প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দুধকলা খাইয়ে পোষা হয়েছে, সুতরাং আর দেরি নয় উগ্র সাম্প্রদায়িক দানবদের এখনই আইনের আওতায় চাই!

দীপক চৌধুরী: এখন যতো রকম মায়াকান্নাই হোক না কেনো এতে কান দেওয়া ঠিক হবে না। অবশ্যই সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরো কঠিন ও ইস্পাতের মতো ধারালো কৌশলী হতে হবে। প্রমাণ হয়েছে যে, রাজধানীর মতিঝিল-দিলকুশায় ২০১৩ সালের ৫ই মে’র ঘটনার পর সরকারের গা-ছেড়ে দেওয়া অবস্থায় ফিরে যাওয়া বা ঢিলেমি দেওয়া ঠিক হয়নি। কী রকম ভয়ংকর কাণ্ড ঘটিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের চক্রান্ত। গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ। সেইদিন বিএনপি আল্টিমেটাম দিয়েছিল। এরপর পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী দিয়ে শাপলাচত্বর থেকে হেফাজতকে তুলে দিলেও কাজটির ঢিলেমি দেওয়ার অবিশ্বাস্য পরিণতি আমরা দেখছি। দীর্ঘ আটটি বছরে ওরা শক্তি অর্জন করেছে। সেই দানবদের রুখে দিতে হবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ওদের জন্য নয়।

যাঁর আঙুলের নির্দেশে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ আমরা পেয়েছি, যাঁর ডাকে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, সেই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে দেওয়ার হুঙ্কার দেয় হেফাজত। ওদের সাহস কত? কত বড় দুঃসাহস! অপশক্তিগুলোর ষড়যন্ত্র আমাদের শিক্ষা দিয়েছে। ধীরে ধীরে হেফাজত ইসলামের সহিংসতা, ত্রাস, তাণ্ডব, জ্বালাও-পোড়াওসহ নানা অপকর্ম দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হচ্ছে। এদেশের ধর্মপ্রাণ ও ধর্মভীরু মানুষকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা জানি আমরা। কোমলমতির মাদ্রাসা ছাত্রদের কীভাবে ব্যবহার করেছে ওরা– এটা ভাবতেই গা শিহরণ দিয়ে ওঠে। নিজেদের নেতা কর্মীদের নিয়ে সারা দেশে ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’ নামক একটি সংগঠন তৈরি করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগঠনটি সারা দেশে ওয়াজ মাহফিল নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি পুলিশের। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম তাঁর কার্যালয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এ কথা জানান। সাংবাদিকদের তিনি আরো জানান, ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে উগ্রবাদ ছড়াতে সংগঠন তৈরি করেছে হেফাজত।

এটা বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে, ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে সারাদেশে উগ্রবাদ ছড়াতে সংগঠন তৈরি করেছে হেফাজতে ইসলাম। ওয়াজ মাহফিল নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজিন’ নামক একটি সংগঠনও তৈরি করে হেফাজত। উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া। নিজেদের নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়া সিন্ডিকেট সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে তারা উগ্রবাদী চিন্তাধারা, বক্তব্য প্রচার ও বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করছে। তারা পবিত্রকাজে ব্যবহার করার জন্য মসজিদের নির্ধারিত মাইক অন্যায়কাজে ব্যবহার করেছে।

পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম বলেন, তা ছাড়া মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের ব্যবহার করে বিভিন্ন হেফাজত নেতা বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। মাদ্রাসা দখলের মতো অপকর্ম ও অনেকের নারী বিলাসের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। আমরা জানি, সম্পত্তি নাশকতার বিরুদ্ধে হওয়া ১২টি মামলা এবং ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনায় হওয়া ৫৩টিসহ মোট ৬৫টি মামলার তদন্ত করছে ডিবি। সুতরাং এখন আর ছাড় নয়।

নানা ত্রাস-তাণ্ডব অপকর্ম ও জ্বালাও- পোড়াওয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত হেফাজতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ১৪ জন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোরআন হাদিস বোঝেন, জানেন এমন তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনটি দল গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে নাশকতার মূল উদ্দেশ্য কী, কারা করছে, কেন করছে, তা জানার চেষ্টা করছেন তারা। মাদ্রাসার ছাত্রদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এমন ’অপচেষ্টা’ করছে বা নাশকতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এদের আচরণ ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হেফাজত নেতারা কী চান, এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুব আলম বলেন, ‘তারা আসলে চান সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তান মডেল বানানোর পরিকল্পনা আছে।’

গ্রেপ্তারও অব্যাহত আছে- এটা বললেই শুধু হবে না। আমাদের তৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িতরা সম্প্রতি যে নাশকতা করেছে সেগুলোর ভিডিও ফুটেজ, অডিও কথোপকথন এবং জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্যগুলো এসেছে সেগুলোর মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণের চেষ্টা চলছে। হেফাজত নেতা মামুনুল হকের গোপন বিয়ের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম। তিনি বলেন, প্রথম বিয়ে শরিয়ত বা আইনসম্মতভাবে হয়েছে। পরবর্তী যে দুটি বিয়ের কথা তিনি স্বীকার করেছেন, এ দুটি চুক্তিভিত্তিক বিয়ে। সেখানে কোনো কাবিননামা নেই। পরের বিয়ের চুক্তিগুলো হচ্ছে- স্ত্রী থাকবে কিন্তু স্ত্রীর কোনো মর্যাদা পাবে না। স্ত্রী মেলামেশা করতে পারবে কিন্তু সম্পর্কের কোনো অধিকার পাবে না। একি সঙ্গে কোনো দাবিদাওয়া বা সন্তান ধারণ করতেও পারবে না। এ ধরনের চুক্তি প্রচলিত আইনের পরিপন্থী বলে জানান মাহবুবুল আলম।

আরো ভয়ঙ্কর তথ্য জানিয়ে মাহবুব আলম বলেন, ‘লন্ডন থেকে ওলামা দলের এক নেতা হেফাজত নেতাদের পক্ষে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা তৈরি করছেন। হেফাজতের নেতাদের এখানে নাকি হিন্দু লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। মামুনুল হককে নাকি মারধর করা হচ্ছে- ইত্যাদি বিভিন্ন অপপ্রচার হচ্ছে। এই মিথ্যা অপপ্রচার তাদের কৌশলেরই অংশ। দেশেও জামায়াত শিবিরের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এটা করছেন যারা ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।’ কী রকম ভয়ঙ্কর অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এদশের গণতন্ত্রের ওপর, আইনের শাসনের ওপর এই আঘাত করছে হেফাজত। তারা জানে, এদেশে গুজব ছড়ানো একটি ভয়ঙ্কর অস্ত্র। দেশ-বিদেশে যখন বঙ্গবন্ধুকন্যার সুনাম ছড়াচ্ছে, বিশে^র বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও নেতারা যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখনই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়ানো হয়েছে। দেশ ধ্বংস করার গুজব।

এটা এখন প্রমাণিত যে, এই অপশক্তিগুলো দেশবিরোধী অপতৎপরতায় লিপ্ত। তারা দেশের বাইরে অবস্থান করেও বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ওরা কয়েকজন বাংলাদেশের নাগরিক হলেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও অস্ট্রিয়া, আবুধাবি, দুবাই, সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস করে আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। অবিলম্বে তাদের আইনের আওতায় এনে চক্রান্তের মুলোৎপাটন করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু বিদেশে নয়, এদেশের পাড়াগাঁয়ে থাকা হেফাজতের কর্মী ও সাম্প্রদায়িক ‘টেটনা গুলোকে’ আইনের আওতায় আনার এখনই সময়। কোনোভাবেই ঢিলেমি নয়, সাবধান।

আওয়ামী লীগেরও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব রয়েছে। যারা হেফাজতকে নিয়ে বিভিন্ন শহর-উপশহর, জেলা-উপজেলায় বৈঠক সমাবেশ করেছে তাদের এখন আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ এবং র‌্যাবকেও নিজ উদ্যোগে দায়িত্ব নিতে হবে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘হেফাজতের গ্রেপ্তার হওয়া নেতারা মুখ খুলতে শুরু করেছে। আপনারা দেখেছেন ভারতের ইকনোমিক টাইমস ও বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে, ২৬ থেকে ২৮ মার্চ সারাদেশে হেফাজতের ব্যানারে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, সেখানে বিএনপি-জামাত সক্রিয় অংশ নিয়েছে, অর্থ যোগান দিয়েছে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা সাহায্য করেছে।’ দেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, তাণ্ডব, ত্রাসসৃষ্টি ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। হেফাজত ইসলামের নেতাদের গ্রেপ্তার করা ও রিমান্ডে নেওয়ার পর এখন বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুকে পুরনো ‘ভিডিও লাইভ’ প্রচার করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেনো তাহলে? ওরা একের পর এক মিথ্যাচার করে চলেছে।

বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে পুরনো ভিডিও লাইভ প্রচার করা হচ্ছে। পুরনো ভিডিও প্রচার করে গুজব সৃষ্টি করা হচ্ছে। ভুয়া আইডির মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকেই। গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসবের ব্যাপারে কঠিন দৃষ্টি দিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে যে সম্মৃদ্ধি ও স্বাতন্ত্র নিয়ে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে তাকে অর্থবহ ও টেকসই করতেও এসব অপশক্তির বিষদাঁত উপড়ে ফেলা দরকার। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থেই এদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সবচেয়ে বড় শক্ত খুঁটি। মানুষের ভরসাস্থল। প্রমাণ হচ্ছে, অপশক্তিগুলো নানারকম চক্রান্ত চালাবেই। সুতরাং এদের আইনের আওতায় আনতে হবে, বাড়তে দেওয়া যাবে না। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মাথায় থাকতে হবে, মামলা অনুপাতে হেফাজতি তাণ্ডবে জড়িত গ্রেপ্তারের সংখ্যা অনেক কম। দেশ স্বাভাবিক গতিতে চলার জন্যই গ্রেপ্তার জরুরি।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত