প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোজ্যতেল ও চিনি: আট মাসে চাহিদার ৮৯ শতাংশ আমদানি হলেও বাজারে অস্থিরতা

নিউজ ডেস্ক: রমজান মাসের ভোগ্যপণ্যের চাহিদায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকে ভোজ্যতেল ও চিনি। সরবরাহ ঘাটতি কিংবা বাড়তি চাহিদার কারণে প্রতি বছর এ দুটি পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। কিন্তু এবারের রমজানকে সামনে রেখে পণ্য দুটির আমদানি হয়েছে বেশ ভালো। আট মাসেই পুরো অর্থবছরের ৮৯ শতাংশ ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানি হয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও ভোক্তাদের পণ্য দুটি কিনতে হচ্ছে রেকর্ড দামে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম), ট্রেডিং করপোরেশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বছরে ভোজ্যতেলের ২০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ১৬ লাখ ২৩ হাজার টন আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে ১৮ লাখ টন চিনির চাহিদার বিপরীতে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৯০ হাজার টন। পাশাপাশি দেশের উৎপাদন বিবেচনায় নিলে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতির কোনো প্রতিফলন নেই। কয়েক সপ্তাহ ধরেই ভোজ্যতেল ও চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। এক বছরের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১২০-১২৫ টাকা এবং খোলা পাম অয়েল ১০৬-১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সয়াবিন তেল পাঁচ লিটারের বোতল ৬৪০-৬৬০ টাকায়, ১ লিটারের বোতল ১৩৫-১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে পাম অয়েল সুপার প্রতি লিটার ১১১-১১৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম ৩০-৪৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায়।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, দেশে চাহিদার তুলনায় এ দুটি পণ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি বেশ ভালো রয়েছে। এছাড়া দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে কোনোভাবেই ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিছু ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয় যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম হস্তক্ষেপ করছেন। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পণ্যের দাম বেঁধে দেয়া হলেও সামনের দিনে তা সমন্বয় করা হবে। তবে সামনের দিনে ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজার তদারকি আরো বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে উৎপাদনে জোর দিতে হবে।

এদিকে রমজানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্রব্যের বার্ষিক চাহিদা, রমজানের চাহিদা, আমদানির পরিমাণ, আমদানি মূল্য, উৎপাদনের পরিমাণ, পাইকারি ও যৌক্তিক খুচরা মূল্যের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সেখানে দেখা গেছে, রমজানের প্রধান এ দুটি ভোগ্যপণ্যের যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে। এর পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসায় দাম বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি। দেশের সরবরাহ পরিস্থিতি ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ভোজ্যতেলের এক লিটারের বোতল ১৩৯ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ৬৬০ টাকা এবং চিনির খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ৬৭-৬৮ টাকার বেশি হতে পারবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ভোজ্যতেল (সয়াবিন): ভোজ্যতেলের বার্ষিকা চাহিদা ২০ লাখ টন। তবে পণ্যটির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে রমজান মাসে। এ সময় প্রায় দুই লাখ টন চাহিদা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি—এ সময়ে পণ্যটি আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার টন। ফলে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে চাহিদার প্রায় ৮২ শতাংশ আমদানি হয়েছে পণ্যটির। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে দুই লাখ টন। এ অবস্থায় বাজারে সরবরাহ বেশি রয়েছে বলে মনে করছে সরকারি সংস্থাগুলো।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি টন ভোজ্যতেল আমদানিতে গড়ে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭১ ডলার থেকে ১ হাজার ২৭৫ ডলার। ফলে প্রতি লিটার আমদানিতে সর্বনিম্ন ব্যয় ৯১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ব্যয় ১০৮ টাকা। অথচ চলতি সপ্তাহে পাইকারি বাজারে প্রতি পাঁচ লিটার বোতল ৬৪০ টাকা, এক লিটার বোতল ১৩১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রি হচ্ছে পাঁচ লিটারের বোতল ৬৬০ টাকায় এবং এক লিটারের বোতল ১৩৯ টাকায়। ফলে আমদানি ব্যয়ের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি দামে বাজারে পণ্যটি বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নূরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ রতন বলেন, ভোক্তাস্বার্থকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু দামের বিষয়টি শুধু দেশে মজুদের ওপরই নির্ভর করে না। কেননা ভোজ্যতেলের বাজার বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। এ কারণে বৈশ্বিক দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারের সংকটের ওপরই দেশে ভোজ্যতেলের বাজার প্রভাবিত হয়। সরকারের কর কাঠামোতে ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্কারোপের ফলেও বাজার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভরতার কারণেই দেশের বাজারে পণ্যটির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়। বাজার স্থিতিশীল করতে দেশে উৎপাদনেও জোর দিতে হবে। বাজার স্থিতিশীলতায় সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তকেই আমরা স্বাগত জানাব।

চিনি: বছরে চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টন। এর মধ্যে রমজান মাসে চাহিদা ১ লাখ ৩৬ হাজার টন। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি এ আট মাসে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৯০ হাজার টন। ফলে চাহিদার প্রায় শতভাগই আমদানি হয়েছে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে ৮২ হাজার টন দেশে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ অবস্থায় পণ্যটির চাহিদার চেয়ে বাজারে বেশি সরবরাহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি টন চিনি আমদানিতে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৩৩১ থেকে ৩৫০ ডলার। ফলে প্রতি কেজি আমদানিতে সর্বনিম্ন ব্যয় ২৮ টাকা সর্বোচ্চ ব্যয় ৩০ টাকা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৬৩ টাকা আর খুচরায় প্রতি কেজি ৬৭-৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে আমদানি ব্যয়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণের বেশি দামে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত