প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গ্র্যান্ড প্লেস, ইউরোপের গুলিস্তান…

আসাদুজ্জামান সম্রাট : ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড কোয়ার্টার ও ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ও ন্যাটোর অবস্থান পশ্চিম ইউরোপের ছোট্ট দেশ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। এজন্য বেলজিয়ামকে ইউরোপের রাজধানী হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। ২০১৫ সালে ইউরোপ সফরে সবচে’ বেশি সময় ছিলাম ব্রাসেলসে। এখান থেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম এবং তিন দেশের মিলনস্থল দেখতে গিয়েছিলাম। ছোট্ট দেশ হলেও প্রভাবশালী এবং ছবির মতো সুন্দর দেশ বলতে যা বোঝায় তার সবটাই বেলজিয়ামে বিদ্যমান।

প্যারিস থেকে বাসে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম খুব ভোরে। ৩১৯ কিলোমিটার দূরত্বের এই এই পথটি চার ঘণ্টারও কম সময়ে আমরা পৌঁছে যাই। কখন যে ফ্রান্সের সীমানা পার হয়ে বেলজিয়ামে ডুকে পড়েছি তা বুঝতেই পারিনি। ব্রাসেলসের ‘সিসিএন গার দু নর্দ’ বাসস্টেশনে আমাদের রিসিভ করতে এসেছিলেন ব্রাসেলস আওয়ামী লীগে নেতা আব্দুস সালাম। দুপুরে তার বাসায় ‘পিওর বাংলাদেশী’ খাবার খেলাম তৃপ্তিসহকারে। কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশী রান্না খাওয়া হচ্ছিলো না। চাঁদপুরের মানুষ সালাম ভাইয়ের বাসায় দুপুরের মেনুতে ইলিশও ছিল। সেটি চাঁদপুরেরই ইলিশ এমন গ্যারান্টি তিনি অবশ্য দিতে পারেননি। ব্রাসেলসে আমাদের দেশের যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই গ্রোসারি শপ অথবা রেষ্টুরেন্টের মালিক বা কেউ কর্মচারী। বাংলাদেশী মালিকানাধীন রেষ্টুরেন্টগুলো পরিচিত ‘ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট’ হিসেবে। তবে এর বাইরেও কিছু মানুষ রয়েছেন যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। অথবা বেলজিয়ামের শহরতলীতে কৃর্ষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

উইকিপিডিয়া বলছে, বেলজিয়াম এটি একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দেশ। এটি ইউরোপের ক্ষুদ্রতম ও সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির একটি। বেলজিয়াম ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এটি ইউরোপের সর্বাধিক নগরায়িত দেশ। এখানকার ৯৭% লোক শহরে বাস করে। দেশটির নাম বেল্গায়ে নামের এক কেল্টীয় জাতির নাম থেকে এসেছে। এই জাতিটি এখানকার আদি অধিবাসী ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে জুলিয়াস সিজার এলাকাটি দখল করে নেন। ব্রাসেলস শহরটি বেলজিয়ামের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইউরোপীয় কমিশন, ন্যাটো এবং বিশ্ব শুল্ক সংস্থার সদর দপ্তর ছাড়াও ইউরোপীয় পার্লমেন্টের নতুন ভবন এখানে অবস্থিত। ইউরোপীয় পার্লমেন্টের আদি ভবন ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে অবস্থিত। বেলজিয়াম ইউরো জোন-এ অবস্থিত এবং এর মুদ্রা ইউরো। ইউরো প্রবর্তনের পূর্বে বেলজিয়ামের মূদ্রার নাম ছিল বেলজিয়াম ফ্রাঁ। ফ্রান্স এবং উত্তর ইউরোপের সমভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত দেশটির উত্তরে উত্তর সাগর। ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় দেশটি মধ্যযুগ থেকেই একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর সাগরের মাধ্যমে দেশটি বাকী বিশ্বের সাথে বাণিজ্য যোগাযোগ রক্ষা করে।

বেলজিয়ামের অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহু যুদ্ধ হয়েছে। ১৮৩০ সালে বেলজিয়াম স্বাধীনতা লাভ করে। বেলজিয়াম তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত- ফ্ল্যান্ডার্স, ওয়ালোনিয়া এবং ব্রাসেলস ক্যাপিটাল সিটি। ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলটি ব্রাসেলসের উত্তর ও পশ্চিমে অবস্থিত; এখানে বেশির ভাগ লোক ওলন্দাজ (ফ্লেমিশ) ভাষায় কথা বলেন এবং এরা ফ্লেমিং নামে পরিচিত। ওয়ালোনিয়া ব্রাসেলসের পূর্বে ও দক্ষিণে অবস্থিত এবং এখানকার বেশির ভাগ লোক ফরাসি ভাষায় কথা বলেন; এরা ওয়ালোন নামে পরিচিত। ব্রাসেলস অঞ্চলের উভয় জাতের লোকের বাস। প্রতিটি অঞ্চলই প্রায় স্বায়ত্তশাসিত; কিন্তু ফ্লেমিং ও ওয়ালোনদের মধ্যে এখনও তীব্র দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। ফ্ল্যান্ডার্স এলাকা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য আন্দোলন করে আসছে। একদিক থেকে বেলজিয়ামের সঙ্গে আমাদের একটি সাদৃশ্য রয়েছে। আমরা যেমন ভাষার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছি তেমনি বেলজিয়ানরাও ভাষার জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহে পর্যন্ত লিপ্ত হয়েছে। প্রধান ভাষা ফ্লেমিশ এবং ফরাসী। তৃতীয় প্রচলিত ভাষা জার্মান। কেবল ব্রাসেলস শহরে ফ্লেমিশ এবং ফরাসি উভয় ভাষাই সরকারীভাবে ব্যবহৃত হয়। ফ্ল্যান্ডার্স এলাকায় অবিমিশ্রভাবে ফ্লেমিশ ভাষা প্রচলিত। ওয়ালোনিয়া এলাকায় প্রচলিত ফরাসি ভাষা। তবে দূতাবাসের শহর ব্রাসেলসে ইংরেজি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বেলজিয়ামে দুইটি সরকারী ভাষা প্রচলিত: ওলন্দাজ এবং ফরাসি। বেলজিয়ামের প্রায় ৫৭% লোক ওলন্দাজ ভাষার একটি উপভাষা ফ্লেমিশে কথা বলে। ফরাসি ভাষা প্রায় ৩৩% লোকের মাতৃভাষা এবং ফরাসিভাষীরা মূলত দেশের দক্ষিণাংশে ওয়ালুন অঞ্চলের বাস করে। এছাড়া পূর্বের অয়পেন-মালমেডি-সাংক্তভিট প্রদেশগুলিতে প্রায় দেড় লক্ষ জার্মান ভাষাভাষী বাস করে। বেলজিয়ামের সংখ্যালঘু ভাষাগুলির মধ্যে আরবি, তুর্কি, কাবিলে, স্পেনীয়, পর্তুগিজ এবং লেৎসেবুর্গেশ ভাষা অন্যতম।

বেলজিয়ামে বেড়ানোর একটি সুন্দর জায়গা হচ্ছে ‘অটোমিয়াম’। ১৯৫৮ সালে ব্রাসেলস ওয়ার্ল্ড ফেয়ার এক্সপো এর জন্য এটি স্থাপন করা হয়েছিল। টিকেট কেটে ১০২ মিটার উঁচু অটোমিয়ামের উপরে উঠে ব্রাসেলস শহর দেখতে অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। সিটি সেন্টার বা গ্রান্ড প্লেস হচ্ছে বেলজিয়ামের বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট। গ্রান্ড প্লেসে সারা বছর পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যেই থাকে। এখানে দশম শতক থেকে শুরু হওয়া দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য সমৃদ্ধ অসাধারণ স্থাপত্য দেখতে পারবেন। প্রথমদিনেই রাতে আমরা যাই ‘অটোমিয়াম’ দেখতে। বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের সভাপতি শহীদুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম, মো. মনির হোসেন এবং যুবলীগ সভাপতি মোর্শেদসহ আরো কয়েকজন ছিলেন। রাতের অটোমিয়ামের লাইটগুলো একটা ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করে। প্রচণ্ড শীতে ঠিকমতো ছবি তোলা কষ্টকর মনে হচ্ছিলো।

তারপরেও ছবি তোলা, সেলফি চলতে থাকলো। স্টারবাকের কফি ঠান্ডা নিবারনে কিছুটা সাহায্য করে। ৩৩৫ ফুট উঁচু একটি অ্যাটমের আকৃতি যা পুরোটাই বানানো হয়েছে ইস্পাত দিয়ে। আর অটোমিয়ামের নকশা করেছেন আন্দ্রে ওয়াটারকেইন। ১৯৫৮ সালে পরমাণু যুগের স্মৃতিস্বরূপ এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্রাসেলস শহরের পশ্চিমে অবস্থিত হেইসেল পার্কেই অবস্থিত অটোমিয়াম। অবসরে সময় কাটানোর জন্য ব্রাসেলসের নাগরিকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হেইসেল পার্ক। নানা বয়সের মানুষের পদচারণায় সবসময় মুখরিত থাকে এই পার্কটি।

অটোমিয়াম দেখা শেষে আমরা চলে আসি গ্র্যান্ড প্লেসে। এখানে মনির ভাইয়ের একটি দোকান রয়েছে। তিনি জানালেন, আরো অনেক বাংলাদেশীর দোকান রয়েছে। এখানকার দোকানটি তার বড়ো ছেলে সাগর মোহাম্মদ দেখাশোনা করেন। রাতের বেলা যখন বিভিন্ন রঙে গ্রান্ড প্লেসকে রাঙিয়ে তোলা হয়। এটার পাশেই অনেকগুলো খাবারের দোকান আছে। ১৯৭১ সাল থেকে প্রতি ২ বছর পর পর এ প্লেসের ফাঁকা জায়গায় প্রায় শ’খানেকের বেশি ভলান্টিয়ার ৭৫ মিটার লম্বা আর ২৪ মিটার প্রশস্ত ফুলের কার্পেট বানিয়ে বিছিয়ে রাখেন। এটা দেখার জন্য বিশ্বের মানুষজন সেখানে বেড়াতে আসেন। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই গ্র্যান্ড প্লেস। দুটি ক্ষুদ্র জলাভূমি পরিচিত ব্রয়েক সেলা নামে। আর শহরের নাম ব্রাসেলস হয়েছে এই ব্রয়েক সেলা থেকেই। এই জলাভূমিতেই গড়ে উঠেছে মার্কেট যেখানে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড থেকে আনা কাপড় এবং ফরাসি ওয়াইন ও জার্মান বিয়ার বিক্রি করা হয়। গ্র্যান্ড প্লেসকে কেন্দ্র করেই ব্রাসেলসের সবচেয়ে বড় বাজার গড়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের গুলিস্তানের মতোই দিনভর এখানে মানুষের ভীর থাকে। আর এ কারনেই আড্ডা হোক কিংবা রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি, সবকিছুই অনুষ্ঠিত হয় ব্রাসেলসের এই প্রাণকেন্দ্রে।

গ্র্যান্ড প্লেসের সাথেই টাউন হল। এক জায়গাতেই গেলেই ব্রাসেলসের দুটি ঐতিহ্য দেখে আসা হবে। টাউন হল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৪০২ সালে। আর্চড জানালা এবং বিভিন্ন ভাস্কর্যের সঙ্গে তৈরি টাওয়ার এর রূপ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বহন করে চলেছে বেলজিয়ামের ঐতিহ্য। যদি আপনার সময় এবং শক্তি থাকে তাহলে ৯৬ মিটার উঁচু ব্রাবানটাইন গোথিক টাওয়ারের চূড়ায় চলে যেতে পারেন, তাহলে একবারে পুরো ব্রাসেলস শহরের এক ঝলক দেখে নিতে পারবেন। আমাদের তাড়া ছিল এখানকার রাজপ্রসাদ দেখবো। আমরা সেদিকে যেতেই আর টাওয়ারের চূড়ায় ওঠা হলো না। পরে জেনেছি রাজার অনেকগুলো না-কি প্রসাদ আছে। রাজপ্রসাদের সামনে ছবি তুলে চলে গেলাম শহীদ ভাইয়ের রেষ্টুরেন্টে। সেখানে আরো অনেক বাংলাদেশী মানুষ জড়ো হয়েছেন। তাদের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ একটা আড্ডা হয়ে গেলো। পুরো সময়টিই এক টুকরো বাংলাদেশের মধ্যে কেটে গেলো। এরপরেও অনেকগুলো আড্ডায় গিয়েছি। বিতর্কিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখাও হয়েছে। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। সেকথা না হয় লিখলামই না।

আড্ডা হয়েছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রাখার জন্য কাজ করা জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও বেলজিয়ামের বাংলাদেশ সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালন। তার সঙ্গে একজন বিচারপতির ইমেইল ও ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন তিনি। আমাদের আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার এতো বছর পরে শুরু হওয়া এই বিচারপ্রক্রিয়া যাতে কোনোভাবেই বিতর্কিত না হয় তার জন্য তিনি চেষ্টা করেছিলেন। যে বিচারপতির সঙ্গে তাঁর ইমেইল বা ফোনালাপ ফাঁস করেছিল ইকোনোমিস্ট, সেই বিচারপতির বড়ো ভাইয়ের বন্ধু নিজাম উদ্দিন। তিনি শুধু এটুকুই চেষ্টা করেছেন, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বের কোথাও যেনো প্রশ্ন না ওঠে এবং বিচারটি যেনো আন্তর্জাতিক মানদন্ডে হয়। এটা নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা তিনি ভাবতেও পারেননি।

ব্রাসেলসে পর্যটকদের কাছে আরেকটি প্রধান আকর্ষণ মানিকেন পিস। মানিকেন মূলত একটি নগ্ন শিশুর ভাস্কর্য। যে বিরতিহীনভাবে মূত্রত্যাগ করেই যাচ্ছে। গ্র্যান্ড প্লেস থেকে মাত্র মিনিট পাঁচেকের হাঁটার দূরত্বে অবস্থিত মাত্র ৬১ সেন্টিমিটারের বা ২৪ ইঞ্চি ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যটি। ১৬১৮ কিংবা ১৬১৯ সালের দিকে মানিকেন পিস স্থাপিত হয়। একটি কলামের ওপর দাঁড়িয়ে ছোট মানেকেন পিস। অবিরত ঝরনার মতো মূত্র ত্যাগ করেই চলছে একটি বেসিনে। ব্রাসেলসের জনগণের সর্বাধিক পরিচিত ও প্রিয় প্রতীক এটি। এটি বেলজিকদের রসবোধ এবং মনের স্বাধীনতার প্রকাশ। ছেলেটি বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রাসেলস শহরের আইকন হয়ে উঠেছে। ২৪ ঘণ্টা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে স্থানটি। তবে এই মানিকেন পিস নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে বেলজিকদের মধ্যে। ১৪৫১-৫২ সালে একটি প্রশাসনিক নথিতে প্রথম এই চরিত্রটির উল্লেখ পায় বেলজিকরা। মূলত: সেই তথ্যটি ছিল ব্রাসেলসের পানি সরবরাহকারী একটি ঝরনা-সম্পর্কিত। শুরু থেকেই ঝরনাটি পানীয় জল বিতরণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল ব্রাসেলস শহরে। কথিত আছে ঝরনাটি ১৫ শতকের গোড়ার দিকে শহরজুড়ে পানীয় জলের বিতরণে ব্যবহৃত হয়েছিল।

সর্বাধিক বিখ্যাত কাহিনি হলো এ রকম: চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্রাসেলস একটি বিদেশি শক্তি দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল। আক্রমণকারীরা শহরের দেয়ালে ক্লাস্টার বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করেছিল। তারা প্রস্তুতি নেওয়ার সময় জুলিয়ানস্ক নামের একটি ছোট্ট ছেলে জ্বলন্ত ফিউজে মূত্র ত্যাগ করেছিল, এইভাবে শহরটি সেদিন রক্ষা পায় বিদেশি আক্রমণকারীদের থেকে। আর একটি গল্প প্রায়ই শোনা যায় পর্যটকদের কাছে। এক ধনী বণিক পরিবার নিয়ে বেড়াতে গেছেন ব্রাসেলস। একসময় বণিকের শিশুপুত্রটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শিশু অনুসন্ধানের জন্য বণিকটি খুব দ্রুত একটি অনুসন্ধান কমিটি করেন এবং তারা শহরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় শিশুটিকে পাওয়া গেল, যখন কিনা সে একটি বাগানে মূত্র ত্যাগ করছিল। শিশু অনুসন্ধানে স্থানীয় যে লোকেরা সাহায্য করেছিলেন, তাদের কাছে কৃতজ্ঞতার উপহার হিসেবে বণিক ঝরনাটি তৈরি করেছিলেন।

এটি নিয়ে গল্পের শেষ নেই। আরও একটি প্রচলিত গল্প হচ্ছে, একটি ছোট ছেলে তার মায়ের কাছ থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। সন্তানের ক্ষতিতে আতঙ্কিত এই নারীর ডাকে শহরের মেয়র পর্যন্ত সাড়া দিয়েছিলেন। শহরজুড়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যখন শিশুটিকে পাওয়া গেল তখন শিশুটি একটি ছোট রাস্তার কোণে প্রস্রাব করছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পটি থেকে যায় এবং এই কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে ভাস্কর্যটি তৈরি হয়। ভাস্কর্যটি এখন আর পানি বিতরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না, এটি শহরটিকে নতুন উপায়ে সমৃদ্ধ করে আসছে। ভাস্কর্যটি মূলত উলঙ্গ হলেও মানেকেনের কিন্তু অভিজাত পোশাক আছে। তার জন্য ঘটা করে পোশাক তৈরি হয়। পোশাকের ধরন-ধারণ দ্বাদশ শতাব্দীর। অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে বিশেষ ও জাতীয় অনুষ্ঠান এবং উৎসব উপলক্ষে মানেকেন পিসকে সাজানো হয়। ২০১৬ সালে তার জন্য ৯৫০টি পোশাক জমা পড়ে। তার পোশাক পরিবর্তনও বেশ আড়ম্বর, দেখার মতো। ব্যান্ডের সুর এবং ছন্দে এই পোশাক পরিবর্তন করা হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতিবছর জমা হওয়া কয়েক শ’ ডিজাইন পর্যালোচনা করে ব্যবহারের জন্য অল্পসংখ্যক নির্বাচন করা হয়। তার প্রায় এক হাজার বিভিন্ন পোশাক রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলি গ্র্যান্ড প্লেস-সংলগ্ন সিটি মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে দেখা যায়। ভাস্কর্যটি চুরি করে তা বিকৃত করার চেষ্টা হয়েছিল বিভিন্ন সময়। এ কারণে এখন ভাস্কর্যটি ধাতব গ্রিল দ্বারা সুরক্ষিত। সাতবার চুরি হয়েছি বেলজিকদের অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রিয় নাগরিক মানেকেন পিস।

এক সপ্তাহের এই ভ্রমণে একদিন বিকেলে ব্রাসেলসে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের সঙ্গে একটি বিকেল কাটিয়ে গেলাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পার্লামেন্ট ভবন দেখতে। ভবনটির কাছেই আব্দুস সালামের দোকান। আমাদের সঙ্গে মনির ভাইও ছিলেন। আমাদের দেশে পার্লামেন্ট ভবন সাধারণ মানুষ দেখে দূর থেকে। বিশাল প্রাচীরের বাইরে থেকে সংসদ ভবন দেখতে হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট ভবনের একেবারে কাছে চলে যাওয়া যায়। আমি তো এ্যাক্রেডিটেশন সেন্টারের কাছে পৌছে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় সেখানে কোনো লোকজনও ছিলনা। তেমনি ছিলনা নিরাপত্তার বাড়-বাড়ন্ত। ইইউ পার্লামেন্টের সামনের পার্কে একটি একটি বেঞ্চিতে কম্বল মুড়ি দিয়ে এক ব্যক্তিকে সটান শুয়ে থাকতে দেখলাম।

বেলজিয়ামের আরেকটি পরিচিতি হচ্ছে, বিয়ার আর চকলেটের দেশ হিসেবে। অসংখ্য ভ্যারাইটিজের বিয়ার আর চকলেট পাওয়া যায় এখানে। প্রায় আটশ’ প্রকারের বিয়ার রয়েছে বেলজিয়ামে। রাস্তার আশপাশে প্রায় সব জায়গায়তেই পানীয়ের দোকান। এখানে পানির দামেই বিয়ার বিক্রি হচ্ছে। কোথাও পানির চেয়েও সস্তা। যেখানে ৫০০ মিলির একটি এভিয়ান ওয়াটার বোতল ১ দশমিক ১৫ ইউরো। সেখানে একই পরিমাণের বিয়ার পাওয়া যায় ১ থেকে দেড় ইউরোতে। বড় বড় গ্লাসে বিয়ার আর সঙ্গে লাঠির মতো গোলাকৃতির রুটি দিয়েই (ওরা সম্ভবত: এটি ফ্রিট বলে) নাস্তা বা লাঞ্চ সারেন অনেকে। মনির ভাইয়ের একটি দোকানে এক সকালে গিয়েছিলাম তার ফোন বুথ থেকে ফোন করতে। সেখানে যে পরিমাণ বিয়ার বিক্রি হতে দেখেছি সে পরিমাণ অন্য কিছু বিক্রি হতে দেখিনি।

ব্রাসেলসে থাকাকালে এক শুক্রবার জুমার নামের জন্য যাই স্থানীয় বাংলাদেশ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার মসজিদে। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে ওজু করেছিলাম। নামাজের জন্য কোনো টুপি ছিলনা আমার কাছে। এর আগে কে যেনো আমাকে একটা টুপি আকৃতির উলের ক্যাপ দিয়েছিলেন। আমি সেটা পড়েই নামাজ পড়লাম। পরে শহীদুল হক ভাই বললেন, আপনি তো বিয়ারের কোম্পানির টুপি পড়ে নামাজ পড়েছেন। মাথা থেকে টুপিটি খুলে দেখি সেখানে বেলজিয়ামের জনপ্রিয় বিয়ার জুপিলারে’র লোগো লাগানো আছে। সেই যে মাথা থেকে চুপিটি খুলেছিলাম পরে আর পড়িনি কখনো।

বেলজিয়ামের মানুষের মানুষের চকলেটপ্রীতি এতো বেশি যে, এখানে বাস, ট্রামে কিংবা হাটতে হাটতে সবাইকে চকলেট খায়। বেলজিয়ামে অর্থনীতিতে চকলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। স্পেনীশ উপনিবেশ থাকাকালে বেলজিয়ামে চকলেট উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তী আফ্রিকার দেশ থেকে চকোলেটেরে কোকোয়া আমদানি করার ফলে এখানে প্রচুর চকলেট উৎপাদন প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়। একই সঙ্গে চকলেটকে ঘিরে বাড়ে শ্রম বাজারও। ১৯ শতকের শুরু থেকে এখানে চকলেটের নানা পদ সৃষ্টি করা হয়। এ সময়ে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট আকৃতির নয়। খরগোস, বেড়ালসহ নানা প্রাণীর আকারেও চকলেট তৈরি করে জনপ্রিয়তা তৈরি করা হয়। বর্তমানে এদেশে দেশে দুইশ’রও বেশি চকলেট উৎপাদন কোম্পানি রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, এখানে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ টনের বেশি চকলেট উৎপাদন হয়। চকলেন বেলজিয়ামের আন্যতম রফতানিকৃত পণ্য।

ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুভাজির কথা শুনলে মনে হবে এটা ফ্রান্সেই মনে হলেও এটি প্রথম চালু করে বেলজিয়ামের মানুষ। তারা এই আলু ভাজা আবিষ্কারের গর্বে গর্বিত। বেলজিয়ামের সব জায়গাতেই ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের চল রয়েছে। এখানে নানাভাবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া হয়। কয়েকটি আড্ডায় ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের স্বাদ নিয়েছি। ছুটির দিনে শহরতলীর এক পার্কে গিয়েছিলাম। উচ্চারণগত সমস্যার কারনে তার নামটি মনে করতে পারছি না। এই পার্কের ফল সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ তা খেতে পারেন। সেখানের আপেল বাগান থেকে গ্রীণ আপেল পেড়ে খেয়েছিলাম। পাশেই ছোট্ট একটা বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছি। প্রায় একটা দিন কাটিয়ে শহরে ফিরে আসি।
তবে এতোসবের মধ্যে দেখা হয়নি কোয়েকেলবার্গ বাসিলিকাকে। যেটি পৃথিবীর ৫ম বৃহত্তম চার্চ। সামনে থেকে যেতে যেতে কয়েকবার দেখেছি। চলাপথে ছবিও তুলেছি। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করা হয়নি। এটি ৮৯ মিটার উঁচু এবং ১৬৭ মিটার দীর্ঘ জায়গা জুড়ে অবস্থিত। ১৯০২ সালে রাজা লিওপোল্ড চার্চটি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯০৫ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। বেলজিয়ামের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে ১৯৭১ সালে চার্চটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। আফসোস রয়ে গেছে রয়েল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস দেখতে না পারার। ‘দ্য মিউজিয়াম অব এনশিয়েন্ট আর্ট’ নির্মাণ করেছিলেন নেপোলিয়ন। আরেকটি জাদুঘর হচ্ছে ‘মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট’। ১৯৮৪ সালে এই জাদুঘরটি যোগ করা হয় পুরোনো জাদুঘরটির সাথে। নতুন জাদুঘরটি আটতলা বিশিষ্ট। এই দুই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ৬০০ বছরের পুরোনো চিত্রকলা এবং ভাস্কর্য। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে থাকার পরেও শিক্ষণীয় এ জায়গাগুলো দেখা হয়নি সফরসঙ্গীদের অনাগ্রহের কারণে। কোন শহরে যাওয়ার পরেও সবসময়ই আমাকে সেই শহরের জাদুঘর দেখা থাকে আমার আগ্রহের শীর্ষে। এ যাত্রায় এটা সম্ভব হলো না।

লেখক: আসাদুজ্জামান সম্রাট, নগর সম্পাদক-দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও সম্পাদক-পার্লামেন্ট জার্নাল

সর্বাধিক পঠিত