প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. লেলিন চৌধুরী: করোনাকালে চট্টগ্রামে ইন্টার্নি ডাক্তারদের ধর্মঘট ও জবাবদিহিতা

ডা. লেলিন চৌধুরী: গত ২৮এপ্রিল সকাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকদের ধর্মঘট শুরু হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই খবরে দেশবাসী চমকে উঠেছে। তারা একইসঙ্গে ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ। চিকিৎসক সমাজের সকল সদস্য বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হয়েছে। তারা মনে করছে, এমন একটি ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসায় বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। করোনার মতো বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অতিমারীর সময়ে হুট করে এরকম ধর্মঘট ডাকা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এতে কর্তব্য-কাজে অবহেলার পাশাপাশি ডাক্তারদের সামাজিক মর্যাদার অবনতি ঘটে। কতিপয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য চিকিৎসক সমাজকে লজ্জিত হতে হয়। করোনার এই মহাদুর্যোগের সময় আর্ত মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জরুরি হচ্ছে ডাক্তারদের সেবা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কি এমন ঘটলো যার কারণে ইন্টার্নি ডাক্তারদের কাজ বন্ধ করে ধর্মঘটে যেতে হলো ?

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুইটি বিবদমান অংশ রয়েছে। সদ্য ছাত্রত্ব শেষ করা ইন্টার্নি ডাক্তাররাও এই গ্রুপিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাদের এক গ্রুপ সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং অন্য গ্রুপ শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুগত। গত ২৭ এপ্রিল বিকেল ও রাতে দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় মারামারি হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়। ২৮ এপ্রিল সকাল থেকে ইন্টার্নি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন ধর্মঘটের ডাক দেয়। মোদ্দাকথা এই ধর্মঘট করা হয়েছে আধিপত্যকামী দুই গ্রুপের মারামারির ফল। এর সাথে চিকিৎসার মানোন্নয়ন, চিকিৎসকদের প্রতি সংগঠিত কোনো অবিচারের প্রতিকার দাবি, চিকিৎসক সমাজের স্বার্থরক্ষা বা চিকিৎসকদের মর্যাদার মতো কোনো বিষয় যুক্ত নেই। এটা চরদখলকারী দুইটি দলের আধিপত্য বজায় রাখার প্রয়াস মাত্র। ধর্মঘট আহ্বানের যে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রয়েছে এখানে সেটাকেও অনুসরণ করা হয়নি। করোনাকালের দুর্যোগে ডাক্তারদের নাম ব্যবহার করে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন ধর্মঘট কেবলমাত্র চিকিৎসকদের মর্যাদাহানি ঘটাবে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন( বিএমএ)-র পক্ষ থেকে দেশবাসীর সামনে বিষয়টি খোলাসা করা দরকার।

ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া থেকে মারামারি, আহত হওয়া, থানায় কেস করা ইত্যাদি স্তর পার হয়ে ঘটনাটি ধর্মঘটে গড়ায়। চট্টগ্রামের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বিএমএ (চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল), বিএমএ, চট্টগ্রাম জেলা বিবাদটি সমাধানের দায়িত্ব নিতে পারেনি- এটা দেশবাসীকে বিশ্বাস করতে হবে? দুই নেতা তাদের অনুসারীদের ধর্মঘট থেকে বিরত রাখতে এবং বিবাদ মিটাতে পারেনি? মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে কী করেছে? জানি এসব প্রশ্নের জবাব দেশবাসী কখনোই পাবে না। একটি স্বাস্থ্য-জরুরি অবস্থার ভেতর দিয়ে দেশ চলছে। দেশে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন ২০১৮ বলবৎ রয়েছে। এমতাবস্থায় চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত ডাক্তাররা ধর্মঘটে যেতে পারে? এমনিতেই বিনা নোটিশে ধর্মঘট ডাকা অন্যায়। করোনার মতো মহামারীর সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকরা এভাবে ধর্মঘট ডাকতে পারেনা। এটা অগ্রহণযোগ্য। ডাক্তার হয়ে ডাক্তারের মর্যাদা ও সুবিধার দাবিদার হবে অথচ অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে না সেটা হতে পারে না।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ছোবলে দেশের মানুষ বিধ্বস্ত। জীবন এবং জীবিকা দুটোই হুমকির সম্মুখীন। করোনাকালে দেশের প্রতিটি মানুষ একধরনের গভীর মানসিক চাপের মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে। এই দুর্দিনে রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ১৬০-র মতো চিকিৎসক করোনাতে প্রাণ দিয়েছে। করোনাকালের প্রথমদিকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কিছুটা বিঘ্নিত হয়। কিন্তু সেটার জন্য চিকিৎসকরা নয়, দেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপকদের পরিকল্পনার অভাব ও সমন্বয়হীনতা দায়ী ছিল। দেশের মানুষ খুব দ্রুত সেটা অনুধাবন করতে সমর্থ হয়। করোনার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের সম্মুখসারির প্রধানযোদ্ধা চিকিৎসকেরা। দেশের মানুষ তাদের এই ভূমিকাকে স্বীকৃতি জানিয়েছে, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় অভিষিক্ত করেছে। কতিপয় অপরিণামদর্শী চিকিৎসকের অগ্রহণযোগ্য আচরণের জন্য চিকিৎসকদের মহান অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না।
লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত