প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আট মাসে বাজেট বাস্তবায়ন ৩৩ শতাংশ

নিউজ ডেস্ক: করোনা মহামারীর মধ্যেই চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। ফেব্রুয়ারি শেষে দেখা গেছে, সেখান থেকে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সব ধরনের উন্নয়নকাজে স্থবিরতা ছিল। এছাড়া সরকারও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি নিয়েছে। তার পরও উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করার অনুমতি দেয় অর্থ বিভাগ। কিন্তু সে অনুযায়ী খরচ করতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। তাই উন্নয়ন খাতে ব্যয় তুলনামূলক কম হয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে, যার প্রভাব পড়েছে বাজেট বাস্তবায়ন হারে। উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের নয় মাসের তথ্য সংকলন হলেও বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে আট মাসের তথ্য।

সরকারের বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হয় উন্নয়নকাজে। এজন্য প্রতি অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে ব্যয়ের একটি লক্ষ্য ঠিক করা থাকে। চলতি অর্থবছর সংশোধিত বাজেটে এডিপি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ২৭১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কিন্তু এক্ষেত্রেও বাস্তবায়ন হার ভালো নয় এবার। গত মার্চ পর্যন্ত এডিপি থেকে ব্যয় হয়েছে ৮৭ হাজার ৭৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে অর্থবছরের নয় মাসে এডিপি বরাদ্দের মাত্র ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে সরকার।

জানা গেছে, নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে গত অর্থবছরের (২০১৯-২০) জুলাই-মার্চ সময়ে বাস্তবায়ন হার ছিল ৪৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়ে ৪৫ দশমিক ১৫ শতাংশ এডিপির অর্থ খরচ হয়েছিল।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তাই রাজস্ব আহরণও তুলনামূলক কম। বিপরীতে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ব্যয় বেড়ে গেছে। তাই সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার পরও এডিপিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্য থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ খরচ করতে পারবে। কিন্তু কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ কাঙ্ক্ষিত হারে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারছে না। তাই সার্বিক বাজেট বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, গত ২৫ মার্চ আর্থিক মুদ্রা ও মুদ্রাবিনিময় হার-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে বাজেট বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তাদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। তারাও তাদের বাজেট বাস্তবায়ন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া খরচ কমাতে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নতুন গাড়ি কেনায় নিষেধাজ্ঞা ৩১ ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের ভ্রমণ ব্যয়ও অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে সরকার। এ কারণেও সরকারি খরচ কমেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত নয় মাসে জাতীয়ভাবে গড় এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ হলেও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়েছে মাত্র প্রায় ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বিভাগের অনুকূলে এডিপি বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে নয় মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৫১৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। এ পরিস্থিতিতেও করোনা মোকাবেলায় আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) উন্নয়ন বাজেটে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে এ বিভাগ। কভিডকালে স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ গুরুত্বকে বিবেচনায় নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ কারণে নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়েও বরাদ্দ আরো ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, গৃহীত প্রকল্পগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে তাদের অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন। তবে তারা মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতে কাজ করে। তাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে। স্বাস্থ্য খাত হচ্ছে সরকারের অগ্রাধিকার খাত। তাই এ খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার শতভাগ ব্যবহারে তারা কাজ করছে। এজন্য একটি মনিটরিং টিমও গঠন করে দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী বরাদ্দের শতভাগের মানসম্মত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

করোনায় সবকিছুতে এ ধরনের স্থবিরতায় কেবল সরকারের ব্যয় কমেছে তা নয়, আয় ও প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আহরণ করেছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণের এ পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় ৪৩ হাজার কোটি টাকা কম। এ আট মাসে সরকারের আয়ের বাকি ২১ হাজার ৭১১ কোটি এসেছে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে। এছাড়া ১৫ হাজার ২১০ কোটি টাকা বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহিঃউৎস থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চাহিদা পূরণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এটা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই প্রথম সাত-আট মাসে বাজেট বাস্তবায়নের হার খুবই কম থাকে। তারপর শেষের দিকে তাড়াহুড়ো করে ব্যয় হোক বা না হোক কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়। তবে এবার করোনা যুক্ত হয়ে বাজেট বাস্তবায়নের মাত্রাটা আরো কমে গেছে। এই যে প্রবণতা অনেক দিন থেকে চলে আসছে। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা বাড়তে হবে। এছাড়া যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। – বণিক বার্তা

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত