প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিলরুবা শরমীন: ৪০ বছর সংসার করেও ঠিকানা পেলেন না যে নারী

দিলরুবা শরমীন: আমি বিস্ময়কর দৃষ্টিতে ওনার কথা শুনছিলাম। উনি আধো বাংলা আধো উর্দু আধো ইংরেজি মিশিয়ে তাঁর জীবনের কাহিনি বলা শেষ করে বিষ্ফোরিত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দাম্পত্য জীবন চল্লিশ বছরের। বাংগালী স্বামী পাকিস্তানে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে পরিচয়। আর উনিও সেই একই অফিসে চাকরি করতেন তাই শেষ অব্দি ঘর বাধা। সংসার শুরু করা। দুইটা বাচ্চাও হয় সেখানেই। বাচ্চারা লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে শাদী করে আমেরিকায় পাড়ি দেয়।

রিটায়ারমেন্টের পরে বাংগালী স্বামী জানান উনি দেশে ফিরতে চান। পাকিস্তানি ভদ্রমহিলা স্বামীর হাত ধরে তাঁর নিজস্ব সব পূঁজি আর বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে বাংলাদেশে নির্ভয়ে চলে আসেন। এখানে স্বামীর হাতে সব অর্থ বিত্ত তুলে দিয়ে গুলশানে একটি ফ্লাট কিনে বসবাস করতে থাকেন। কিছু দিন পরই স্বামীর নানা ধরনের কাজ কর্ম, আচার আচরণ, চাল চলন অস্বাভাবিক লাগতে থাকে। বাংলাদেশে তাঁদের সংসার জীবনের অনেক ঘটনার পর উনি কাগজ হাতে পান যে, স্বামী তাঁকে তালাক দিয়েছেন। উকিলের ইংরেজি চিঠি আর স্বামীর সই করা তালাক নামা ভোর বেলা চায়ের টেবিলে কাজের লোকই দিয়ে যায়।

স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে স্বামী চায়ের টেবিলে না আসায় উনিই বেডরুমে যান। স্বামী তাঁকে পরিষ্কার নিরুদবিগ্ন কন্ঠস্বরে জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানি বুড়ি বউ নিয়ে ঘর করা ওনার পক্ষে আর সম্ভব না। উনি বিয়ে করবেন বাংগালী একটা মেয়েকে। তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু উনি যাবেন কোথায়? বাবা মা ভাই বোনকে কি বলবেন? ছেলে মেয়েকেই বা কি বলবেন? এদেশের বন্ধুদের কাছে ছুটে গিয়েছেন। ছুটেছেন স্বামীর বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের কাছে। কেউ সুরাহা করে দিতে পারেন নি। ইসলাম ধর্মে তালাক যে পক্ষ দেবে সে নিজে না উঠালে আর কারো কিছু করার নাই। অবশেষে স্বামীর হাত পা ধরেছেন। বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে চাপ দিয়েছেন তাঁর সঞ্চিত অর্থ এই বাড়ি কেনার পিছনে ব্যয় করেছেন সেইসবের কি হবে?!

সুরাহা দেন নি স্বামী। “একেতো পাকিস্তানি তার উপরে মেয়ে মানুষ আর কতদূর যাবে তুমি? যাও এম্বাসিতে সেখানে বিচার দাও! তোমার এই বয়সে ওই শরীরে কেউ পাত্তা দেবে না ” তীর্যক ইংগিত পূর্ণ এইসব নোংরা কথায় উনি এম্বাসির দরোজায় যান নি। ঘর সংসার করতে চেয়েছিলেন। এমন কি দ্বিতীয় বউ নিয়ে এলেও স্বামীর ঘর ছাড়তে চান নি। কিন্তু তাঁর এতদিনের চেনা স্বামী আর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিলে শারীরিক মানসিক নির্যাতন আর চাপ সৃষ্টি করে তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে রেখে বাসা থেকে বের করে দিয়েছেন। উনি থানায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে উর্ধতন কর্মকর্তা সদয় হয়ে নানান জনের ফোন নং দিয়েছেন “যদি আইনী সহায়তা পান কারো কাছে” এই ভরসায়। কয়েক জন মাথাওয়ালা আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীর দ্বারস্থ হয়ে এবং যথারীতি সহায়তা না পেয়ে শেষ অব্দি দেখা পেয়েছেন আমার।

আমি সবটা শুনে ধাতস্থ হয়ে তাঁর কাছে তাঁদের বিয়ে দাম্পত্য জীবনের যে কাগজ পত্রই চাই সেটাই উনি দিতে পারেন না। এমন কি ছবি গুলো অব্দি সুকৌশলে ধ্বংস করেছেন স্বামী। শেষতক এম্বাসিরই দ্বারস্থ হওয়া। বাচ্চাদের সহযোগিতায় কিছু ছবি উদ্ধার করা। কিছু কাগজ পত্র উদ্ধার যেখানে প্রমাণ “এই পাকিস্তানি নারীর একদা স্বামী এই বাংলাদেশী মানুষটি”। আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে তাঁর জীবন নিয়ে অনেক মামলা মোকদ্দমা করার সুযোগ ছিল। কিন্তু শান্তি প্রিয় এই বৃদ্ধা নারী কিছু ই করতে চান নি। উনি যে একদা ভালোবেসেছিলেন এই স্বামীকে। ওনার গর্ভে এই স্বামীর ঔরষে যে দুটো সন্তান আছে যারা সুখে শান্তি তে ঘর সংসার করছে….. তাই অনেকের সহযোগিতায় শেষ অব্দি ফিরে গিয়েছেন পাকিস্তান -তাঁর বাপের বাড়ির দেশে। ছেলে মেয়ে চেষ্টা করেও আমেরিকা নিতে পারেনি। স্বামী প্রবর ৪০ বছর পাকিস্তান সরকারের গুনগান গেয়ে এখন পুরোদস্তুর বাংলাদেশী। মেয়েটির আর বাড়ি হলো না। ঠিকানা না পাওয়া অসংখ্য মেয়ের ভীড়ে বৃদ্ধা মেয়েটিও সংযুক্ত হলো। ( দুঃখিত নাম প্রকাশ করা সম্ভব হলো না কারোরই) । ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত