প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সন্তানের জিম্মা (Custody) ও অভিভাবকত্ব (Guardianship) : আইনি পর্যালোচনা

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির : সম্প্রতি বিভিন্ন জরীপে প্রকাশিত, বাংলাদেশে বিশেষত শহরাঞ্চলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মনোমালিন্য ও বিবাহ-বিচ্ছেদ আশংকাজনকহারে ক্রমবর্ধমান। পারস্পরিক ভালোবাসা, আস্থা-বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় এজন্য দায়ী। পিতা মাতার খারাপ সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ সন্তানদের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাদের সুষম বিকাশ ব্যাহত করে। তাছাড়া সন্তানের জিম্মা নিয়ে নতুন দ্বন্দ্ব ও বৈরিতার সূত্রপাত হয় যা শেষ পর্যন্ত আদালতের বারান্দায় গড়ায়। এমনকি আদালতের বারান্দায় পক্ষদ্বয়ের মাঝে বলপ্রয়োগের দৃষ্টান্তও চোখে পড়ে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব কে পাবেন, এ সংক্রান্তে আইনি বিধান ও উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলঃ

সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কিত আইনঃ
আমাদের দেশে সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ সংক্রান্তে মৌলিক (Substantive) ও পদ্ধতিগত (Procedural) আইনসমূহ হল- মুসলিম আইন (Traditional Muslim Law, অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন (The Guardians and Wards Act), ১৮৯০ এবং পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (The Family Courts Ordinance), ১৯৮৫। সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্বের মামলা যদিও পারিবারিক আদালত (সহকারী জজ) কর্তৃক বিচার্য, বিচারপ্রার্থীরা কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২(২)(খ)(অ) অনুযায়ী রিট মামলা (Writ of Habeas Corpus) দায়ের করেও প্রতিকার লাভ করেন।

জিম্মা ও অভিভাবকত্ব নিয়ে সাধারণ মুসলিম আইনের বিধানসমূহ ডি,এফ, মোল্ল্যা সংকলিত “Principles of Mahomedan Law” বইয়ের ১৮শ অধ্যায়ে (ধারাঃ ৩৪৮-৩৬৮) বিধৃত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, মুসলিম আইনের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ তথা হেদায়া, ফতোয়া-ই-আলমগিরি, সিরাজী প্রভৃতির আলোকে ডি,এফ, মোল্ল্যা উক্ত বইটি সংকলন করেন। সন্তানের জিম্মা সংক্রান্তে উক্ত বইয়ের কতিপয় উল্লেখযোগ্য বিধান নিম্নরূপ।

Section-352: Right of mother to custody of infant children
The mother is entitled to the custody (hizanat) of her male child until he has completed the age of seven years and of her female child until she has attained puberty. The right continues though she is divorced by the father of the child, unless she marries a second husband in which case the custody belongs to the father.

Section-354: Females when disqualified for custody
Female, including the mother, who is otherwise entitled to the custody of a child, loses the right of custody-
(1) if she marries a person not related to the child within the prohibited degrees, e.g. a stranger, but the right revives on the dissolution of marriage by death or divorce; or,
(2) if she goes and resides, during the subsistence of the marriage, at a distance from the father’s place of residence; or,
(3) if she is leading an immoral life, as where she is a prostitute; or

(4) if she neglects to take proper care of the child.

Section-357: Right of father and paternal male relations to custody of boy over seven years and of girl who has attained puberty.
The father is entitled to the custody of a boy over seven years of age and of an unmarried girl who has attained puberty……..

উক্ত ধারাসমূহের আলোকে সাধারণ মুসলিম আইনের প্রতিষ্ঠিত বিধান হল, ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত জিম্মার অধিকার মায়ের, সাত বছর পূর্ণ হলে বাবার। আর মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে সাবালকত্ব (Puberty) পর্যন্ত জিম্মার অধিকার মায়ের, আর সাবালকত্বের পর বাবার। তবে, মাতা তার অধিকার হারাবেন যদি তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করেন যিনি সন্তানের সাথে গাইরে মাহরাম (অর্থাৎ যার সাথে বিয়ে করা নিষিদ্ধ নয়); অথবা যদি মাতা বিবাহ কার্যকর থাকাবস্থায় পিতার আবাসস্থল ছেড়ে দূরে অন্যত্র চলে যান বা বসবাস করেন; অথবা যদি তিনি অনৈতিক জীবন যাপন করেন; অথবা যদি তিনি সন্তানের যথাযথ যত্ন নেয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করেন।

পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর ধারা ২৪ অনুযায়ী “The Guardians and Wards Act, 1890” এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে পারিবারিক আদালত (সহকারী জজ) জেলা আদালত (District Court) হিসেবে বিবেচিত হবে। The Guardians and Wards Act, 1890, এর ধারা ১৭ অনুযায়ী, সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্বের অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন;

১. অপ্রাপ্তবয়স্ক (minor) সন্তানের প্রতি প্রযোজ্য আইনের বিধান (মুসলিম হলে মুসলিম আইন, হিন্দু হলে হিন্দু আইন, খ্রিস্টান হলে খ্রিস্টান আইন)।
২. সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপটে যা উক্ত সন্তানের জন্য কল্যাণকর হবে। কল্যাণ (Welfare) নির্ধারণের জন্য আদালত উক্ত সন্তানের বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র, সক্ষমতা, আত্মীয়তার সম্পর্কের নৈকট্য ও মৃত পিতা বা মাতার ইচ্ছা এবং উক্ত সন্তানের জিম্মা ও সম্পত্তি সংক্রান্তে বিদ্যমান ও পূর্বেকার সম্পর্ক।

৩. উক্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বুদ্ধিদীপ্ত অগ্রাধিকারমূলক মতামত।

অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কল্যাণ নিশ্চিত করতে গিয়ে তার জিম্মার অধিকারী নির্ধারণে সাধারণ মুসলিম আইনের বিধান থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে কিনা, এ প্রশ্নে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা থাকলেও ১৯৬৫ সালে মোসাঃ জোহরা বেগম বনাম শেখ লতিফ আহমদ মুনাওয়ার, ১৭ ডিএলআর ১৩৪, মামলায় পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট বিচ্যুতির পক্ষে অবস্থান নেন এবং সাত বছর বয়স পূর্ণ হওয়া সত্বেও খালিদ লতিফ নামক পুত্র সন্তানের জিম্মা তার পিতা শেখ লতিফ আহমদ মুনাওয়ারের পরিবর্তে তার মাতা মোসাঃ জোহরা বেগমের অনুকূলে প্রদান করেন। অত্র মামলায় আদালত বলেন,
“On this view, it would be permissible for Courts to differ from the Rule of Hizanat stated in the Text Books on Muslim Law for there is no Quranic or Traditional Text on the point. Courts which have taken this place of Qazis can, therefore, come to their own conclusions by process of Ijtihad which, according to Imam Al-Shafei, is included in the doctrine of Qiyas. It has been mentioned earlier that the rule propounded in different Text Books on the subject of Hizanat is not uniform. It would, therefore, be permissible to depart from the rule stated therein if, on the facts of a given case, its application is against the welfare of the minor.”

অত্র মামলার সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তীতে অনেক মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কল্যাণ নিশ্চিত করার স্বার্থে সাধারণ মুসলিম আইনের বিধান থেকে সরে আসা হয়। নিম্নে এরকম উল্লেখযোগ্য মামলাগুলো তুলে ধরা হল।

১. মোঃ আবু বকর সিদ্দিক বনাম এসএমএ বকর এবং অন্যান্য, ৩৮ ডিএলআর এডি ১০৬
মোঃ আবু বকর, একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (Superintending Engineer) ১০ জুন ১৯৭৩ ইং তারিখে একজন এমবিবিএস ডাক্তারকে বিয়ে করেন। ২২ মে ১৯৭৬ ইং তারিখে তাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। ১৬ জুলাই ১৯৭৭ ইং তারিখে ডাক্তার তার সন্তানকে স্বামীর কাছে রেখে চাকরির উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান এবং ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন। দুই মাস পর তিনি সন্তানসহ আবারো সৌদি আরব যান। স্বামীও সেখানে গিয়ে স্ত্রী সন্তানের সাথে থাকেন এবং ১৯৮১ সালের এপ্রিলে তাদেরকে সেখানে রেখে দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে স্ত্রী কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৮৪ সালে স্ত্রী সন্তানসহ দেশে আসেন এবং সন্তানকে ভাই বোনের কাছে রেখে পুনরায় সৌদি আরব চলে যান। তখন স্বামী আবু বকর তার ৮ বছর বয়সী পুত্র সন্তানের জিম্মার জন্য “The Guardians and Wards Act, 1890” এর ২৫ ধারায় মামলা করলে আদালত তা শুনানিঅন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনায় খারিজ করে দেন। ফলশ্রুতিতে স্বামী আবু বকর হাইকোর্ট বিভাগে আপীল দায়ের করলে সেটিও খারিজ হয়। তখন তিনি মাননীয় আপীল বিভাগে লিভ টুআপীল দায়ের করেন। মাননীয় আপীল বিভাগ মোসাঃ জোহরা বেগম বনাম শেখ লতিফ আহমদ মুনাওয়ার, ১৭ ডিএলআর ১৩৪, মামলার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপটে সন্তানের কল্যাণ নিশ্চিত করতে গিয়ে ৮ বছর বয়সী পুত্র সন্তানের জিম্মা মাতার অনুকূলে প্রদান করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, পুত্র সন্তানটি ‘Hirschprung’ নামক জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল এবং ডাক্তার মা সন্তানের জন্য সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন। আদালত সন্তানের কল্যাণ বিবেচনার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করেন।

“…The mother being a doctor, she is better suited to look after the minor than the father in view of the peculiar illness of the minor and therefore the present position regarding custody of the minor should not be disturbed.”

২. মিসেস শ্যারন লাইলি বেগম বনাম আবদুল জলিল এবং অন্যান্য, ৫০ ডিএলআর (এডি) ৫৫
সন্তানের জিম্মার জন্য সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করা যাবে কিনা, এ প্রশ্নটি এই মামলায় আলোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশী পিতা ও ব্রিটিশ মাতার সন্তান শ্যারন লাইলি বেগমের সাথে ইংল্যান্ডে ১২ জুলাই ১৯৮৪ ইং তারিখে বাংলাদেশী আবদুল জলিলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্ত্রীর মাধ্যমে আবদুল জলিল ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করে। তাদের ঘরে চার সন্তানের জন্ম হয়। সবাই ব্রিটিশ নাগরিক । ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে আবদুল জলিল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দেশে আসে এবং কয়েক মাস পর তাদের সবাইকে ঢাকায় একটি ভাড়া বাসায় রেখে ইংল্যান্ডে চলে যায়। শ্যারন লাইলি সন্তানদের নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে চাইলেও আবদুল জলিল তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ০৮ মে ১৯৯৫ ইং তারিখে আবদুল জলিল ও তার আত্মীয়রা কৌশলে সব সন্তানদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিয়ে যায় এবং ১০ মে ১৯৯৫ ইং তারিখে শ্যারন লাইলি স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত তালাকের নোটিস পান। সন্তানের জিম্মা লাভের চেষ্টা করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। তখন শ্যারন লাইলি ইংল্যান্ডে High Court of Justice, Family Division এ মামলা করেন এবং তার অনুকূলে সন্তানদের জিম্মার আদেশ লাভ করেন। এতেও কোন কার্যকর ফল না পেয়ে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২(২)(খ)(অ) অনুযায়ী চার সন্তানের জন্য চারটি রিট মামলা দায়ের করেন। হাইকোর্ট বিভাগ তিনটি রিটে তিন সন্তানের জিম্মা শ্যারন লাইলির অনুকূলে এবং একটি রিটে এক সন্তানের জিম্মা আবদুল জলিলের অনুকূলে প্রদান করেন। উভয়ে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করেন। আপীল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখেন। সন্তানের জিম্মার জন্য সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করা যাবে কিনা, এ প্রশ্নে আপীল বিভাগ বলেন,

“… normally the minor children should be with their mother as long as she does not earn any disqualification for such custody and if there is a breach of this normal Order brought about by an unilateral Act of the father or anybody on his behalf, the mother has the right to move the High Court Division under Article 102 of the Constitution for immediate custody of the children which may be ordered in the interest and for the welfare of the said children.”

৩. ফারহানা আজাদ বনাম সমুদ্র এজাজুল হক এবং অন্যান্য, ৬০ ডিএলআর ১২
স্কলাস্টিকা স্কুল, ঢাকার শিক্ষিকা ফারহানা আজাদের সাথে ১৫ জানুয়ারি ১৯৯৩ ইং তারিখে কম্পিউটার বিজ্ঞানী সমুদ্র এজাজুল হকের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যা সাগরিকা নওমি (৩০ আগস্ট ২০০০) ও একটি পুত্র মেহরাব ফারাজ (১১ ডিসেম্বর ২০০২) জন্মলাভ করে। ২০০৬ সালে সমুদ্র এজাজুল হক তার স্ত্রী ফারহানাকে তালাক দেয় এবং সমুদ্রের বাবা মা কৌশলে খালি ষ্ট্যাম্প কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে সাগরিকা ও মেহরাবকে তাদের জিম্মায় রেখে দেন। পরে সমুদ্র ২০০৭ সালে আরেকটি বিয়ে করেন এবং নতুন স্ত্রীসহ সন্তানদের নিয়ে আমেরিকা যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এ প্রেক্ষাপটে ফারহানা আজাদ সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করেন। মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ উক্ত রিটে সন্তানদের জিম্মা মাতার অনুকূলে প্রদান করেন। উক্ত মামলায় সন্তানের জিম্মা সংক্রান্তে সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়েরের গ্রহণীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে আদালত পূর্বোক্ত মিসেস শ্যারন লাইলি বেগম বনাম আবদুল জলিল এবং অন্যান্য, ৫০ ডিএলআর এডি ৫৫, মামলার সিদ্ধান্তের আলোকে গ্রহণীয়তার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। উক্ত মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ আরো বলেন,

“Before adjudication of the custody of the minors by a competent court if they remain in the custody of anybody other than the mother, the custody will be without lawful authority.”

“Nowadays, working women having children not only perform duties at their place of work but also look after their children. In the twenty first century, it cannot be said that a working woman divorced by her husband is unworthy of the custody of her minor children.”

৪. নির্মল চন্দ্র সাহা বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য, ৩০ বিএলডি ৫৮৪
২০০৯ সালে নির্মল চন্দ্র সাহা নামক এক ব্যক্তি তার মেয়ে কনামিকা সাহাকে অপহরণের অভিযোগে প্রবীর দেব নাথ ও আরো ৩ জনকে আসামী করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৭ এর অধীনে মামলা করেন। পরবর্তীতে তিনি মেয়ের জিম্মার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, লক্ষ্মীপুর বরাবর একটি আবেদন করেন। কিন্তু অত্র আইনের ধারা ২২ এ প্রদত্ত জবানবন্দীতে মেয়ে কনামিকা সাহা দাবী করে যে, সে প্রাপ্তবয়স্ক, স্বেচ্ছায় পিত্রালয় ছেড়ে গিয়ে তার পছন্দের পাত্র আসামী প্রবীর দেব নাথকে বিয়ে করেছে এবং সে তার স্বামী বা শ্বাশুড়ির জিম্মায় যেতে ইচ্ছুক। ট্রাইব্যুনাল জিম্মার আবেদন না-মঞ্জুর করলে, পিতা নির্মল চন্দ্র সাহা হাইকোর্ট বিভাগে আপীল দায়ের করেন। উল্লেখ্য এসএসসি পরীক্ষার প্রবেশপত্র মতে কনামিকার বয়স সাড়ে ১৬ বছর এবং বাড়িতে তার একটি অবিবাহিত বড় বোন ছিল। সংশ্লিষ্ট সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মেয়ে কনামিকা সাহার কল্যাণ (Welfare) নিশ্চিত করতে গিয়ে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ তার জিম্মা পিতার অনুকূলে প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন। এক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ বলেন,

“However, in the facts of the instant case, with all due respect to the decisions of our Appellate Division, we would not wish to force upon the girl custody in favour of her parents in view of the fact that we would thereby be sending her to a place where she had been in the past assaulted and verbally abused and where she may again be physically and verbally assaulted by the victim’s elder sister…. We believe that her physical integrity as well as her educational opportunity must be ensured.”

“In case of a married Hindu girl, the natural guardian is the husband.”

৫. বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি বনাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য, ২৮ বিএলডি ৫৮০
পুলিশের একজন ডিআইজির স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের একসাথে সাত সন্তানের জন্ম দেয়া নিয়ে পত্র পত্রিকায় খবর ছাপানো হয়। অভিযোগ ছিল যে, ডিআইজির স্ত্রী বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের সংগ্রহ করে বিদেশে পাচার করতেন। পূর্বোক্ত সাত বাচ্চাদের পাচার করা হতে পারে, এ আশংকায় বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিজেএমএএস) সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২(২)(খ)(অ) অনুযায়ী রিট মামলা (Writ of Habeas Corpus) দায়ের করেন। উক্ত মামলায় ডিআইজি ও তার স্ত্রী বাংলাদেশে Parentage DNA Test করাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে দুই ধরণের পরীক্ষার (Sibling DNA Test, Y-Chromosome Analzsis) ফলাফলের ভিত্তিতে আদালত নিশ্চিত হন যে, সাত বাচ্চা একে অপরের ভাই বোন নয়, যা প্রমাণ করে যে, তারা ডিআইজির স্ত্রীর সন্তান নয়। তখন আদালত কল্যাণ (Welfare) নিশ্চিত করার জন্য সাত বাচ্চার জিম্মা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির অনুকূলে প্রদান করেন। অত্র মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বলেন,

“While deciding the custody of a child in the writ of habeas corpus, the Court is not bound to deliver a child into the custody of any claimant or of person. In exercise of its sound discretion, the Court should give the child in such custody as the welfare of the child requires.”

৬. অরুণ কর্মকার বনাম রাষ্ট্র এবং অন্য, ২২ বিএলডি (এডি) ৭৭
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ধারা ৪৯১ অনুসারে সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করার রক্ষণীয়তা সম্পর্কে অত্র মামলায় আলোচনা করা হয়েছে।
অরুণ কর্মকার ১৪ আগস্ট ২০০০ ইং তারিখে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থানায় তার মেয়ে মমতা কর্মকারকে অপহরণের অভিযোগে আসামী ইকবাল হোসেন এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আগাম জামিন প্রাপ্ত হয়ে আসামীগণ ভিকটিমসহ সাতক্ষীরা দায়রা জজের আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত ছয়জন আসামীকে জামিন মঞ্জুর, তিনজন আসামীকে জেল হাজতে এবং ভিকটিম মমতা কর্মকারকে নিরাপদ হেফাজতে (Safe Custody) প্রেরণ করেন। একইসাথে আদালত ভিকটিমের বয়স নির্ধারণের জন্য তার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র তলব করেন এবং জেলার সিভিল সার্জনকে পরীক্ষা নিরীক্ষাপূর্বক প্রতিবেদন দিতে বলেন। অরুণ কর্মকার তার মেয়ের জিম্মার জন্য আবেদন করলে দায়রা জজ আদালত তা ও খারিজ করে দেন। তখন অরুণ কর্মকার হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ধারা ৪৯১ অনুসারে মামলা করে দাবী করেন যে, তার মেয়েকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগ অত্র মামলা খারিজ করে সিদ্ধান্ত দেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ধারা ৪৯১ অনুসারে মামলা আইনত রক্ষণীয় নয়। তখন অরুণ কর্মকার ঐ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করলে, সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ তা মঞ্জুর করেন এবং নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।

“… an application under section 491 of the Code of Criminal Procedure is maintainable for custody of a minor to see that the minor is not held in custody illegally and/or in on improper manner.”

বাংলাদেশের আদালতসমূহে বর্তমানে সন্তানের জিম্মার অধিকার নির্ধারণে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হল তার কল্যাণ (Welfare)। সন্তানের জিম্মা সংক্রান্তে বিরোধের ক্ষেত্রে The Guardians and Wards Act, 1890 এর অধীনে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে জরুরি ও তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২(২)(খ)(অ) অনুযায়ী রিট মামলা (Writ of Habeas Corpus) দায়ের করা যায়। তাছাড়া, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ধারা ৪৯১ অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়ের করেও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জিম্মা লাভ করা যায়।

লেখক:

মোহাম্মদ শিশির মনির
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত