প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল): ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে মাইলফলক’

১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের এইদিনে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। ’৭৫-এ স্বামীর সঙ্গে তার সেই যে প্রবাস যাত্রা, ’৭৫-এর একটি রাতের কয়েক ঘণ্টায় তা প্রলম্বিত হয়েছিল কয়েক বছরে। ওই একটি রাতে যেমন বদলে গিয়েছিল বাঙালীর বর্তমান আর ভবিষ্যত খোল-নলচে, তেমনি বদলে গিয়েছিল স্রষ্টার অসীম কৃপায় সে রাতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যারও। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতির কন্যারা হঠাৎ করেই পরিণত হয়েছিলেন শরণার্থীতে। মিস্টার, মিসেস আর মিস তালুকদারের ছদ্ম নামে নিভৃতে কেটেছে তাদের নয়াদিল্লীর শরণার্থী জীবন। নিজ পরিবারকে পর করে, প্রয়াত পিতার মতোই নিজ জীবনকে তুচ্ছ করে আর গোটা দেশটাকে নিজ পরিবার জ্ঞান করে, সেই পরিবারের দায়িত্বটুকু কাঁধে নিয়ে এই দিনটিতেই দেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। দেশে ফিরেছিলেন শত বাধা, ঝুঁকি আর সামরিক শাসকের চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে।

শেখ হাসিনার এর পরের পথ চলা ছিল খুব বেশি বন্ধুর। আজ যদি কেউ তার এক যুুগের টানা প্রধানমন্ত্রিত্বকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কোন উপহার হিসেবে ভুল করেন তবে সেসব অর্বাচীনের মনে রাখতে হবে যে, এই অধিকারটুকু অর্জন করতে তাকে সর্বস্ব বিসর্জন দিতে হয়েছিল। বন্ধ বত্রিশের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন, প্রবেশের অধিকার পাননি নিজ পিত্রালয়ে। একাকী সাফ করেছেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে প্রিয়তম আত্মীয়দের রক্ত আর স্মৃতির ওপর জমতে থাকা ধুলার পুরু আস্তর। সারাদেশে আওয়ামী লীগ আর স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিকে সংগঠিত করতে কখনও নৌকায় তো কখনও রিক্সায় চেপে চষে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। রাত কেটেছে কোন কর্মীর জীর্ণ কুটিরে। পাঁচ তারকা হোটেল তো দূরের কথা, সরকারী কোন ডাকবাংলোতে বিশ্রামের সুযোগ জোটেনি জাতির পিতার কন্যার। দফায় দফায় আঘাত এসেছে তাঁর জীবনের ওপর। চট্টগ্রামে তার মিছিলে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়েছে সরকারী পুলিশ, নাটোরে তাঁকে বহনকারী ট্রেনকে স্বাগত জানাতেছিল ককটেলের মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ আর ঢাকায় ভর দুপুরে তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে অগণিত সামরিক গ্রেড আর্জেস গ্রেনেড। এত ত্যাগ আর ঝুঁকির বিনিমেয় অর্জিত যে অর্জন তাকেও ভোগ আর বিলাসের বস্তুতে পরিণত না করে এই মহান মানবী তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বাঙালীকে সেই জায়গাটিতে পৌঁছে দেয়ার জন্য, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রয়াত জাতির জনক।

সেই যাত্রায় তার সাফল্য আকাশ ছাড়িয়ে ‘মহাকাশচুম্বী’। মহাকাশে যখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এই মুজিববর্ষে, তখন আমাদের প্রত্যাশা কর্ণফুলীর গভীর গহীনে বঙ্গবন্ধু টানেলে ছুটবে গাড়ির সারি। পদ্মার এক‚ল-ওক‚লজুড়ে দেয়া সেতুতে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে ছুটবে যখন গাড়ি আর ট্রেনের বহর, তখন উত্তরবঙ্গ স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের একান্নতে পারমাণবিক বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার। এই করোনাকালে বিশ্বের দেশে দেশে আকাশের চেয়ে মাটিতে যখন বিমানের সারি, তখন আমাদের বিমান বহরে সদ্য সংযোজিত ড্যাশ-৮ ‘ধ্রæবতারা’ গর্বিত ভঙ্গিমায় উড়ছে আকাশে।

অতিমারী আতিশয্যে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মকের ঘরে। অথচ বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের ওপরে। বøæমবার্গ বলছে কোভিড-১৯-এ পৃথিবীর বিশটি নিরাপদ দেশের অন্যতম বাংলাদেশ আর আমাদের অনেক পেছনে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য। বøæমবার্গ আমাদের মাত্র পাঁচটি পয়েন্ট দিয়েছিল ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করায় এবং প্রয়োগে ততটা পারঙ্গমতা না দেখাতে পারায়। এই জায়গায় আরও দু’-চারটি পয়েন্ট বেশি পেলে আমরা উঠে আসতাম তালিকায় আরও অনেক ওপরে। সেই দুর্বলতাও আমরা কাটিয়ে উঠেছি। এ মাসেই দেশে আসছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন। বণ্টন নীতিমালা থেকে সংরক্ষণের খুঁটিনাটি সব কিছুই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের যে দেশটি একদিন ছিল তলা ছাড়া ঝুড়ি, আজ তাই বিশ্বের রোল মডেল। এ মাসেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নতীতে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্তি এখন আমাদের জন্য আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আর এই যে এত এত অর্জন, যার তালিকা এত স্বল্প পরিসরে প্রণয়ন না সম্ভব, না আমার সাধ্যের মধ্যে, তার সবটুকুই শুধুই শেখ হাসিনার জন্য এ কথায় এতটুকুও অত্যুক্তি নেই। এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। আর এর কোন কিছুই সম্ভব হতো না ’৮১-এর এই বিশেষ দিনটিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে না এলে।

১৭ মে তাই আমাদের কাছে এত বেশি গুরুত্ববহ। এই দিনটিতে তাই পালন করা হয় নানা কর্মসূচী। এ দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক এই দিনটিতে অশেষ শ্রদ্ধায় ভালবাসার অর্ঘ্য নিবেদন করেন তাদের প্রিয়তম নেত্রীর সমীপে। আমরা যারা লিভার নিয়ে ব্যস্ত চেষ্টা করি মানুষের লিভারগুলোকে আরেকটু ভাল রাখার, তারাও এই ধারার বাইরে নই। আমরা খুব ভালই জানি এই মহীয়সী মানুষটির আগমন না ঘটলে আমরা এ দেশে প্রায়শ অস্তিত্বহীন থাকতাম। নেত্রী তার জায়গা থেকে দেশটাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ায় সতত নিয়োজিত। এবারের ১৭ মে পড়েছে মুজিববর্ষে। এবারের ’১৭ মে’র গুরুত্ব তাই অন্য মার্গে। এবারের ১৭ মে ভালবাসার নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমাদের নিবেদন একটি লিভার ফেইলিওর ইউনিট। এদেশে এমন একটি ইউনিট এটাই প্রথম। লিভার ফেইলিওরের রোগীদের জন্য এখানে আছে লিভার আইসিইউ, লিভার ডায়ালাইসিস আর প্লাজমা এক্সচেঞ্জের মতো আধুনিক সব সুবিধা। পরিসরটা হয়ত সীমিত, কিন্তু লক্ষ্যটা বিশাল। ইউনিটটির উদ্বোধনের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে তাই এই দিনটিকেই। সাদামাটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটির আয়োজন ভার্চুয়ালি। ডিজিটালি এ ধরনের আয়োজনের আমাদের আজ যে সক্ষমতা তাও তো তারই কারণেই।

এবারের ১৭ মে আর দশজন বাঙালীর মতো আমাদেরও প্রার্থনা, প্রিয় নেত্রী আপনি দীর্ঘজীবী হোন। আপনার শতায়ুতেই বাঙালীর কল্যাণ, কল্যাণ বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণার এবং সঙ্গে অবশ্যই আমাদেরও। আপনি এক পা এগুলে দশ পা এগুবে বাংলাদেশ, এগুবে এদেশের চিকিৎসা খাতও।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত