প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডায়ানার ডেথস্পট ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রথা ভাঙা যাত্রা…

আসাদুজ্জামান সম্রাট : ১৯ মে ২০১৮। যুক্তরাজ্যের উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে ৩৩ বছর বয়সী প্রিন্স হ্যারি আর ৩৬ বছর বয়সী মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের বিয়ের অনুষ্ঠান। ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ শপথবাক্য পাঠ করালেন, ‘ভালোয় বা মন্দে, প্রাচুর্যে কিংবা দারিদ্র্যে, সুখে-দুঃখে, ভালোবেসে আমরা আমৃত্যু পাশে থাকব।’ শপথবাক্য পাঠ করার পর স্মিত হেসে বর প্রিন্স হ্যারি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি থাকব।’ হাসিমুখে একই শপথবাক্য পাঠ করলেন কনে মেগান মার্কেলও। তবে স্বামীর শতভাগ বাধ্য থাকার শপথ নিলেন না তিনি। রাজপরিবারের প্রথা ভেঙে প্রিন্স হ্যারিও পরে নিলেন বিয়ের আংটি। তাঁর আগে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো পুরুষ বিয়ের আংটি ধারণ করেননি। ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রথা ভাঙার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রিন্স হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানার হাত ধরে। আজ প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল দম্পতি রাজদায়িত্ব ছেড়ে কানাডা হয়ে মার্কিন মুল্লুক ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করছেন।

ভালোবাসার শক্তি এমনই। প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার একটা পর্যায়ে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ বিশপ মাইকেল ব্রুস কারি আবেগঘন কণ্ঠে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্টিন লুথার কিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভালোবাসায় শক্তি আছে। একে অবমূল্যায়ন করবেন না। জীবনে যে প্রেমে পড়েছেন, তিনিই জানেন আমি কী বোঝাতে চেয়েছি।’ সেই প্রেমের টানেই আজ রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যের ভুমিকা ছেড়ে মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করছেন প্রিন্স হ্যারি। তাঁর পিতার পরকীয়াসহ রাজপরিবারের নানা বিধিনিষেধ ভেঙ্গে একদিন রাজপরিবার থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। প্রথাগত রাজপরিবারের গন্ডিপেরিয়ে তিনি আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছিলেন। আর এ জন্য তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন রাজপরিবারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই।

১৯৯৭ সালটা ব্যক্তি হিসেবে আমার জন্য একটু ভিন্নরকম ছিল। কৈশোর উত্তীর্ণ এক সময়ে তুমুল প্রেমের মধ্যেই প্যারিসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়না এবং তাঁর বন্ধু মিশরীয় ধনকুবের দোদি আল ফায়েদের মৃত্যু আমার মনে ভিন্ন প্রভাব সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যাপী আলোচিত প্রেম ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। এইতো সেদিনও ডায়ানার ছেলে প্রিন্স হ্যারি অভিযোগ করেছেন, তার মাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রিন্সেস ডায়ানা ও দোদি আল ফায়েদের মৃত্যুর হয়েছিল ৩১ আগস্ট ১৯৯৭ সালে। আর আমি বিয়ে করেছিলাম একই বছর ১৭ অক্টোবর। সে সময়ে আমার হাতে সেল ফোন ওঠেনি। পকেটে থাকতো ফোন কার্ড। তা দিয়েই কোন বুথ থেকে যখন ফোন করতাম, ‘তখন আমার স্ত্রীর বড়ো বোন ফোন ধরে বলতো, তোর দোদি আল ফায়েদ ফোন করেছে।’

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কোথায় ডায়ানার মৃত্যু হয়েছে তা দেখার জন্য। প্যারিসের যে টানেলে ডায়ানার গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে সেটা একটা দ্রুত গতির টানেল। হেটে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই। আমার মতো অনেকেই আসেন এই দুর্ঘটনাস্থল দেখতে। তাদের জন্যই সম্ভবত: প্যারিসের নগর কর্তৃপক্ষ টানেলের বাইরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। সেখানে এখনও মানুষ এসে প্রতিদিনই শ্রদ্ধা জানায়, ফুল দেয় এমনকি ‘লাভ লক’ ব্রিজের মতো স্মৃতিস্তম্ভের বাইরে লাগানো শেকলে তালা ঝুলিয়ে দেয়। আমিও সেখানে ফুল দিলাম। তালা ছিলনা বলে লাগাতে পারিনি। তবে সঙ্গে থাকা একটি ছোট্ট জাতীয় পতাকা রেখে এসেছি। প্যারিস প্রবাসী বন্ধু আতিকুজ্জামান রাতের আলোকোজ্জ্বল প্যারিস দেখাতে দেখাতে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

বুকের মধ্যে মানুষের জন্য ভালোবাসা থাকলে কোনো গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা যায় না। আর তাই গণ্ডিবদ্ধ থাকতে পারেননি মানবতার রাজকন্যা প্রিন্সেস ডায়নাও। ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদের হাজারো নিয়ম-কানুন আর প্রটোকলের বেড়াজাল ভেঙে তাই তিনি বেরিয়ে এসেছেন সাধারাণ মানুষের কাছে। ছুটে গেছেন আর্ত পীড়িত যুদ্ধ বিধ্বস্ত অসহায় মানুষের কাছে। এজন্য তাকে ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ থেকে, রানীর কাছ থেকে ও স্বামী চর্লসের কাছ থেকে হাজারো কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ছুটে গেছেন ল্যান্ডমাইন অপসারণের কাজে। ছুটে গেছেন আহত, অসুস্থ শিশুদের পাশে। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যুদ্ধ হানাহানি আর মাইনমুক্ত এক বিশ্বের। কিন্তু মর্মান্তিক মৃত্যু তার সে স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি। তারপরও তিনি পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়ে আর ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে আছেন সোনার বর্ণমালায়।

২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রিন্সেস ডায়ানার বড়ো ছেলে ব্রিটেনের ডিউক এবং ডাচেস অব ক্যামব্রিজ প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটন পাঁচ দিনের পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য মায়ের স্মৃতি আছে এমন জায়গা গুলো ঘুওে দেখা। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে বৈঠক করেন। ইমরান খান তাদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। ইমরান খান প্রিন্স উইলিয়ামের মা ডায়ানার বন্ধু। সেখানে অনিবার্যভাবে আলোচনায় উঠে আসে প্রিন্সেস ডায়নার স্মৃতি নিয়ে নানা কথা। ইমরান খানের মায়ের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রিন্সেস ডায়ানা দুইবার পাকিস্তান সফর করেন। ইমরান খান তার মায়ের নামে লাহোরে যে বিশাল ও ব্যয়বহুল ক্যান্সার হাসপাতালটি গড়ে তুলেছেন তাতে প্রিন্সেস ডায়নারও অবদান ছিল। তিনি শুধু ইমরান খানকে উৎসাহ দেননি অর্থ জোগাড়ে ভুমিকা রেখেছেন। বিশ্বের বহু ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই হাসপাতাল নির্মানে অনুদান দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা পাকিস্তান সফরের সময় লাহোরের বাদশাহি মসজিদ দেখতে গিয়েছিলেন। উইলিয়াম আর কেট মিডলটন মায়ের দেখা মসজিদটি দেখতে যান। এ যেনো মায়ের স্মৃতিকে হাতড়ে বেড়ানো। এমনকি ডায়ানা যে গ্রামের শিশুদের সাথে কথা বলেছিলেন সে গ্রাম সফর করেন প্রিন্স উইলিয়াম ও মিডলটন।

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট। প্যারিসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত প্রিন্সেস ডায়না। একই সঙ্গে নিহত হন তার প্রেমিক দোদি আল ফায়েদ। হাহাকার করে ওঠে পৃথিবীজুড়ে হাজারো ভক্তের বুক। কিন্তু এতদিন পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যু রহস্য অজানাই থেকে গেছে। আপাত দৃষ্টিতে তিনি দুর্ঘটনায় নিহত হলেও এর পেছনে কারণ খুঁজেছেন অনেকেই। অনেকেই বলেছেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে দোদির সঙ্গে তার সর্ম্পকটইি ব্রিটিশি রাজ পরবিাররে কট্টর ভাবমুর্তির প্রতি হুমকি ছিল। তাই রাজ পরিবার তা মেনে নিতে পারেনি। কেউ বলেছেন, তাদের গাড়ির চালক মাতাল অবস্থায় ছিলেন। দোদির বাবার অভিযোগ ছিল, এটি একটি হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে কাজ করেছে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট।

ডায়না এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এটাই সত্য। কিন্তু মানবিক গুনাবলী আর ভালোবাসা দিয়ে যে ডায়না কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি বেঁচে আছেন। থাকবেন হাজার বছর। এ কারনেই হয়তো তার মৃত্যুতে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি সান শিরোণাম করেছিল, ‘গুড বাই ইংল্যান্ড’স রোজ’। তাঁর মৃত্যুতে কেঁদেছিল পুরো পৃথিবী। তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়ার দিনে রাজপ্রসাদের সামনে ভক্তদের যে পরিমাণ ফুল জমা হয়েছিল তা পৃথিবীর কোনো অন্তেষ্ট্রিক্রিয়ায় হয়নি। সেখানে একটি বাক্যে পুরো বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে স্থান দেয়া হয়েছিল,‘প্রিন্সেস ডায়ানা, উই লাভ ইউ এ্যান্ড উই মিস ইউ’। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল লিখেছিল, ‘হোয়্যার ইজ আওয়ার প্রিন্সেস’।

১৯৬১ সালের ১ জুন তাঁর জন্ম হয়েছিলো ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে। তবে ৬ বছর বয়সেই বাবা-মা’র বিচ্ছেদ দেখতে হয়েছিলো ডায়ানাকে। তাঁর জিম্মা নিয়ে বাবা ও মায়ের কদর্য আইনী লড়াই প্রভাব ফেলেছিলো ডায়ানার শিশুমনে। শেষ অবধি লেডি ডায়না স্পেন্সারের শৈশব কেটেছিলো বাবার কাছেই। ওয়েস্ট হেলথ পাবলিক স্কুলের কয়েক বছর পড়বার পর তিনি আবাসিক স্কুল রিডলসওয়ার্থ হলে পড়েছেন। পড়াশোনায় অতটা ভালো কখনোই ছিলেন না তিনি। ফেল করেছিলেন ‘ও’ লেভেলে। পরবর্তীতে পড়াশোনা তিনি শেষ করেছিলেন সুইজারল্যান্ডে। সুইজারল্যান্ডে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে লন্ডনে ফেরা অভিজাত পরিবারের এই মেয়েটির তারুণ্য কেটেছিলো খুবই সাদামাটাভাবে। শিশুবৎসল ডায়ানার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো শিশু-পরিচারিকা হিসেবেই। পরবর্তীতে কিছুদিন খন্ডকালীন বাবুর্চির কাজ করে। ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন লন্ডনের নাইটসব্রিজের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে, সহকারি শিক্ষিকা পদে। মজার ব্যাপার হলো, সেই বছরই ডায়ানার সাথে চার্লসের প্রথম আলাপ হয় বোন সারাহ’র প্রেমিক হিসেবে। সময়ের ব্যবধানে সে আলাপ গড়ালো প্রেমে। শুধু বয়সেই ১৩ বছরের বড় ফারাক নয়, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও দুজন ছিলেন দুই মেরুর।

ডায়ানার সাথে যে কেবল তখন থেকে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের পরিচয়, তা নয়। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছোট দুই ছেলে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ডের ছোটবেলার খেলার সাথী ছিলেন ডায়ানা। যা-ই হোক, ব্রিটিশ রাজমুকুটের পরবর্তী উত্তরাধিকার হওয়ায় প্রিন্স চার্লসের এই প্রেম নজর কেড়েছিলো বিশ্ব মিডিয়ার। এই জুটির চার বছরের প্রণয় পরিণতি পায় ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাইয়ের এক মাহেন্দ্রক্ষণে। লন্ডনের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে অনুষ্ঠিত তাঁদের বিয়ে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় বিশ্ব মিডিয়ায়। যার সাক্ষী হয়েছিলো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। কিন্তুবিয়েটা টিকেনি। রাজ পরিবারে থাকার সময় তিনি বুলিমিয়া ও বিষ্নতায় আক্রান্ত হন। ক্যামিলা পার্কার বোলসের সাথে স্বামী চার্লস পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় আরো দিশেহারা ডায়ানা নিজেও বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ডায়ানার সাথে বিয়ের অনেক আগে থেকেই ভাঙা-গড়ার মধ্যেই চলছিলো চার্লস-ক্যামিলার প্রেম। ১৯৯২ সালে এই দুই সর্ম্পকের কথা গণমাধ্যমের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে রাজপরিবার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর পার্লামেন্টে চার্লস-ডায়ানার বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। ১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় তাঁদের।

বিবাহ বিচ্ছেদ ডায়ানাকে বিশ্বমিডিয়ার চোখ থেকে আড়াল করতে পারেনি এতটুকুও। তিনি প্রেমে পড়েন মিশরীয় ধনকুবের ও চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি ফায়েদের সাথে। দোদি ফায়েদের আগেও পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত শল্য চিকিৎসক হাসনাত খানের সাথে ‘দুই বছরের সম্পর্ক’ নিয়ে গুজব চাউর হয়েছিলো গণমাধ্যমে। খ্যাতির বিড়ম্বনার কারণেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর শিকার হয়েছিলেন তিনি। ডায়ানা-ফায়েদ যুগল কোথায় যাচ্ছেন, কী খাচ্ছেন- এ নিয়েও নেতিবাচক চর্চা ও সমালোচনা চলতে লাগলো গণমাধ্যমে। সেই থেকে ব্যক্তিজীবন নিয়ে সাংবাদিক ও অতর্কিত ছবিশিকারী ‘পাপারাজ্জি’দের থেকে পালিয়ে বাঁচতে লাগলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। চেষ্টা করতেন দোদি এবং ডায়না এমন কোথাও যেতে যেখানে ছবি শিকারীরা থাকবেনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তা পরেননি।

পাপারাজ্জি থেকে এই পালিয়ে বাঁচতে চাওয়ার নীতিই হয়তো কাল হয়েছিলো ডায়ানার জীবনে। ১৯৯৭ সালের আগস্টে ফ্রান্সে প্রমোদ ভ্রমণে এসেছিলেন ডায়ানা ও ফায়েদ। ৩১ আগস্ট সকালে ‘হোটেল রিৎজ’ থেকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে করে বেরোতেই পথিমধ্যে তাদের ধাওয়া করে পাপারাজ্জিদের একটি দল। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দ্রত গতিতে গাড়ি আকস্মিক মোড় নিতে গিয়েই ঘটলো অঘটন। এক টানেলের রাস্তায় তাঁদের বহনকারী গাড়িটি অন্য গাড়ির সাথে সংঘর্ষে দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দোদি ফায়েদ ও গাড়িটির চালক। কোনোমতে বেঁচে যান ডায়ানার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। ওদিকে দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত ডায়ানাকে দ্রুতই একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। শরীরে অজস্র জখম নিয়ে তীব্র যন্ত্রণার সাথে কয়েক ঘন্টার লড়াই শেষে পরপারে পাড়ি জমান প্রিন্সেস ডায়ানা। তবে অনেকে মনে করেন তার মৃত্যুর সাথে আছে রাজ পরিবারের হাতে। বৃটিশ সিক্রেট সার্ভিস তাকে হত্যা করেছে। ডায়ানার মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেননি অনেকেই। এ সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নানা অনুমান ও ষড়যন্ত্র তত্ব। অনেকেরই ধারণা মার্সিডিজ গাড়িটির চালক হেনরি পল ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থার লোক। এমনকি রাজপরিবারের সাবেক বধূ খৃষ্টান নয়, এমন কাউকে বিয়ে করবেন এই সম্ভাবনা মেনে নিতে পারেনি ব্রিটিশ রাজপরিবার। তাই নিজেদের আভিজাত্য বাঁচাতেই ডায়ানাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। এমনকি অনেকে এমনও মনে করেন প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন ডায়ানার আপন বোন লেডি সারাহও।

মৃত্যুর পরে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে ডায়ানার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন অন্তিম স্মৃতি পাঠ করেছিলেন তাঁর ভাই চার্লস স্পেন্সার। এল্টন জনের শোকসঙ্গীত পরিবেশনাও ছিলো সে চির বিদায় অনুষ্ঠানে। সে অনুষ্ঠান টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করেছিলো বিশ্বের প্রায় বত্রিশ মিলিয়ন মানুষ। সারা পৃথিবীর সংবাদপত্র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। টাইম ম্যাগাজিন কভার স্টোরি করে। প্রতিটি সংবাদেই তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছাড়াও মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। চির বিদায় অনুষ্ঠানে শেষে তাঁর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় স্পেন্সার মালিকানাধীন অ্যালথর্পের একটি ছোট্ট দ্বীপে। সেখানেই সমাহিত হন কোটি মানুষের হৃদয়ের রানী প্রিন্সে ডায়ানা।

ডেথস্পষ্টটি দেখতে দেখতে মনটা খুব ভারী হয়ে ওঠে। টানেলের ভেতরটা বাইরে থেকে খুব একটা দেখা যায়না। কিন্তু যে পিলারের সঙ্গে আঘাত লেগেছিল সেই পিলারটি ঠিকই দেখা যায়। এই ডেথস্পটটি দেখে ফিরতে ফিরতে মনে হলো, রাজপরিবারের কঠোর বিধি নিষেধের বাইরে এসে নিজের একটা আলাদা ইমেজ তৈরির চেষ্টা কী কাল হলো ডায়ানার জীবনে। না-কি মুসলিম প্রেমিককে মানতে পারেনি ব্রিটিশ রাজপরিবার। মৃত্যুসংক্রান্ত বিষয়ে বিশ্বমিডিয়া কখনোই এটা একটি স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়নি। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল, ‘প্রিন্সেস ডায়ানা, বয়ফ্রেন্ড আর কিলড ইন প্যারিস’। মৃত্যুর দু‘যুগ পরেও বিশ্ববাসীর মনে এই বিষয়টি অমিমাংসিতই থেকে গেছে।

সম্প্রতি আমেরিকার টকশো উপস্থাপক অপরা উইনফ্রির সাথে ব্রিটিশ রাজ পরিবার থেকে বেরিয়া যাওয়া প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের একটি সাক্ষাতকার বিশ্বমিডিয়ায় তোলপাড় হওয়ার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজ পরিবারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সেখানে মেগান মার্কেল বলেছেন, ব্রিটিশ রাজপরিবারে বিয়ে করার পর তার ওপর চাপ নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন ডায়ানার বন্ধুদের সাথে। ওই পরিবারের ভেতরে থাকাটা আসলে যে কীরকম চাপের তা আর তিনি (প্রিন্সেস ডায়ানা) ছাড়া কে বুঝতে পারতো?” প্রিন্স হ্যারি বলেছেন, ‘তার আশংকা হয়েছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে’। তাঁর মায়ের সঙ্গে হওয়া আচরণ, সে সময়ের তাঁর মায়ের রাজপরিবারের প্রথাভাঙার যে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে মায়ের ছোট ছেলে ও স্ত্রী’র রাজপরিবার থেকে বের হয়ে আসার এক অদ্ভুত অন্তমিল রয়েছে। এর শেষ কোথায় তা দেখতে হয়তো অপেক্ষা করতে হবে যুগের পর যুগ। তবে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে কৃষ্ণাঙ্গ বিশপ মাইকেল ব্রুস কারি আবেগঘন উক্তি ‘ভালোবাসায় শক্তি আছে’-তা প্রমাণিত হয়ে এসেছে যুগে যুগে।

লেখক: আসাদুজ্জামান সম্রাট, নগর সম্পাদক-দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও সম্পাদক-পার্লামেন্ট জার্নাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত