শিরোনাম
◈ রাজধানীতে গ্যাস লিকেজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দগ্ধ ১০ জন ◈ পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলা‌দেশ ওয়ানডে দলে লিটন ও আফিফ ◈ মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় প্যানিক, সন্ধ্যা থেকেই তেল নেই অনেক পাম্পে ◈ পুনরায় চালু হচ্ছে বন্ধ থাকা ৭টি পাটকল ◈ মাঝ আকাশে নিখোঁজ ভারতের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ◈ এয়ারপোর্ট ও বুর্জ খলিফা টাওয়ার ধ্বংসের ভিডিও নিয়ে যা জানা গেল ◈ জয়ের ফাঁস করা তালিকায় শীর্ষ চাহিদাসম্পন্ন ১৫ নায়িকা ◈ চলছে তালিকা তৈরির কাজ, চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের ধরতে যৌথ অভিযান ◈ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন: থামাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বিশ্ব শক্তির ◈ খামেনির ছেলেকে পছন্দ নয়, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে চান ট্রাম্প

প্রকাশিত : ০৫ জুন, ২০২১, ০৩:০৪ রাত
আপডেট : ০৫ জুন, ২০২১, ০৩:০৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন পরিবেশ, দুই দশকেও মেলেনি পলিথিনের বিকল্প

নিউজ ডেস্ক: প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব চারপাশ। পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পর গত দুই দশকে শুধু রাজধানীতেই প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। অথচ প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার কিংবা পলিথিনের বিকল্প তৈরিতে নেই কোনো উদ্যোগ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গলদ ও নগরবাসীর অসচেতনতায় ভয়ংকর পরিণতির পথে এগোচ্ছে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ ব্যাপারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে হাই কোর্টের একটা নির্দেশনা আছে। আমরা তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিচ্ছি। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে সোনালি ব্যাগ জনপ্রিয়তা পায়নি। পাট থেকে তৈরি পলিব্যাগও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছি না।’ এ বাস্তবতায় ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ করি, প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করি’ স্লোগান নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

বুড়িগঙ্গার পাড়ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মহানগরী ঢাকা। এ নদীর সৌন্দর্য এখন কেবল পাখির চোখেই মিলবে। কাছে গেলে চোখে পড়ে গা ঘিনঘিন করা নোংরা। কেরানীগঞ্জের ৮০ বছরের বৃদ্ধ মন্টু মিয়া নিজের চোখেই দেখেছেন কীভাবে সুপেয় পানি আর মাছে ভরা বুড়িগঙ্গার তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে পলিথিন। তিনি বলেন, ‘আগে এই বুড়িগঙ্গার পানি আমরা খেয়েছি। আর এখন তা ময়লার ভাগাড়। যেন পুরো নদীটাই একটা ডাস্টবিন। বেশির ভাগই পলিথিন বর্জ্য।’

বেড়িবাঁধসংলগ্ন কামরাঙ্গীর চর এলাকার স্লুইস গেটের মুখে দেখা যায় পলিথিনের স্তূপ। বের হতে পারছে না পানি। ময়লার স্তূপে উড়ছে বিভিন্ন রঙের পলিথিন। শুধু পলিথিন নয় চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের নানারকমের বোতল, ব্যাগ। মিরপুরের রূপনগর খালে গিয়ে দেখা যায় বদ্ধ পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল। শুধু নদী, খাল নয় পানি নিষ্কাশনে রাজধানীজুড়ে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে পলিথিনে।

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমোডর মো. বদরুল আমিন বলেন, ‘রাজধানীর খাল-নর্দমা পরিষ্কার করে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় প্লাস্টিকের বোতল। কোমল পানীয়র বোতল থেকে শুরু করে এমন কিছু নেই যে আমরা বের করিনি। আর এ কারণেই বর্ষা এলেই রাজধানীজুড়ে জলজট তৈরি হয়।’

রাজধানীর বর্জ্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায় রাজধানীতে ২০০৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৭৮ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হতো। সেখানে ২০২০ সালের হিসাব দাঁড়িয়েছে ৬৪৬ টনে। জলাশয় ছাড়াও হাটবাজার, বাসাবাড়ি, দোকানপাট সব জায়গায় বাড়ছে পলিথিনের ব্যবহার। গত ১৫ বছরে ৩ গুণের বেশি বেড়েছে পলিথিনের ব্যবহার। রাজধানীর সবচেয়ে বড় খুচরা বাজার কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায় পলিথিনে মুড়ে বিক্রি করা হচ্ছে সবজি। প্রতিটি দোকানে একই চিত্র।

ভয়ংকর পরিণতির পথে প্রাণ-প্রকৃতি : মাটির নিচে প্লাস্টিক ৫০০ বছরেও পচে না; তাই প্লাস্টিকের কারণে ধ্বংস হচ্ছে মাটি ও পানির জৈবগুণ। খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা মানুষের দেহে ঢুকে ক্যান্সার ও অন্যান্য জটিল রোগ তৈরির কারণ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ইতালির বিজ্ঞানীরা গর্ভস্থ শিশুর গর্ভফুলে প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন। প্লাস্টিক বর্জ্যরে ওপর ২৪টি গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ বছরের মার্চে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা মাছসহ নানা প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এগুলো ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

এ গবেষণায় অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ওপেন সোর্স টেকনোলজি ব্যবহার করে দেখেছি ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছি আমরা। প্লাস্টিক বোতল নদীতে ফেলে দেখা গেছে তিন মাসে একটা বোতল ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এখানে তো আমরা একটা বোতল ট্র্যাক করেছি। অথচ সাগর, নদী, জলাশয়ে হাজার হাজার প্লাস্টিক বোতল ফেলা হচ্ছে। এভাবে প্লাস্টিক বোতল ছড়াতে থাকলে আমরা ধারণা করতে পারি ২০৫০ সালে জলাশয়ে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বোতল বেশি থাকবে।’

সবচেয়ে বড় ক্ষতি বয়ে আনছে কৃষিতে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার কৃষক খালেক মিয়া বলেন, ‘আমাদের কাছে আতঙ্কের নাম এখন পলিথিন। যেহেতু এটা কখনো মাটিতে মেশে না, পচেও না তাই মাটির গুণ নষ্ট করে ফসলের ক্ষতি করে।’ একই এলাকার জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমাদের ধলেশ্বরী নদীতে প্রচুর মাছ ছিল। বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত। এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। জালে মাছের বদলে উঠে আসে নানারকমের বর্জ্য।’

সরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গলদ : নগরবিদদের মতে সরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গলদে ঠেকানো যাচ্ছে না প্লাস্টিকের দূষণ। উন্নত বিশ্বের মতো নেই পচনশীল-অপচনশীল দ্রব্য আলাদাকরণের ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যোগ হওয়া নাগরিক অসচেতনতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে পচনশীল ও অপচনশীল দ্রব্য ফেলার জন্য আলাদা ঝুড়ি রয়েছে। কিন্তু নাগরিকরা যার যেখানে ইচ্ছা সেখানেই ময়লা ফেলেন। ডাস্টবিনের চেয়ে বরং ঝিলের পাড়ে ও পানিতে বেশি ময়লা দেখা যায়।

সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট জার্নালে গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ৮৭ শতাংশই পরিবেশবান্ধব সঠিক ব্যবস্থাপনায় নির্মূল করা হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘আইনকে কেবল কিতাবে রেখে কোনো লাভ নেই। যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেললে কারও শাস্তি হয় না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনসম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারের ভীষণ অনীহা। নেই কোনো বিনিয়োগ।’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক বলেন, ‘ময়লা ফেলার জন্য লোহার ও প্লাস্টিক ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছিল সিটি করপোরেশন এলাকায়। কিন্তু সেগুলো থাকছে না, চুরি হয়ে যাচ্ছে।’

২০০২ সালে আইনের মাধ্যমে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমন বাস্তবতায় ওই আইন কার্যকরে এ বছরের জানুয়ারিতে ফের সেই আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এক বছরের সময় বেঁধে দিয়েছে উচ্চ আদালত। পরিবেশ অধিদফতরসূত্রে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৮৯৭টি অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে ৫ হাজার ৯৫৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২০ কোটি ৮১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। পলিথিন ব্যবহারের কারণে ৯১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।

১৯ বছরেও মেলেনি পলিথিনের বিকল্প : পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও নেই কোনো বিকল্প পণ্য। পাটের ব্যাগকে জনপ্রিয় করতে পারেনি সরকার। প্লাস্টিক বর্জ্যরে দূষণ ঠেকাতে পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং করাটা অপরিহার্য মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে বহু অবৈধ কারখানা গড়ে উঠেছে যেখানে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে নতুন পণ্য উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এ প্লাস্টিক শিল্প ঘিরে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। পাট থেকে পলিব্যাগ, ফেলে দেওয়া বোতল থেকে ফ্লেক্স কিংবা পলিব্যাগ পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উদ্ভাবনের মতো বিষেয়গুলোকে খুব একটা আমলে নেয়নি সরকার। এমনকি এ নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণারও উদ্যোগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের প্রচুর চাহিদা তাই এটা বন্ধ করা যাবে না। বরং এর রিসাইক্লিং কিংবা বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। তাতে এ খাতে ব্যাপক কর্মস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়