথ্যা, ভিত্তিহীন গুজব প্রচার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটানোর অপপ্রয়াস চালানোর বিষয়টি নজরে আসার পর গত ৫ জুন রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার শ্যামলী এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় সোহাগ হোসেনকে। তাকে গ্রেফতার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। এসময় তার হেফাজত হতে ১টি মোবাইল ও ১ টি সিম উদ্ধার করা হয়। রিমান্ডে এনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা রুজু হয় রমনা মডেল থানায় ।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) সোহাগ হোসেনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে সাইবার অপরাধের নেপথ্যের অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী বের হয়ে এসেছে।

সিটি ইন্টেলিজেন্স এ্যানালাইসিস ডিভিশনের সাইবার ইন্টেল টিমের অনলাইন মনিটরিং করা এক কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধীদের ‘ভয়ঙ্কর অস্ত্র ফেসবুক’। ভুয়া এ্যাকাউন্টস বা আইডি খুলে অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে সাইবার অপরাধীরা। এই ধরনের অপরাধ করে যাতে অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে না পারে সেজন্য অনলাইনে মনিটরিং করছে সাইবার ইন্টেল টিম।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিরোধ, প্রেমের ফাঁদে ফেলা, প্রেম নিবেদন, প্রেম প্রত্যাখ্যান, পূর্বশত্রæতার জের ধরে ফেসবুকে অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও নারী-কিশোরীরা। সহিংস উগ্রবাদ, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ, গ্যাং কালচার, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, পাইরেসি, আসক্তি এর সবই হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে, যার প্রধান ও অন্যতম বাহন ফেসবুক। সূত্র: জনকণ্ঠ

বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম এ্যাওয়ারনেস (সিসিএ) ফাউন্ডেশনের গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। বর্তমানে দেশে যত সাইবার অপরাধ হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশের শিকার হচ্ছে নারী ও কিশোরীরা। প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা ১১ ধাপে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিই নতুন। নারী ভুক্তভোগীর হার বেড়েছে ১৬.৭৭ শতাংশ। তবে ভুক্তভোগীর ৮০.৬ শতাংশই আক্রান্ত হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে জেঁকে বসেছে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেয়ার ঘটনা। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের পরও এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কপিরাইট আইন লঙ্ঘন, অনলাইনে পণ্য বিক্রি ও কাজ করিয়ে নেয়ার কথা বলে প্রতারণা। সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের মধ্যে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির শিকার হচ্ছে ৬.৫১ শতাংশ। কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনা ৫.৫৮ শতাংশ। অনলাইনে কাজ করিয়ে নিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে ১.৪০ শতাংশ। জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এগুলো দেশে নতুন ধরনের অপরাধ।

বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা শীর্ষক সিসিএ ফাউন্ডেশনের ওই গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে ৬৭.৯ শতাংশ নারী। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের শিকারে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে তারা। এই অপরাধের শিকার নারীর হার ১৬.৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি। ছবি বিকৃত করে অনলাইনে অপপ্রচারের শিকার হওয়া নারীর হার ১১.২ শতাংশ। সংঘটিত অপরাধের চেয়ে জরিপে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে পর্নোগ্রাফি। এই অপরাধ ২.২৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.০৫ শতাংশে। থেমে নেই অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির ঘটনাও। এই অপরাধ ১৩.৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭.৬৭ শতাংশ। ভুক্তভোগীর ২২.৩৩ শতাংশই এই ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে। ছবি বিকৃত করে অনলাইনে অপপ্রচারের ঘটনা বাড়ছে। দেশে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণাও।

সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এমন এক আইনজীবী বলেন, বর্তমানে ডিভিওকেন্দ্রিক অপরাধ বেড়ে গেছে। ব্যক্তিগত ভিডিও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে নারীদের ব্ল্যাকমেল করার মতো অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। এ ছাড়া ভুয়া ফেসবুক আইডি, ইউটিউবে ফেক ভিডিও ছেড়ে দেয়াসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তদের আইনী প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কম। কারণ সাক্ষ্য-প্রমাণ দাঁড় করিয়ে ঘটনা প্রমাণ করা খুবই কঠিন। অনেকক্ষেত্রে আসামিকে জেনেও ভিকটিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে প্রমাণ করতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক ডিভাইস নেই এবং এ বিষয়ক ল্যাবও তেমন গড়ে ওঠেনি। ফলে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। কেউ কেউ সন্দেহজনকভাবে গ্রেফতার হলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীকে আবার হুমকি দিচ্ছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষের স্বীকারোক্তি:

ফেসবুক কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ফেসবুক যে ভুয়া এ্যাকাউন্টে ভরা, এ কথা এখন সবাই জানে। ফেসবুকের সাম্প্রতিক ট্রান্সপারেন্সি প্রতিবেদনে সে তথ্যই আবার প্রমাণও হয়েছে। ফেসবুক গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩২০ কোটি ভুয়া এ্যাকাউন্ট সরিয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। গত বছরের একই সময়ে মুছে ফেলা এ্যাকাউন্টের পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি। এ সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি ১ কোটি ১৪ লাখের মতো ঘৃণাত্মক মন্তব্য ছড়িয়েছে। ২০১৮ সালের ঐ সময়ে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৫৪ লাখের মতো। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ফেসবুক কি সব ভুয়া এ্যাকাউন্ট ধরতে পারছে?

ফেসবুকের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও) ডেভিড এম. ওহেনার বলেছিলেন, ফেসবুকে প্রতিমাসে যে পরিমাণ এ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয় তার ১০ শতাংশ নকল। এ্যাকাউন্টগুলো সম্পর্কে তার ভাষ্য, একই ব্যক্তির একাধিক এ্যাকাউন্ট এগুলো। এসব এ্যাকাউন্টে অন্যান্য এ্যাকাউন্টের মতো সত্যিকারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ফেসবুকে ২-৩ শতাংশ এ্যাকাউন্ট আছে, যা পুরোপুরি ভুয়া। এগুলো স্প্যাম ছড়ানোসহ নীতিমালা ভঙ্গের কাজ করে। ব্যবসা ও প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট বিজনেস ইনসাইডের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া এ্যাকাউন্ট সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশের আগে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমটিতে নকল এ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৬ শতাংশ আর ভুয়া এ্যাকাউন্ট আছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ সম্প্রতি ফেসবুকে ভুয়া ও নকল এ্যাকাউন্ট বেড়ে গেছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের প্রায় ২৫০ কোটি এ্যাকাউন্টের মধ্যে ৫ শতাংশ ভুয়া এ্যাকাউন্ট। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলেও এসব ভুয়া এ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা যায়নি। তবে আগের তুলনায় ভুয়া এ্যাকাউন্ট বন্ধ করার হার বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ঘিরে ভুয়া খবর ছড়ানো ঠেকাতে ফেসবুকের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি এ তথ্যে বোঝা যায়। ফেসবুক এ ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও ইঙ্গিত দেন ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৯৫টি অনুরোধ করা হয়েছে। এ অনুরোধের মাধ্যমে ১২৩টি এ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ৮০টি জরুরী অনুরোধ ও ১৫টি আইনী প্রক্রিয়ায় অনুরোধ করা হয়। ফেসবুক সরকারের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ৪৩ শতাংশ তথ্য সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে জরুরী অনুরোধে ৪৮ শতাংশ ও আইনী প্রক্রিয়ায় ২০ শতাংশ তথ্য দেয়া হয়েছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া কিশোরীদের মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার দিন শেষ। কেউ যদি এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়, তাহলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা নিতে পারে। কারো ফেসবুক হ্যাক হলে তাদের প্রযুক্তি ও আইনগত সহায়তা দিতে আইসিটি বিভাগের অধীন ‘সাইবার সিকিউরিটি হেল্প ডেস্ক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ছাড়াও সিটি-ইন্টেলিজেন্স এ্যানালাইসিস ডিভিশনের সাইবার ইন্টেল টিম অনলাইন মনিটরিং করছে। ভুয়া বা ফেক ফেসবুক আইডি দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে প্রেম নিবেদন, প্রতারণা, গুজবে দেশকে অস্থিতিশীল করা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে অপপ্রচার ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদান করাসহ সাইবার অপরাধের সব ঘটনাই মনিটরিং করছে, ধরাও পড়ছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত