প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় বাড়ছে করোনা সংক্রমণ

নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাস মহামারী ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এক মাস ধরে দেশটিতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার লাগামহীনভাবে বেড়েছে। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল। দেশটিতে করোনার ভয়াবহ এ পরিস্থিতির মধ্যে গত ২৬ এপ্রিল থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে প্রতিদিনই বৈধ-অবৈধ পথে ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশে প্রবেশ করছে। এদিকে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কয়েকদিন ধরেই কভিড-১৯ শনাক্তের হার বাড়ছে। এরই মধ্যে ভারতীয় সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এক সপ্তাহ ধরে জেলাটিতে করোনা সংক্রমণের হার শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি, যা জাতীয় সংক্রমণের পাঁচ গুণেরও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে জেলায় সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে সাতদিনের লকডাউন দিয়েছে প্রশাসন।

জানা গেছে, সরকারি সীদ্ধান্তে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদ দিয়ে প্রবেশ করছে ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশীরা। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়েছে। গত দুদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আটজন। এর মধ্যে গত রোববার দিবাগত রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মারা গেছেন ছয়জন।

জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আগামী রোববার পর্যন্ত জেলায় সাতদিনের কঠোর লকডাউন থাকবে। এ সময় সব ধরনের যানবাহন বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি পরিষেবা, অ্যাম্বুলেন্স ও পণ্যবাহী ট্রাক চালু থাকবে। আগামী সাতদিনে আন্তঃজেলা পরিবহনও চলবে না।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে করোনায়। এর মধ্যে দুজনই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। অন্যজন নাটোর জেলার। একদিন আগেও বিভাগে করোনায় প্রাণহানির ঘটনা ছিল না।

সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা জেলায়ও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডাক্তার হুসাইন সাফায়াত জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত এ জেলায় ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সাতক্ষীরা জেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪০৬ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গতকাল আক্রান্ত হয়েছে ২৮ জন।

এদিকে সীমান্তবর্তী আরেক জেলা যশোরে গতকাল নতুন করে ২৭ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট ৬ হাজার ৭২২ জন করোনায় আক্রান্ত হলো। মারা গেছেন ৮৮ জন। গতকাল ল্যাব ও অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় শনাক্ত ২৭ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ২২ জন, শার্শার একজন, ঝিকরগাছার একজন, বাঘারপাড়ার একজন ও অভয়নগর উপজেলার দুজন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষণ দলের সদস্য অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর জাহিদ জানান, যশোরে ৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২০ জন ছাড়াও নড়াইল জেলার ১৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় একজনের করোনা পজিটিভ হয়েছে। দুই জেলার মোট ১১২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২১ জন পজিটিভ ও ৯১ জনের নেগেটিভ শনাক্ত হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ১৭৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। একই দিন রাজশাহীতে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৬৫ জনের। একদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৭ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছে আরো দুজন। তবে রাজশাহী জেলায় কাউকে কোয়ারেন্টিন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়নি।

করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে এসেছে ১৫ জন। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে আগে থেকেই ভর্তি ছিল ১৬৮ জন। এদের অধিকাংশই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পঞ্চগড়ের মানুষের মধ্যে করোনা পরীক্ষার নমুনা দিতে আগ্রহ কম। অসুস্থ হলেই কেবল নমুনা দিচ্ছে। পঞ্চগড় সিভিল সার্জন ডা. ফজলুর রহমান জানান, পঞ্চগড়ে এ পর্যন্ত ২০ জন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। আক্রান্তদের বেশির ভাগ জেলার বাইরে থেকে পঞ্চগড়ে এসেছিল। এর আগে ভারতের একজন ব্যবসায়ী পঞ্চগড়ে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন।

কুড়িগ্রাম জেলায় বর্তমানে করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৫৯। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে পাঁচজন। বাকিরা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। আশঙ্কার বিষয়, কুড়িগ্রামে করোনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নমুনা সংগ্রহ করে তা রংপুর ও ঢাকায় পাঠানো হয়। ফলে রিপোর্ট পেতে সময় লাগে চার থেকে সাতদিন।

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলা তিনদিকে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা। প্রতিদিন বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে উভয় দেশের আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী ট্রাকের চালক, পাসপোর্টধারী যাত্রীসহ শত শত মানুষ চলাচল করছে। তিন বিঘা করিডোরে বিজিবি-বিএসএফের পাশাপাশি উভয় দেশের শত শত মানুষ চলাচল করছে। পাটগ্রাম উপজেলা ছাড়াও জেলার হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও লালমনিরহাট সদর উপজেলারও বিরাট এলাকাজুড়ে ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে ৩০ জন প্রাতিষ্ঠানিক ও হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছে। এর মধ্যে ভারতফেরত সাতজন পাসপোর্টধারী যাত্রীর শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েনি। সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় জানান, ২৪ মে পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১২ জন।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে নওগাঁয় নারীদের মৃত্যুহার বাড়ছে। নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মনজুর-এ মুর্শেদ বলেন, শনিবার নতুন করে ২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। শুরুতে নারীদের মৃত্যুহার কম থাকলেও বর্তমানে তা বাড়তে শুরু করেছে। করোনার তৃতীয় ঢেউ মোকাবেলা করতে আমরা আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছি। তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই শুরু করা হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণের কাজ চলমান আছে।

নওগাঁ জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যানুযায়ী জেলায় এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ জন। মারা গেছেন ৩৭ জন। আরোগ্য লাভ করেছে ১ হাজার ৯৮৭ জন। নিহতের মধ্যে দেড় মাসের এক ছেলেশিশুসহ ১৪ জন নারীও রয়েছে। আরেক সীমান্তবর্তী জেলা জয়পুরহাটে গতকাল রোববার পর্যন্ত ১ হাজার ৬৫০ আক্রান্ত হয়েছে।

ঈদের পর থেকে কুষ্টিয়ায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য বলছে, জেলায় এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১৭ জন। তার আগের ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ছিল ২৩ জন। তারও আগের ২৪ ঘণ্টায় ২১ জন, যেটা ঈদের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০ মে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪। ১৯ মে আক্রান্ত ১৯ জন, ১৮ মে ১৫ জন, ১৭ মে ছয়জন ও ১৬ মে ছিল পাঁচজন।

আরেক সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুরেও আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সিভিল সার্জনের তথ্য বলছে, জেলায় এখন পর্যন্ত ৯১৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ জন। মেহেরপুরে একদিনে সর্বোচ্চ ১৮ জন কভিড-৯ শনাক্ত হয়েছে গত রোববার। ভারতফেরতদের কোয়ারেন্টিনের জন্য সরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়া হয়েছে। মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, মেহেরপুরে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই দিন দিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

ময়মনসিংহ বিভাগেও বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। এ বিভাগের চার জেলা নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহে গতকাল পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৪৩ জনের। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৯৭৫ জন। নেত্রকোনায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২০ জন। নেত্রকোনা জেলায় ভারতফেরত দুজনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নেত্রকোনায় এক সপ্তাহ ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা বাড়তির দিকে। এরই মধ্যে আক্রান্ত সন্দেহে ভারতফেরত যে দুজনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল তাদের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। যে কারণে নেত্রকোনার পূর্বধলায় নারান্দিয়া ইউনিয়নের বৌলাম গ্রামের শনাক্তদের সংস্পর্শে আসা গ্রামের অন্তত ছয়টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। শনাক্ত দুজনের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য ঢাকায় নমুনা পাঠানোর কথা জানান সিভিল সার্জন ডা. মো. সেলিম মিয়া।

গতকাল মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিবরণী থেকে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এ নিয়ে জেলায় মোট কভিড আক্রান্ত রোগী ২ হাজার ৪২৬ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১১৩। এছাড়া মারা গেছেন ২৯ জন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় নতুন ১৯ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সীমান্তবর্তী জেলাটিতে ২ হাজার ২৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আর আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৫৮ জন। সর্বশেষ রিপোর্টের বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ একরাম উল্লাহ জানান, র্যাপিড অ্যান্টিজেন ল্যাবের ৩০৪টি রিপোর্টে নতুন আরো ১৯ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

গতকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ২২ হাজার ১৩৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ১৪ হাজার ৩৬৩ জন, সুনামগঞ্জে ২ হাজার ৭৮৪, হবিগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ৪৬৫ ও মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৪২৬ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন এএসএম মারুফ হাসান জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলা থেকে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৬৬২ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯২৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আর আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৪ জন। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত