প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] সম্প্রসারণমূলক মুদ্রা ও রাজস্বনীতি বজায় রেখে জীবন-জীবিকা সংরক্ষণের ‘আউট অব বক্স’ বাজেট দরকার : ড. আতিউর রহমান

ভূঁইয়া আশিক রহমান : [২] আমাদের নতুন সময়কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্প ও কুটির-ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য প্রণোদনাগুলোও আগামী বাজেটে চলমান রাখতে হবে, যাতে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়

[৩] আগামী দিনে অতি ক্ষুদ্র, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি তথা এমএসএমই খাতের বিকাশ নিশ্চিত না করতে পারলে স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতার কারণে আমরা গভীরতর সংকটে পড়তে পারি।

[৪] বাজেটে করজাল বিস্তৃত করে এনবিআরের অটোমেশন ও জনবল বৃদ্ধি করলে রাজস্ব হার বাড়বে। বিশেষ করে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, অটোমেশন এবং জবাবদিহিতার মধ্যে আনার কোনো বিকল্প নেই।

[৫] খাদ্যশস্যের পাশাপাশি কৃষির অন্য উপখাত অর্থাৎ মাছ, গবাদি পশু, পোলট্রির দিকেও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এসব উপখাতে শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা এখন যুক্ত হচ্ছে। তাদের জন্য সকল নিয়মনীতি সহজিকরণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন খুবই জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং এমএফআইগুলো অংশিদারিত্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এ ক্ষেত্রে খুবই ভালো ফল পাওয়া যাবে।

[৬] আসন্ন অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অনুপাত মোট বাজেটের ৭ শতাংশ হওয়া দরকার । আসলে পুরো বাজেটটিই হতে হবে স্বাস্থ্য,শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষাসহ মানুষের ওপর বেশি করে বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে নয়া ধাঁচের।

[৭] দুই হাজার বিশ সাল ছিলো আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন বছর। সে বছর এদেশে মহামারি করোনা মহামারি শুরু হয়েছিলো। ২০২০-২০২১ সালে মহামারির মধ্যে বাজেট তৈরি এবং তা সংসদে উত্থাপন করে পাস করানো যাবে কিনা তা নিয়েই ছিলো অনেকের সন্দেহ। কিন্তু এপ্রিলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিডিপির ৪ শতাংশের বেশি (পরবর্তী সময়ে সর্বমোট ৪.৪ শতাংশ) প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর এই সাহসী উদ্যোগসমূহ শেষ পর্যন্ত বাজেটকে মানবিক করতে পেরেছিলো। তার সুফল আমাদের সমাজ ও অর্থনীতি পেয়েছে এবং এখনও পাচ্ছে।

[৮] বাংলাদেশ একটি শক্ত সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বলেই এমন প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করা সম্ভব হয়েছিলো। ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচির আলোকে নীতিনির্ধারকেরা শেষ পর্যন্ত একটি সময়োপযোগী বাজেট পাস করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মেগা-প্রকল্পগুলোর কর্মকাÐ অব্যাহত রাখার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো, এর সুফল মিলেছে। আর্থিক প্রণোদনা মূলত মনিটরি পলিসিনির্ভর। এখন সময় এসেছে সরকারি ব্যয় আরও বাড়িয়ে কর্মসংস্হান ও অভ্যন্তরীন চাহিদা বাড়ানোর।

[৯] ২০২১-২০২২ সালের জাতীয় বাজেটে ব্যয় পরিকল্পনা এমন হতে হবে, যাতে স্বাস্থ্য সংকট থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য কাজের সুযোগ আরও বাড়ানো যায়। আমি মনে করি, আমাদের নীতিনির্ধারক ও নীতি বাস্তবায়নকারী সব অংশীজনই এক বছরের বেশি সময় ধরে করোনা সংকট মোকাবেলা করে একধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা কাজে লাগিয়ে তারা আসন্ন অর্থবছরে একটি উপযুক্ত বাজেট হাজির করতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

[১০] সব জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যেন করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় সেজন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ জরুরি। ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য যে প্রণোদনাগুলো ঘোষিত হয়েছিলো, সেগুলোর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে সেখানে আরও বরাদ্দ দেওয়া দরকার। তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নটিই যেন বেশি গুরুত্ব দেয় সরকার তেমনটিই আশা করছি।

[১১] পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির শতাংশ হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বিবেচনায় আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে আছি। আমার মনে হয়, আসন্ন অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দের অনুপাত মোট বাজেটের ৭ শতাংশ হওয়া দরকার। আর অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদকালের মধ্যে এ অনুপাত ১০ থেকে ১২ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। আর কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এ বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় করা হবে সেই অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার সময়ও সচেতন থাকতে হবে। সচরাচর স্বাস্থ্যের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ পরিচালন ব্যয় হিসাবে চলে যায়। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যয় চলতি বাজেটের দশ মাসে ২৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। কোভিডের বছরেও এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে বাস্তবায়নের দিশা দিতে হবে।

[১২] স্বাস্থ্যে উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয়ের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। দেখা যায়, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শেষ পর্যন্ত আর ব্যয় করা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে তৎপর হতে হবে যাতে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন দক্ষতা যেন বাড়ানো যায়। এছাড়াও দেখা যায়, স্বাস্থ্যের মোট ব্যয়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ যায় সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ বাবদ। যদি এ বাবদ ব্যয় বাড়ানো যায়, তাহলে দরিদ্র রোগীদের পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া আরও সহজ হবে।

[১৩] করোনা সংক্রমণ তীব্র হলে অক্সিজেনের সরবরাহ নিয়ে আমরা যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বিপদে না পড়ি, তার প্রস্তুতি রাখা দরকার। এখাতে বাড়তি জনবল নিয়োগ এবং প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেরকমই নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে বাজেটে এজন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকবে, এমনটিই আশা করছি। সর্বোপরি করোনার টিকা যেন আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে দেশের নাগরিকদের অন্তত ৬০ শতাংশের জন্য নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য দরকার হলে অন্য খাতের বাজেট কাটছাঁট করে হলেও এ খাতে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এজন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের বর্তমান ধারাকে আরও বেগবান করতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকেও টিকা কেনার অর্থ অবারিত রাখতে হবে।

[১৪] করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, পুরো স্বাস্থ্য খাতটির খোল নলচে বদলে ফেলা কতোটা জরুরি। এ খাতকে অতি দ্রæত ঢেলে সাজানো দরকার। ফলে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কেবল আসন্ন অর্থবছরের জন্য নয়, বরং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকের মেয়াদকালের সব অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ নিয়েই এখন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসা চাই। গত এক দশকের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়লেও মোট বাজেটের শতাংশ হিসাবে স্বাস্থ্য খাত থেকে যাচ্ছে ৫ শতাংশের আশপাশে।

[১৫] জীবন বাঁচিয়ে জীবিকার সুযোগগুলো অটুট রাখাই হবে আসন্ন বাজেটের মূল দর্শন। একইসঙ্গে মহামারি থেকে পুনরুদ্ধারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার রূপরেখাও নিশ্চয়ই আসন্ন বাজেটের অন্যতম মূল দিক-নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। আশা করছি চলমান স¤প্রসারণমূলক মুদ্রা ও রাজস্বনীতি বজায় রেখেই জীবন ও জীবিকা সংরক্ষণের উপায় খুঁজবেন আগামী বাজেটপ্রণেতারা। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সমালোচনার সময় বিশ^ব্যাপী যে দুর্যোগ চলমান এবং আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো মনে রেখেই নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক ও অংশীজনরা সুবিবেচনামূলক মন্তব্য ও পরামর্শ দেবেন-সেই প্রত্যাশাই করছি।

[১৬] গত ১০-১২ বছরে সরকারের সহায়তায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে দেশের ব্যাংকিং খাতকে, বিশেষ করে ডিজিটাল লেনদেন পদ্ধতিকে, নতুন এক উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনিটরি পলিসির মাধ্যমে প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। লেনদেনে মোবাইল আর্থিক সেবার অনন্য ভ‚মিকার কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এমন সংকট থাকলেও বলা যায়, প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো গড়পরতায় সফলই হয়েছে। সেই সাফল্য বজায় রেখেই আসন্ন অর্থবছরে এবার ফিসক্যাল পলিসি তথা রাজস্বনীতির ওপর আরও খানিকটা ভিত্তি করে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

[১৭] সা¤প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারের পক্ষে আরও বেশি জনবান্ধব ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে এর প্রমাণ দৃশ্যমান হচ্ছে। ‘৩৩৩’ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা পাওয়ার যে হটলাইনটি চালু করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাছাড়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩৬ লাখ পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটিও দরিদ্র মানুষকে সহায়তায় বড় ভ‚মিকা রাখবে বলে মনে করি। আসছে বাজেটে লক্ষাধিক কোটি টাকার সামাজিক সুরক্ষার অর্থ এই ব্যবস্হায় দেয়া গেলে ডিজিটাল প্রশাসন ও অর্থায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতার এক নয়া দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

[১৮] গত এক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে তাদের জন্য খাদ্য, নগদ সহায়তার আকার ও পরিমাণ-দুই-ই বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মহীনদের ‘ডেটাবেজ’ তৈরি করে তাদের জন্যও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া সম্ভব। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের কর্মহীনদের দ্রæতই মেয়র ও কাউন্সিলর, এনজিও, সরকারি কর্মকর্তারা মিলে চিহ্নিত করে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারলে খুব ভালো হতো।

[১৯] চলতি অর্থবছরে মেগা-প্রকল্পগুলোর কাজ অব্যাহত রাখাটা ছিলো একটি সময়োচিত সিদ্ধান্ত। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেমন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, তেমনই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর অর্থনীতি বেগবান হলে এর ফলেও আরও বহুগুণ বেশি মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।

[২০] আসন্ন অর্থবছরেও কেনেসিয়ান অর্থনীতির ধারা অনুসারে নগরে ও গ্রামাঞ্চলে সরকার বিপুল পরিমাণ পূর্তকর্ম হাতে নিলে সেখানে মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। এসব নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত হবে, ফলে আরও বেশি মানুষের টেকসই আয়ের সুযোগ হবে। আর রপ্তানিমুখী শিল্প ও কুটির-ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য প্রণোদনাগুলোও চলমান রাখতে হবে, যাতে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়।

[২১] কৃষিকে রক্ষাকবচ হিসাবে চিহ্নিত করি, কারণ আমাদের অর্থনীতি যখনই বড় ধাক্কা খায়, তখনই সেখান থেকে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জোরেই। সেটি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু যখন দেশ পুনর্গঠন করেন, তখনো দেখা গেছে। তাই আসন্ন বাজেটে কৃষিখাতে বাড়তি বিনিয়োগ দিতে সরকার নিশ্চয় কারপণ্য করবে না।

[২২] ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময়ও দেখেছি। আবার এখন করোনাজনিত স্থিতাবস্থার মধ্যেও দেখেছি। কৃষি একদিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে কৃষি আয় বাড়লে কৃষির সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর ভোগের চাহিদা বাড়ে, ফলে অর্থনীতি সচল থাকে। আসন্ন বাজেটে তাই কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে ভর্তুকি বাড়ানো গেলে ভালো হয়। মনে রাখতে হবে, এখনো সারে ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে বলেই কৃষক ধান আবাদ করছেন। তা না হলে সবাই হাই-ভ্যালু ফসল চাষ শুরু করলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।

[২৩] খাদ্যশস্যের পাশাপাশি কৃষির অন্য উপখাত অর্থাৎ মাছ, গবাদি পশু, পোলট্রি-এগুলোর দিকেও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া চাই। এগুলোয় বিপুল কর্মসংস্থান হয়েছে, আরও সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নেও এ উপখাতগুলোর অবদান অপরিসীম। এ উপখাতগুলোর একটি প্রধান সমস্যা হলো বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। বাজেটে তাই এ লক্ষ্যে আলাদা প্রকল্প থাকতে পারে। কৃষি গবেষণায়ও আমরা যথেষ্ট মনোযোগ এখনো দিইনি।

[২৪] সরকার ও ব্যক্তি খাত একই সঙ্গে যেন কৃষি গবেষণায় নিয়োজিত হয়, সেজন্য প্রণোদনা থাকতে পারে বাজেট প্রস্তাবে। যেমন ব্যক্তি খাতের কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কৃষি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর কোনোটির সঙ্গে যৌথভাবে কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করে তবে তাদের কর-অবকাশ দেওয়ার কথা ভাবা যায়। কৃষিবিমার দাবিটিও বহুদিনের। আসন্ন বাজেটে এ লক্ষ্যে কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগের অধীনে একটি বড় আকারের পাইলট প্রকল্প অন্তত থাকতে পারে।

[২৫] করোনা সংকট শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমরা এমএসএমই’র সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আরও উদ্ভাবনী নীতি উদ্যোগের জন্য সোচ্চার ছিলাম। করোনা পরিস্থিতি আমাদের আরও স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আগামী দিনে এমএসএমই খাতের বিকাশ নিশ্চিত না করতে পারলে বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতার কারণে আমরা গভীরতর সংকটে পড়ব। এ খাতে অর্থ পাঠানোর গতি হালে বেড়েছে। এই ধারা আগামী বাজেট বছরেও যেন অব্যাহত থাকে।

[২৬] এ কথা ঠিক চলতি বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ পুরোটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অথচ এখাতেই সবচেয়ে কর্মসংস্থান হয়। আসন্ন অর্থবছরে তাই এ দিকটিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। শর্তের বেড়াজালে আটকে এমএসএমই উদ্যোক্তারা যাতে সুবিধাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হন তা নিশ্চিত করা চাই। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তারা এখন অনলাইনে অনেক উদ্যোগ নিচ্ছেন। আরও বিকশিত হতে তাদের ঋণ চাই। কিন্তু সে ঋণ তারা পাচ্ছেন না। তাদের স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা করতে আরেকটু সাহসী হওয়া চাই।

[২৭] সরকার চাইলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিজন উদ্যোক্তাকে মাত্র এক লাখ টাকা করেবিশেষ ঋণ দিতে পারে। এ লক্ষ্যে একশ কোটি টাকার একটি তহবিল চালু করতে পারে। তাদের বিকাশের স্বার্থে ঋণ পাওয়ার প্রথম তিন বছর কোনো রকম সুদ বা আসল পরিশোধ করতে হবে না-এমন সুযোগ রাখলে তা খুবই ইতিবাচক ফল দেবে বলে আমার মনে হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুবসমাজকে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহŸান করেছেন। আমরা ফিসক্যাল পলিসির মাধ্যমে সে সুযোগ তৈরি করতে পারলে নিশ্চয়ই তরুণরা আরও আগ্রহী হবেন।

[২৮] মহামারিকালেও রাজস্ব বৃদ্ধি ইতিবাচক ধারাতেই আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ। তবুও যে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা গেছে তা আশাপ্রদ। এর মানে, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মানুষ অর্থনীতিকে চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন। সরকারও নানাভাবে সহায়তা করছে। আগামী বাজেটে করজাল আরও বিস্তৃত করা এবং এনবিআর-এর অটোমেশন ও জনবল বৃদ্ধি অপরিহার্য। তবেই রাজস্ব হার বাড়বে।

[২৯] ভ্যাট ও আয়কর আইন সংস্কার করে এসবের নিয়মনীতি আরও সহজ করে ডিজিটাল ও অংশীজনবান্ধব করা গেলে রাজস্ব নিশ্চয় বাড়বে। তাছাডা মামলাজটে আটকে যাওয়া ৪১ হাজার কোটি টাকা আদায়ে দ্রæত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ও নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি আমাদের কর আহরণের নতুন উৎস অনুসন্ধানে আরও ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তাভাবনা করতে হবে। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। তামাকপণ্যের ওপর কর প্রতিবছর বাড়লেও মাথাপিছু আয় আরও বেশি গতিতে বাড়ায় তামাক ব্যবহারের হার আশানুরূপ মাত্রায় কমানো যাচ্ছে না।

[৩০] তামাকবিরোধী গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, তামাকপণ্যের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে তার ওপর শতাংশের হিসাবে না গিয়ে সুনির্দিষ্ট (অর্থাৎ টাকার অঙ্কে) সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা গেলে একদিকে ২০ লাখ মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখা যাবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ৩,৪০০ কোটি টাকা রাজস্বও আহরণ করা সম্ভব হবে। একইভাবে তামাকপণ্যের ওপর যে ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করা আছে, সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেটে দেওয়া গেলে স্বাস্থ্য বাজেট উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব।

[৩১] বাজেটে করপোরেট কর আরেকটু কমবে বলে মনে হয়। কারণ চলতি বছরের বাজেট প্রস্তাবেও আড়াই শতাংশ কমেছিলো। আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় এ হার অনেকটাই কম। ধীরে ধীরে তাদের কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে আমাদের। ব্যক্তি করের বোঝা আগামী বাজেটে নিশ্চয়ই বাড়বে না। টোকেন হলেও সব নাগরিককে আয়কর কাঠামোতে যুক্ত করা এবং সেই আয়করের একটি অংশ তাদের পেনশন তহবিলে নেওয়ার সুদূরপ্রসারী নীতি সংস্কারের সময় বয়ে যাচ্ছে। এ দিকটায় দ্রæতই নজর দেওয়া উচিত।

[৩২] সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের মানুষের জন্য এই তহবিল গড়ে তোলা উচিত। পাশের দেশে তা চালু আছে। আমরা কেন পারবো না। এ জন্য আইন করতে হবে। নয়া রেগুলেটর বসাতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনের এই যুগে এই ব্যবস্থা সফল করা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না।

[৩৩] আমাদের নেতৃত্বের পরম্পরা এবং সাহস আছে, আছে উদ্ভাবনের নানা সফল অভিজ্ঞতা। আর আছে তরুণ প্রজন্মের কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিপ্রীতি এবং জনগণের বিপুল দেশপ্রেম। তাহলে এই সংকটকালেও কেন আমরা সম্ভানার নয়া দরজা খুলতে পারবো না? আসন্ন বাজেটে আমরা এই সম্ভাবনার কথাই শুনতে চাই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত