শিরোনাম
◈ মঙ্গলবার ৫ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায় ◈ ‘আমি ভারতীয় হলে আমার ছোট ভাই বাংলাদেশি কীভাবে?’ ছত্তিশগড়ে বাঙালি আটক ◈ মোবাইল না দেওয়ায় বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে থানায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, ভিডিও ভাইরাল ◈ ভারতীয় রুপির বিপরীতে কেন শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশি টাকা? ◈ গুয়াংজো, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও সাও পাওলোতে নতুন কনস্যুলেট খুলছে বাংলাদেশ ◈ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছেন তারেক রহমান ◈ এলডিসি উত্তরণের পরও যুক্তরাজ্যে ৯৯.৮% বাংলাদেশি পণ্য থাকবে শুল্কমুক্ত ◈ দুবলারচরে শতকোটি টাকার শুঁটকি বাণিজ্য, ন্যায্য দাম নিয়ে জেলেদের যত অভিযোগ ◈ সাড়ে পাঁচ বছরে ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে টাকা ◈ অনূর্ধ্ব-১৮ মেয়েদের রাগবিতে নতুন দিগন্ত, মহিলা ক্রীড়া সংস্থা-রাগবি ফেডারেশনের চুক্তি

প্রকাশিত : ২৭ মে, ২০২১, ০৪:৪৫ সকাল
আপডেট : ২৭ মে, ২০২১, ০৪:৪৫ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সড়কের ক্ষতি বাড়ছে নিম্নমানের বিটুমিনে

যুগান্তর: সড়কে নীরব ঘাতক হিসাবে বিশেষ ভূমিকা রাখছে ভেজাল ও নিম্নমানের বিটুমিন। নির্মাণ ও সড়ক সংস্কারে আমদানিকৃত এসব বিটুমিন ব্যবহার করায় সড়কের স্থায়িত্ব হ্রাস পাচ্ছে। এতে একদিকে সড়ক সংস্কারের পেছনে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিও বাড়ছে। মূলত আমদানি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্বিঘ্নে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি অব্যাহত রেখেছে।

এ অবস্থায় অন্যসব পণ্যের মতো বিটুমিনের মান নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। বিলম্বে হলেও সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ভেজালরোধে বিটুমিন আমদানিতে কঠোর শর্ত জুড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে হয়েছে। এছাড়া আমদানি পর্যায়ে শৃঙ্খলা আনতে শুল্ক, কাস্টমস ডিউটি, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি বাড়াতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে। কাজ করছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন।

ইতোমধ্যে কমিশন থেকে দেশে বিটুমিনের ব্যবহার, চাহিদা, স্থানীয় উৎপাদন, উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হার, উৎপাদন ব্যয়, স্থানীয় মূল্য সংযোজন হার, উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, স্থানীয় উৎপাদনে বিদ্যমান সুরক্ষা মাত্রা, বিটুমিনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদর ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তদারকি না থাকায় দেদার আমদানি করা হচ্ছে নিম্নমানের বিটুমিন। আর সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে নিম্নমানের ও ভেজাল বিটুমিন গলানো এবং পাথরের সঙ্গে বিটুমিনের মিশ্রণে যে নিয়ম মানা দরকার তা ঠিকভাবে মানা হয় না। ফলে দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সড়ক নির্মাণের পর ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বিটুমিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। শুধু অর্থ গচ্চা নয়, উন্নয়ন কাজও টেকসই হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রতি বছরই দেশে সড়ক যোগাযোগ খতে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সওজের অধীনে থাকা সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, মেরামত ও প্রশস্তকরণে ৫৭ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রশস্ত ও মজবুত করা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক। ১৪ হাজার ৯১৯ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন ধরনের মেরামত করা হয়েছে।

নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে অল্প সময়েই সড়কে স্পট তৈরি হয়। সময়মতো মেরামত না করায় তা দ্রুত বড় বড় গর্তে পরিণত হয়। এরপর এসব গর্ত ও খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে চলতে গিয়ে হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে গড়ে সাড়ে চার হাজার। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর গড়ে প্রাণ হারায় পাঁচ হাজার মানুষ।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদেশ থেকে বিটুমিনের নামে মানহীন আলকাতরা আনছেন আমদানিকারকরা। অন্যদিকে পরিমাণ বাড়াতে বিটুমিনের সঙ্গে গিলসোনাইট নামের এক ধরনের কেমিক্যাল মেশান ঠিকাদাররা। এই কেমিক্যাল মেশানোর কারণে বিটুমিনের বন্ডিং (বিটুমিনের কংক্রিট ধারণ) ক্ষমতা কমে যায়। আর এ ধরনের বিটুমিনের প্রলেপ পড়া সড়কগুলো দ্রুতই ভেঙে যায় অথবা ঢেউয়ের আকৃতি ধারণ করে।

বিটুমিন বিশেষজ্ঞ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুস সাকিব যুগান্তর বলেন, দেশের বেশিরভাগ রাস্তায় দেখা যায় বিটুমিন থেকে পাথর আলাদা হয়ে যায়। এর মূল কারণ বিটুমিনের সঙ্গে পাথরের লেগে থাকার শক্তি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিম্নমানের ও ভেজাল বিটুমিনের কারণে এটা হচ্ছে। আমদানি করা বিটুমিন প্রথমত অনেক দিন জাহাজে থাকে। উৎপাদন উৎস আমরা কেউ বলতে পারি না। ফলে এদের মান সব সময় আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সড়ক নির্মাণের অন্যতম অনুষঙ্গ বিটুমিন আমদানি-ব্যবহারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না কেউ। তাদের মতে বিটুমিন আমদানির পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ। বিএসটিআই, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বুয়েটের মান পরীক্ষা ছাড়াই বিটুমিন আসছে দেশে। আর বন্দরে কাস্টমসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এগুলো ছাড়পত্রও পেয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, বিদেশে যেসব কোম্পানি বিটুমিন বিক্রি করছে সেগুলোর অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে কালো তালিকাভুক্ত। এ কারণে অধিক মুনাফা লাভের জন্য আমদানিকারকদের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক বাজারে যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে তাদের কাছ থেকে সস্তায় বিটুমিন ক্রয় করে।

ভেজাল ঢুকছে জাহাজে : সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে শুরু করে দেশের খুচরা বাজার পর্যন্ত অন্তত ৫টি ঘাটে বিটুমিনের ভেজাল হচ্ছে। প্রথমত যেসব জাহাজে করে বিটুমিন আনা হচ্ছে এগুলোর বেশিরভাগ ৩ থেকে ৫ মাস সাগরে ভাসমান থাকে। সেখানেই শিপের পরিত্যক্ত তেল ও তেল জাতীয় ক্ষতিকর পদার্থ বিটুমিনে মেশানো হচ্ছে। এরপর জাহাজ থেকে বন্দরে আনা বিটুমিনের ড্রামগুলো রাখা হচ্ছে শেডে।

বন্দরের এ শেড থেকে বিটুমিনগুলো আবার দু-তিন হাত ঘুরে বিক্রি হয়। প্রতিটি হাতেই মেশানো হয় ভেজাল। এছাড়া এসব ড্রামগুলো খোলা আকাশের নিচে, ময়লা-কাদার মধ্যেই অবৈজ্ঞানিকভাবে রাখা হয়। এতে ভেজালের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে গুণগত মান। চোরাই প্রক্রিয়াও মানহীনভাবে তৈরি বিটুমিন বাংলাদেশে আসছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, বিটুমিন একটা কেমিক্যাল। স্বাভাবিকভাবেই এটি রক্ষণাবেক্ষণের কিছু বৈজ্ঞানিক পন্থা আছে। এটা না মানলে বিটুমিনের গুণগত মান খারাপ হয় এবং তাই হচ্ছে।

চট্টগ্রাম গুদাম মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমদানিকারকরা দ্বিতীয় দফায় আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন। এরপর একের পর এক হাতবদল হয় বিটুমিনের। আবার গোডাউনে থাকার কারণে মানও খারাপ হয়। খোলা আকাশের নিচে বিটুমিন পড়ে থাকায় নষ্ট হয়। বিটুমিনের ড্রাম থেকে গলে গলে পড়েও যায়।

চাহিদার ৭০ শতাংশ আমদানি : জানা গেছে, দেশের মোট বিটুমিন চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করা হয়। তথ্য বলছে, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকা একটি দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তৈরি হওয়া বিটুমিনই মূলত আমদানি হয়ে বাংলাদেশে আসে। বিটুমিন আমদানিতে বেশ কয়েকটি ফাঁকফোকর রয়েছে। বিটুমিন আমদানিতে শুল্ককরের কোনো ফারাক নেই। কিন্তু গুণগত মানে বিস্তর ফারাক।

বাজারে ২০০ থেকে ৫০০ ডলার দরের বিটুমিন রয়েছে। নিয়ম হচ্ছে আমদানি করতে হলে মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বুয়েটের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই।

দেশে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন বিটুমিনের প্রয়োজন হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারি উৎপাদন করে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিপিসির হালনাগাদ পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী করোনা মহামারিকালে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৬০১ টন বিটুমিন বিক্রি করেছে বিপিসি। যা আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৬৬ হাজার ৪৪৮ টন। একই অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৮৭৭ টন বিটুমিন উৎপাদন করেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।

  • সর্বশেষ