প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কলোসিয়াম: নৃশংসতা না গৌরবের প্রতীক!

আসাদুজ্জামান সম্রাট: ডিসেম্বর ২০১৯। প্রস্তুতিটা ছিল ল্যাটিন আমেরিকার দেশ চিলির সান্টিয়াগো যাবো। ই-ভিসাসহ সকল প্রস্তুতি সম্পন্নও ছিল। ২৫তম বিশ্বজলবায়ু সম্মেলন শেষে বিলাসবহুল ক্রুজে আটলান্টিকে যাবো। জনমানববসতিহীন আটলান্টিকের খোলাপ্রান্তরে পেঙ্গুইন ও সীলের সঙ্গে এক রাত কাটাবো। কিন্তু চিলির রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বজলবায়ু সম্মেলন আকস্মিকভাবে স্থানান্তরিত হলো ইউরোপের দেশ স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে। সকল প্রস্তুতি শেষে মন খারাপ হলেও পূর্বের ইউরোপ সফরের অসমাপ্ত অংশগুলোও সমাপ্ত করার আরেকটি সুযোগও এলো বটে। এমনই একটি অসমাপ্ত অংশ ছিল ইতালির রাজধানী রোমের কলোসিয়ামসহ আরো কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। বরাবরে মতো আমি ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু। প্রাণ, প্রকৃতি, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য নিয়েও কাজ করেছি দু’যুগের বেশি সময় ধরে।

২০০০ সালে এক সহকর্মীকে নিয়ে ঢাকার বায়তুল মোকাররমের ইলেকট্রনিক্সের মার্কেট থেকে একটি সিডি প্লেয়ার কিনেছিলাম। সঙ্গে কয়েকটি মিউজিক ভিডিওর সিডি ও বেশ কয়েকটি সিনেমা ছিল। এর মধ্যে ২ পার্টের মুভি ছিল ‘গ্লাডিয়েটর’। কতোবার যে সিনেমাটা দেখেছি তা গুনে বলা যাবেনা। ওই বছরই হলিউডে মুক্তি পায় ‘গ্লাডিয়েটর’। চরম নৃশংসতার এই সিনেমা দেখে মনে হয়েছিল, সত্যিই এতো নৃশংস ছিল রোমান সম্রাটরা? না-কি সিনেমায় একটু বেশিই দেখানো হচ্ছে। হলিউডের অস্কারজয়ী অভিনেতা রাসেল ক্রো’র অভিনয় আমার সবসময়ই বিশেষ কিছু মনে হয়। গ্লাডিয়েটারের আগে তার অভিনীত এল এ কনফিডেন্সিয়াল সিনেমা দেখেছিলাম। কিন্তু তা গ্লাডিয়েটরের মতো মনে দাগ কাটেনি। পরবর্তীতে তার আমেরিকান গ্যাংস্টার, দ্যা ফার সাইড অব দি ওয়ার্ল্ড, রবিনহুড, ম্যান অব স্টিল, নূহ সিনেমা দেখে মনে হয়েছে চরিত্রগুলো রাসেল ক্রো’র জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল।

গ্লাডিয়েটর সিনেমায় আমার জন্য আকর্ষণীয় ছিল এর মঞ্চটি। হাজার হাজার দর্শক গ্লাডিয়েটরদের মরণপণ যুদ্ধ উপভোগ করছে। একজন গ্লাডিয়েটর কুপোকাত হচ্ছে আর উল্লাসে ফেটে পড়ছে দর্শকরা। গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধের মাঝে ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘ, সিংহের আক্রমণ আরো উপভোগ্য করে তোলে এ যুদ্ধ। কতোটা নৃশংস ও নিষ্ঠুর ছিল সে সময়ের মানুষের মন ভাবতেই শিউরে উঠি। এর আগে বিভিন্ন লেখালেখিতে পরিচিত ছিলাম গ্লাডিয়েটরদের সেই যুদ্ধ ক্ষেত্র বা তৎকালীন এম্পিথিয়েটার ‘কলোসিয়াম’ সম্পর্কে। দু’ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মিত সেই কলোসিয়াম এখনও টিকে আছে স্বমহিমায়। ফলে মনের মধ্যে সব সময়ই একটি আকর্ষণ কাজ করতো কলোসিয়াম দেখার। সেই যুদ্ধক্ষেত্র দেখার যেখানে লাখ লাখ গ্লাডিয়েটর আর হিংস্রপ্রাণীর রক্তে ভিজে আছে।

ইতিহাস অবশ্য বলে, কলোসিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৭ হাজার প্রাণী ও গ্লাডিয়েটরের প্রাণ গিয়েছিল। সেখানে গ্লাডিয়েটর সিনেমায় দেখানো ঘটনা ছিল খুবই নগণ্য। তারপরেও কতোটা হিংস্র ছিল ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বরের কুয়াশাভেজা এক সকালে পৌছে গিয়েছিলাম রোমের বিখ্যাত কলোসিয়ামে। এখানে মেট্রোতে কলোসিয়াম একটি স্টেশন রয়েছে। ইতালীয়ানরা কলোসিয়ামকে বলে ‘কলোসো’, ভেটিক্যানকে বলে ‘ভেটিক্যানো’। কলোসো স্টেশনে নেমে উপরে উঠতেই শত শত মানুষের ভীর। রাস্তা পাড় হতেই চোখের সামনে সেই কলোসিয়াম। অন্যরকম এক অনুভুতি। দু’হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মিত এই কলোসিয়াম দু’দুটি বড়ো ভুমিকম্প মোকাবিলা করে ্এখনও এক তৃতীয়াংশ টিকে রয়েছে। সাক্ষ্য দিচ্ছে, রোমান সম্রাজ্যের নৃশংসতার ইতিহাস। অবশ্য রোমানরা এটিকে তাদের ক্ষমতা আর গৌরবের প্রতীক মনে করে।

নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে ঢুকে গেলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। কলোসিয়ামের এক একটি কক্ষ ও সিড়িতে দাড়িয়ে গাইড মাইক্রোফনে বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আমরা তাতে রাখা গাইড আর কানে লাগানো হেডফোন দিয়ে শুনি আর মন্ত্রমুগ্ধের মধ্যে চলে যাই দুহাজার বছর আগের স্মৃতিতে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত বাঘ, সিংহ, নেকড়ে আর গ্লাডিয়েটরদের মুখ। এর আগে রোমের কলোসিয়ামের কথা শুনেছি, বিভিন্ন লেখনিতে পড়েছি। চোখের সামনে সেই কলোসিয়াম দেখা আর বর্ণনা শুনে কখনো মুগ্ধ হচ্ছি, কখনো আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি। গাইড আমাদের নিয়ে প্রথমেই ওপরের দিকে ওঠা শুরু করলেন এক একটি সিঁড়ি ভেঙ্গে। পাথরের সিঁড়ি। একটু খাড়া। ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম। নতুন আবেশ। নতুন পরিবেশ। দুই চোখ মেলে দেখতে থাকি চারপাশ। উপবৃত্তাকার ছাদবিহীন বিশাল একটি খোলা মঞ্চ এই কলোসিয়াম। ছয় একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এটি। উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৮৮ মিটার এবং চওড়ায় ১৫৬ মিটার। প্রত্যেক তলায় ৮০টি করে তিনটি লেভেলে মোট ২৪০টি আর্চ আছে। ৮৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪ মিটার প্রস্থের মেঝে আচ্ছাদিত কাঠ ও বালি দিয়ে। গ্লাডিয়েটরদের পশ্চাদপসরণে বাধার সৃষ্টি করত কলোসিয়ামের উপবৃত্তাকার উঁচু দেয়াল। প্রায় এক লাখ কিউবিক মিটারের বেশি ট্র্যাভারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণে। ৫০ হাজার লোক একসঙ্গে বসে এখানে গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধ দেখতে পারত। আসন-ব্যবস্থাটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম লেভেলে তৎকালীন সিনেটররা বসতেন। সম্রাটের নিজস্ব সুসজ্জিত আনন বা মর্বেলের তৈরি বক্সটিও এই লেভেলে অবস্থিত ছিল। দ্বিতীয় লেভেলটি রোমান অভিজাত, যারা সিনেটের সদস্য ছিলেন না, তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তৃতীয় লেভেলটিতে সাধারণ মানুষদের বসার ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় লেভেলটি আবার তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। নিচের দিককার অংশটিতে ধনী ব্যক্তিরা বসতেন, মাঝের অংশটি মধ্যবিত্তরা বসতেন এবং উপরের অংশে কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি কাঠামো ছিল, যেখানে দরিদ্রশ্রেণির মানুষ দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের সব নাগরিকের এই জায়গায় বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার ছিল।

ভূগর্ভস্থ হাইপোজিয়াম তৈরি করা হয় নির্মাণের পরের দুই বছরে। এতে দুইতলা বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ খাঁচা এবং সুড়ঙ্গের মিলন ঘটানো হয় যেখানে মরণখেলা শুরুর আগে ধরে আনা বন্যপশু এবং অসহায় গ্লাডিয়েটদের রাখা হতো। খাঁচাগুলোতে চলাচলের জন্য অসংখ্য গোপন সুড়ঙ্গ-পথ ছিল। এসব সুড়ঙ্গ ছিল বিশাল আকারের। হাতির মতো বিশালাকার বন্যপ্রাণীও এ সুড়ঙ্গ-পথে চলাচল করতে পারত। কলোসিয়ামের আরেকটি দিক হচ্ছে, দর্শকদের ঠান্ডা বাতাস সরবরাহ করার জন্য এর ‘ভেলারিয়াম’ নামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, যা ছিল দড়ির তৈরি ক্যানভাসের একটি আচ্ছাদন। এ আচ্ছাদনের মাঝখানে একটি ছিদ্র ছিল। আচ্ছাদনটি পুরো কলোসিয়ামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আবৃত করত এবং বাতাস ধরে রাখার জন্য এর মধ্যখানে ঢালু রাখা হতো। বাতাস সরবরাহ সচল রাখার জন্য বিশেষ প্লাটফর্মে দাঁড়ানো পাঙ্খা-পুলাররা এই দড়ি নিয়ন্ত্রণ করত।

কলোসিয়ামে অসংখ্য ভোমিটারিয়া বা প্যাসেজ ছিল, যা সারি সারি আসনের পাশ দিয়ে অবস্থিত ছিল। গ্রাউন্ড লেভেলে ৮০টি প্রবেশদ্বার ছিল। এর মধ্যে ৭৬টি ছিল সাধারণ দর্শকদের ব্যবহারের জন্য। তারা ভোমিটোরিয়াম দিয়ে নিজ আসনে পৌঁছাত। কলোসিয়াম বহু প্রাচীনকালে নির্মিত হলেও এর নির্মাণশৈলীতে রয়েছে অনন্য নিপুণতা। বর্তমান সময়ের প্রকৌশলীরা অনেক স্টেডিয়াম নির্মাণেও কলোসিয়ামের কাঠামো থেকে ধারণা নিয়ে থাকেন।

কলোসিয়াম পাথরের তৈরি। এটি মূলত শুরুতে তৈরি হয়েছিল একটি নাট্যশালা হিসেবে। ৭২ খ্রিস্টাব্দে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ফেরিয়াস বংশের সম্রাট ভেসপাসিয়ান এটি নির্মাণ করেন। ভেসপাসিয়ানের মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ শেষ করেন তার পুত্র টাইটাস। ধারণা করা হয়, ৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইহুদি বিদ্রোহের পর যুদ্ধবন্দি ইহুদি দাসদের দিয়ে এই কলোসিয়ামটি নির্মিত হয়েছে। ১০ বছর ধরে ৬০ হাজার ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে কলোসিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করেন টাইটাস। তিনি এটিকে অফিসিয়ালি ‘ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্পিথিয়েটারিয়াম (গ্যালারি)’ নাম দিয়ে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। একদম শুরুতে এটি খেলাধুলার জন্য এবং নাট্যশালার জন্য ব্যবহৃত হতো।

কলোসিয়ামে নিয়মিত হতো পশুর লড়াই আর এগুলোর করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একঘেয়েমি বোধ করেন সম্রাট টাইটাস। তাই পরিশেষে পশুর পরিবর্তে মানুষে-মানুষে লড়াইয়ের হিংস্র আর অমানবিক চিন্তা মাথায় আসে তার। এরপর থেকে শুরু হয় মানুষে-মানুষে, মানুষ-হিংস্র পশুতে জীবন-মরণের লড়াই আর মৃত্যুর করুণ ও বীভৎস কাহিনি। মল্লযুদ্ধ দিয়েই শুরু হয় গ্লাডিয়েটরদের খেলা এবং এই মল্লযুদ্ধের জন্য একজন আরেকজনকে কাঠের তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ‘গ্লাডিয়াস’ অর্থ খাটো তরবারি। এ তরবারি দিয়ে লড়াইকারীদের বলা হতো-গ্লাডিয়েটর। প্রথমদিকে যুদ্ধবন্দিদের দিয়েই লড়াই শুরু। এ লড়াই দুজনের মধ্যে চলত ততক্ষণ, যতক্ষণ-না একজনের মৃত্যু হতো। পরে প্রচলন হয় গ্লাডিয়েটরদের লড়াই। লড়াই চলাকালে কোনো এক গ্লাডিয়েটর আহত হয়ে পড়ে গেলে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো কলোসিয়াম। মৃত্যুভয়ে ভীত, ক্ষত-বিক্ষত গ্লাডিয়েটর রেওয়াজ অনুযায়ী হাত তুলে সম্রাটের কাছে করুণা প্রার্থনা করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। মঞ্জুর করা না-করা সম্পূর্ণ সম্রাটের মেজাজের ওপর নির্ভর করত। সম্রাট ক্ষমা করে থাম্বস আপ করলে সে যাত্রায় বেঁচে যেত পরাজিত গ্লাডিয়েটর, আর না কওে থাম্বস ডাউন করলে নিশ্চিত মৃত্যু। অনেক সময় রোমান মহিলারা নামকরা গ্লাডিয়েটরদের প্রেমে পড়ে গৃহত্যাগও করতেন।

রোম থেকে রোমানরা চলে গেছে অনেক বছর আগে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে আজও এই কলোসিয়াম। রোমান সাম্রাজ্যের সূতিকাগার ছিল এই রোম। নিরোর বাঁশি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির স্মৃতিবিজড়িত ইতালি আর এই রোম। ইতালির এই রোম নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা, রক্ত, আর্তনাদ ও জীবন সংশয়ের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলোসিয়াম। কলোসিয়ামের মূল স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কলোসিয়ামের মাটিতে মিশে আছে সেই সময়ের গ্লাডিয়েটরদের রক্ত। অজস্র বন্যপ্রাণীর করুণ মৃত্যু ও রক্ত। কলোসিয়ামের দেয়ালে কান পাতলে আজও বুঝি শোনা যায় সেই ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতার শব্দ! তারপরও কলোসিয়াম আজও পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট-স্পট। ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের স্বীকৃতি দেয় কলোসিয়ামকে। এটি পৃথিবীতে মনুষ্যসৃষ্ট আধুনিক সপ্তাশ্চর্যগুলোর একটি বলে নির্বাচিত হয় ২০০৭ সালে। কলোসিয়াম প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন, যা একই সঙ্গে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

ল্যাটিন শব্দ ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ মানে হচ্ছে ‘তরবারিওয়ালা মানব’ যার উৎপত্তি ‘গ্ল্যাডিয়াস’ বা ‘সোর্ড’ অর্থাৎ তরবারি থেকে। গ্ল্যাডিয়েটর হচ্ছেন এমন একজন অস্ত্রধারী যোদ্ধা যিনি অন্য কোনো গ্ল্যাডিয়েটরের সঙ্গে লড়াই করে সাধারণ মানুষ ও রাজাদের আনন্দ দেন। এটি মূলত রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রাচীন রীতি। এই রীতি অনুসারে গ্ল্যাডিয়েটররা হাজার হাজার দর্শকের সামনে কেবল অন্য যোদ্ধার সঙ্গেই লড়াই করতেন এমন নয়, এর বাইরেও দাগি আসামি কিংবা হিংস্র বন্যপ্রাণীদের সঙ্গেও লড়াই করতেন। গ্ল্যাডিয়েটরের নাম শুনলেই সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে খাঁচার ভিতর একদল মানুষ আর পশুর মধ্যকার যুদ্ধ কিংবা খোলা ময়দানে মানুষে মানুষে পরস্পর ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। এ নিয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র মনে হয় হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রাসেল ক্রো’র গ্ল্যাডিয়েটর। একটি হিংস্র বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ, মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ ইত্যাদি দেখানো হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধে হার মানেই মৃত্যু। খুবই ভয়ানক সেই মৃত্যু। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী এই যোদ্ধারা লড়াই করত অপর যোদ্ধা, হিংস্র প্রাণী এবং ভয়ঙ্কর সব অপরাধীর সঙ্গে। রোমান সাম্রাজ্যে এই যোদ্ধাদের খুব কদরও ছিল। কারণ সাধারণ মানুষের এবং তৎকালীন রোমান সম্রাটদের বিনোদন দিতেই আয়োজন করা হতো এই লড়াই। ঠিক যেমন আজকের আধুনিক সময়ের রেসলিং। কিন্তু রেসলিং যেটা হয় তা পূর্ব পরিকল্পিত, স্ক্রিপ্টেট। কিন্তু সেই সময়ের লড়াই ছিল সত্যি। সেখানে মৃত্যু মানে মৃত্যু। রক্ত মানে সত্যিকারের রক্ত। লড়াই চলত মৃত্যু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। গ্ল্যাডিয়েটররা তাদের সম্মুখ মৃত্যুকে মেনে নিয়েই লড়াইয়ে নামত। যারা বেশি শক্তিশালী এবং জয়ী হতো তারা হয়ে যেত সে সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্ল্যাডিয়েটর। কিন্তু সমাজ তাদের পৃথক করে রেখেছিল আইনি ও সামাজিক দিকে থেকে। রোমান সাম্রাজ্যের এই সাহসী বীর যোদ্ধাদের নিয়ে অনেক সত্য মিথ্যা মিথ বা কাল্পনিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। গ্ল্যাডিয়েটররা নিয়মিত জীবন ও মৃত্যুর সম্মুখীন হতো। একজন গ্ল্যাডিয়েটর অপরজনকে মেরে ফেলত নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। কিছু গ্ল্যাডিয়েটর তাদের ভ্রাতৃত্ব বোধ থেকে একটি ইউনিয়ন বা কলেজিয়া গঠন করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো যোদ্ধা পরাজিত হলে এই ইউনিয়ন নিশ্চিত করত যে, পরাজিত যোদ্ধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যেন যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে করা হয় এবং তার অর্জনগুলো কবরে খোদাই করে দেওয়া হয়। যোদ্ধার কোনো স্ত্রী সন্তান থাকলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করাও হতো।

স্যামনাইটরা ছিল ইতিহাসের একদম শুরুর দিককার গ্ল্যাডিয়েটর। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রোমানদের কাছে স্যামনিয়ামের পরাজয় ঘটলে রোমে আগমন ঘটে তাদের। রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসা গোত্রগুলো থেকে ধরে আনা লোকদের সঙ্গে লড়াই হতো স্যামনাইটদের। এ থেকেই গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধের শুরু। সাধারণত গ্ল্যাডিয়াস, স্টুটাম, অক্রিয়া এবং পালকশোভিত হেলমেট থাকত স্যামনাইটদের সঙ্গে। এ ছাড়া আর্ম গার্ড ও লেগ প্যাড তো থাকতই। অন্যান্য গ্ল্যাডিয়েটরদের মতো অনেক রোমান সম্রাটও নিজেকে গ্ল্যাডিটোরিয়াল গ্রাউন্ডে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। গ্ল্যাডিয়েটর লড়াইয়ের ম্যাচ আয়োজন করে জনগণের বিনোদনের ব্যবস্থা করে নিজেদেরও জনপ্রিয় করে তুলতেন রোমান সম্রাটরা। অনেক সম্রাটই সত্যি সত্যি নিজেকে লড়াইয়ের মঞ্চে নিয়ে গেছেন।

অধিকাংশ গ্ল্যাডিয়েটর দাস হলেও এই ইউনিয়নের দ্বারা তারা সংঘবদ্ধ হয়েছিল। যদিও গ্ল্যাডিয়েটরদের তাদের সমাজ তেমন সম্মান দিত না। কিন্তু তারা অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিল ঠিকই। তাদের ছবি বিভিন্ন স্থানে ঝুলানো থাকত। বাচ্চারা তাদের অর্জনগুলোর সংখ্যা নিয়ে খেলত। এমনকি আজকের আধুনিক যুগের মতো তারা পণ্যের প্রচার করত এবং আধুনিক যুগের মতোই তখন মেয়েরা গ্ল্যাডিয়েটরদের প্রেমে হাবুডুবু খেত।

হরেক রকম গ্ল্যাডিয়েটর দাপিয়ে বেড়িয়েছে প্রাচীন রোমে। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, বর্মের নমুনা আর পারিপার্শ্বিক দৈনন্দিন অবস্থার বিচারে গ্ল্যাডিয়েটররা নানা ভাগে বিভক্ত ছিল। এমনই একটি গ্ল্যাডিয়েটর জাতি ‘বেস্টিয়ারি’। এই নামকরণের কারণ প্রাচীন রোমে অন্য গ্ল্যাডিয়েটরদের মতো বেস্টিয়ারিরা মানুষের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হতো না। এরা হিংস্র পশুদের সঙ্গে লড়াই করত! আর বিস্ট মানে হচ্ছে পশু। তাই এই নামকরণ। নিজেদের ধন-দৌলতের প্রদর্শন ও জনতার সামনে বাহবা কুড়োনোর জন্য এককালে রোমের অ্যাম্ফিথিয়েটার ও কলোসিয়ামগুলোতে আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ধরে আনা বাঘ, ভালুক, সিংহ কিংবা হাতির সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের আয়োজন করতেন তৎকালীন রোমান সম্রাট ও সিনেটররা। আর দুর্ভাগা সেই মানুষদেরই বলা হতো বেস্টিয়ারি। তাদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন কারপোফোরাস। বীরত্বের অসাধারণ নজির স্থাপন করে খালি হাতে তিনি ২০টি প্রাণীকে পরাস্ত করেছিলেন। গ্ল্যাডিয়েটরদের আরকটি দল হচ্ছে নক্সি। রোমান ইতিহাসে নক্সিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা নীচ জাতির। তখন মানুষজন তাদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করতে চাইত না। দুর্ভাগা এ নক্সিদের মাঝে ছিল খ্রিস্টান, ইহুদি, সেনাবাহিনী ত্যাগ করা কোনো সেনা, বিদ্রোহী ও খুনিরা। নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে দর্শকদের আনন্দ দেওয়াই ছিল তাদের একমাত্র নিয়তি। তাদের এরেনায় ছেড়ে দেওয়া হতো তীরন্দাজদের সামনে। কখনো নক্সিদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আসত ঘোড়সওয়ারের দল। কখনো আবার তাদের এমন হেলমেট পরিয়ে দেওয়া হতো যাতে চোখের জায়গাটাও থাকত বন্ধ। ফলে দর্শকরা যেভাবে বলত, সেভাবেই চলতে চলতে মারা যেত এই হতভাগারা। আরেক ধরনের গ্ল্যাডিয়েটর হলো রিটায়ারিয়াস। তাদের সাজসজ্জা হতো অনেকটা জেলেদের মতো। প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সময় তাদের হাতে থাকত জাল, ত্রিশূল এবং পুজি ইত্যাদি। রোমান সেনাদের মতো সজ্জিত গ্ল্যাডিয়েটরদের বলা হতো প্রোভোকেটর। গ্ল্যাডিয়েটরদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকত অন্য আরেকজন প্রোভোকেটর। তাদের বিশেষত্ব হলো প্রোভোকেটররা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ সিলেক্ট করে নিত।

আগেই উল্লেখ করেছি খেলায় হেওে যাওয়া গ্লাডিয়েটররা সম্রাটের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতো। তার মেজাজ মর্জির উপর নির্ভর করতো গ্লাডিয়েটরের জীবন। যখন কোনো গ্ল্যাডিয়েটর মারাত্মক আহত হয়ে যেত এবং সে তার অস্ত্র নিচের দিকে ফেলে দিয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিত, সে সময় দর্শকরা তার ভাগ্য নির্ধারণ করত। আর যদি কলিসিয়ামের মধ্যে সম্রাটের উপস্থিতিতে খেলাটি হতো তাহলে সম্রাট যা বলতেন তাই করা হতো হেরে যাওয়া গ্ল্যাডিয়েটরের সঙ্গে। যদি সম্রাট থাম্বস ডাউন বা বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচের দিকে নির্দেশ করতেন তাহলে ওই যোদ্ধাকে মেরে ফেলা হতো। মতান্তরে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা অনুযায়ী সম্রাট যদি দুই হাত প্রসারিত করে থাম্বস আপ করতেন তবে সেই যোদ্ধার মৃত্যু অবধারিত হতো। আবার সাদা রুমাল নাড়ানো হলে সেই গ্ল্যাডিয়েটর মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যেত। তবে যোদ্ধাকে মেরে ফেলা হবে না। আর যদি তাকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হতো তাহলে বিজয়ী গ্ল্যাডিয়েটর তার বিপক্ষ প্রতিযোগীর দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধারা সব সময় মরার জন্য প্রস্তুত হয়ে লড়াই করত না কিংবা সব ম্যাচেই একজনের মৃত্যু ঘটতে হবে এমনটা ছাড়াও ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে এসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এসব মেয়ে নিজের ইচ্ছায় এই যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিল।

বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত গ্ল্যাডিয়েটর মানা হয় স্পার্টাকাসকে। তবে তার জীবনের শুরুটা বেশ ঘটনাবহুল। একজন বীর গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগে দারিদ্র্যের জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। সাধারণ সৈনিকের জীবন তো বটেই, বন্দী হয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত দাসত্ব বরণ করে নিতে হয়েছিল। আর সে দাসত্ব থেকেই গ্ল্যাডিয়েটর স্পার্টাকাসের জন্ম। গ্ল্যাডিয়েটর হওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন থ্রাসিয়ান সৈনিক এবং যাকে রোমান সৈন্যরা বন্দী করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। লেনটুলোস বাটাইটাস নামের এক লোক তৎকালে ক্যাপুয়া নামের একটি গ্ল্যাডিয়েটর স্কুল পরিচালনা করতেন। তিনিই সর্বপ্রথম স্পার্টাকাসের ভিতর একজন গ্ল্যাডিয়েটর হওয়ার অমিত সম্ভাবনা খুঁজে পান। পাকা জুহুরি ছিলেন বাটাইটাস। তিনি স্পার্টাকাসকে গ্ল্যাডিয়েটর বানানোর অভিপ্রায়ে চড়া দামে কিনে নিলেন। শুরু হলো সৈনিক স্পার্টাকাসের নতুন জীবন। গ্ল্যাডিয়েটর স্কুলে স্পার্টাকাস খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন গ্ল্যাডিয়েটর হওয়ার সম্পূর্ণ শিক্ষালাভ করলেন। ক্রমেই স্পার্টাকাস একজন বিখ্যাত গ্ল্যাডিয়েটর হয়ে উঠেন এবং অনেক যুদ্ধ জয় করেন। কথা ছিল বাটাইটাস একটা সময় পর তাকে স্বাধীন করে দেবেন। কিন্তু প্রতারণার শিকার হন স্পার্টাকাস। বাটাইটাস তাকে স্বাধীনতা দিতে চেয়েও প্রতারণা করেন। ৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টাকাস তার ৭০ গ্ল্যাডিয়েটরকে সঙ্গে নিয়ে বাটাইটাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই দাস-বিদ্রোহে বাটাইটাস খুন হন। আর ওই সময়ই অনেক ক্রীতদাস মুক্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে একটি বড় ও শক্তিশালী বাহিনীর সৃষ্টি হয়। অচিরেই তারা ৭০ হাজার দাসের একটি বাহিনীতে পরিণত হয়। ৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুরো শীতকাল গ্ল্যাডিয়েটর ও দাসরা প্রশিক্ষণে ব্যয় করে। এরপর বাধে যুদ্ধ। রোমান বাহিনী ও গ্ল্যাডিয়েটর-দাসদের এই যুদ্ধ তৃতীয় সারভিল ওয়ার হিসেবে এখন পরিচিত। স্পার্টাকাসকে হত্যার জন্য অনেক বাহিনী পাঠানো হয় কিন্তু গ্ল্যাডিয়েটররা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহজেই তাদের পরাজিত করে। ৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, মারকুস ক্রেসুস ৫০ হাজার উন্নত প্রশিক্ষিত রোমান সৈন্য নিয়ে স্পার্টাকাসের বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং ক্রেসুস দক্ষিণ ইতালিতে স্পার্টাকাসকে আটক করেন। শেষ পর্যন্ত বন্দী স্পার্টাকাসকে হত্যা করা হয়। তার অনুগামীদের ছয় হাজার বন্দী হয় এবং পরে তাদের ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদের মৃতদেহ দিয়ে কেপুয়া থেকে রোম পর্যন্ত রাস্তার ধারে লাইন তৈরি করা হয়েছিল।

ফ্ল্যামমা নামে আরো একজন বিখ্যাত গ্লাডিয়েটর ছিলেন। তিনি মূলত একজন সিরিয়ান গোলাম বা ক্রীতদাস। কিন্তু ইতিহাসে তার খ্যাতি একজন বীর যোদ্ধা হিসেবেই। মাত্র ৩০ বছর বয়সে মারা গেলেও গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে তার রয়েছে অসাধারণ রেকর্ড। ৩০ বছরের ছোট্ট জীবনে গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে তিনি ৩৪টি যুদ্ধ করেন। যার ভিতর ২১টিতে জয়লাভ, ৯টি ড্র হয় এবং পরাজিত হন মাত্র চারটিতে। এর ভিতর তিনি চারবার রুডিস লাভ করেন। যখন একজন গ্ল্যাডিয়েটরকে রুডিস দেওয়া হয় তার মানে সেই গ্ল্যাডিয়েটর আর কারও গোলাম নয়। সে অন্যান্য রোমানবাসীর সঙ্গে বাকি জীবন বসবাস করতে পারবে। কিন্তু ফ্ল্যামমা এই রুডিস নিতে অস্বীকার করেন। তাই তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একজন গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে ফাইট করে গেছেন।

ইতিহাসের আরেক বিখ্যাত গ্ল্যাডিয়েটরের নাম ক্রিক্সাস। তিনি ছিলেন মূলত একজন গ্যাললিক গ্ল্যাডিয়েটর। ক্রিক্সাসের ডমিনস বা মালিকের স্ত্রীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ক্রিক্সাস ভালোবাসত এক চাকরানিকে। এই চাকরানিকে ক্রিক্সাসের মালিক অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়। এরই মধ্যে ক্রিক্সাস একটি দাস বিদ্রোহে যুদ্ধ করে এবং গ্ল্যাডিয়েটর স্কুল থেকে পালায়। পরে বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে তার মতপার্থক্য ঘটে এবং তিনি একটি সেনাদল গঠন করে ইতালি ধ্বংস করতে অগ্রসর হন। কিন্তু তার এই জীবনের জন্য দায়ীদের প্রতিশোধ নেওয়ার আগেই তিনি রোমান সৈন্যদের হাতে নিহত হন।

ইতিহাসের অধিকাংশ গ্ল্যাডিয়েটরই রোমান নাগরিকত্বের বাইরে ছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিনে আনা দাসদের গ্ল্যাডিয়েটর স্কুলে প্রবেশ করানো হতো। কিন্তু মারকুস এটিলাস এক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। তার বীরত্বগাথা ২০০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় যা গ্রাফিতিতে বর্ণিত ছিল। এটিলাস যদিও জন্মসূত্রে একজন রোমান নাগরিক ছিলেন, তবু তিনি গ্ল্যাডিয়েটর স্কুলে প্রবেশ করতে বাধ্য হন তার জীবনের খরুচে স্বভাবের জন্য। খরুচে স্বভাবের কারণে ব্যক্তিগত জীবনে এটিলাস ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। আর সেই ঋণ থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে একজন গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে গড়ে তোলেন এটিলাস।

এই কলোসিয়ামে বসে রোমের দুর্ধর্ষ শাসক জুলিয়াস সিজার ৩০০ গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই উপভোগ করেন। আর সম্রাট ট্রাজান উপভোগ করেন পাঁচ হাজার দ্বৈত-যুদ্ধ। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো এ কলোসিয়ামে। সেখানে ভ্যাটিকানের সর্বোচ্চ খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা উপস্থিত থাকেন। অংশ নিতেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। সেখানে এক ধর্মীয় উৎসবে উপস্থিত প্রত্যেককে কলোসিয়ামের এক মুঠো করে মাটি উপহার দিতে চেয়েছিলেন পোপ গ্রেগরি। কিন্তু কেউই তা নিতে রাজি হননি। তাদের অভিযোগ, ‘এই মাটি হাতে নিয়ে চাপ দিলে এখনো বের হবে তাজা রক্ত, রয়েছে রক্তের গন্ধ। তাই এই পাপের ভাগি আমরা হতে চাই না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যত রক্ত ঝরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রক্ত ঝরেছে রোমের কলোসিয়ামের এই এক চিলতে মাটিতে।’

গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্ত, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে আছে যে স্থাপত্যটির বুকের জমিনজুড়ে, অপূর্ব নির্মাণশৈলীর যে স্থাপত্যটি আজও মনুষ্যসৃষ্ট নয়নাভিরাম স্থাপত্যের এক সপ্তাশ্চর্য হিসেবে ইতিহাসের স্বাক্ষ্য দিচ্ছে, সেই কলোসিয়াম এখন পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ট্যুরিস্ট স্পট। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন ইতিহাসের এই নির্মমতার সাক্ষ্য দেখতে। নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে পুরো এলাকা ভালো করে ঘুরে দেখা যায়। প্রায় চার ঘণ্টা কলোসিয়ামের বিস্ময়ভরা স্থাপত্য দেখে ফিরে আসতে আসতে একটি প্রশ্নের উত্তর মেলাতে পারিনি, প্রায় দু’হাজার বছরের বেশি সময় আগে নির্মিত এই কলোসিয়াম কিসের প্রতীক, গৌরব না নৃশংসতার!

সর্বাধিক পঠিত