প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোজ্যতেলই নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকায় থাকে

নিউজ ডেস্ক: দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের কৃষি ও খাদ্যপণ্য আমদানি হয়। আর এ আমদানি ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ভোজ্যতেলে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় পণ্যটির জন্য নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর। দেশে মজুদ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। ভোজ্যতেলের দামের এ অস্থিরতা প্রভাব ফেলছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপরও।

চাল, ডাল ও চিনির পর দেশে ভোগ্যপণ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোজ্যতেল। চাল, চিনি ও ডাল দেশেও উৎপাদন হয়। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি ছাড়া চালের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বাংলাদেশের কৃষক। এছাড়া ডালের ২০-৩০ শতাংশ চাহিদা মেটানো যায় দেশীয় উৎপাদন দিয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি মিলের মাধ্যমে চিনি উৎপাদন হয় চাহিদার ৭ থেকে ১০ শতাংশ। কিন্তু ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানিনির্ভর। এতে আমদানিকারক থেকে শুরু করে পাইকারি ব্যবসায়ী পর্যন্ত একাধিক মাধ্যমে পণ্যটির বাজার বছরের অধিকাংশ সময়ই অতিমূল্যায়িত থাকে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি পর্যন্ত পুরো বছরব্যাপী স্থানীয় প্রচলিত প্রথায় পণ্যটির দাম নির্ধারিত হয়। এ কারণে ভোজ্যতেলের দামের ওপর দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাস ধরেই অস্থিতিশীল রয়েছে ভোজ্যতেলের দাম। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। ভোজ্যতেলের দাম এরই মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। রমজানে চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দাম আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তার পরও দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়নি।

ভোজ্যতেলের দাম যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাণান্ত চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে ই-কমার্স চালুর পরিকল্পনাও আছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেয়া যায় কিনা ভাবছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। বাজার সহনীয় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনাও করা হচ্ছে। টিসিবিও এক্ষেত্রে কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকার ভোজ্যতেল ও তেলবীজ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে পণটি আমদানি হয়েছে ২০ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার। আগের দুই অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৯২৪ কোটি ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যপণ্য আমদানির একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির ২০১৫-১৮ সময়ের এ তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক বলছে, এ চার বছরে গড়ে প্রতি বছর ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। মুদ্রার বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে নিলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে মোট আমদানির বড় অংশই ছিল ভোজ্যতেলকেন্দ্রিক। এ আমদানির ১৮ শতাংশ পাম অয়েল, সয়াবিন তেল ১১ শতাংশ, সয়াবিন ৬ শতাংশ ও সয়াবিনের খৈল ২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট আমদানির প্রায় ৩৭ শতাংশই ব্যয় হয়েছে ভোজ্যতেলে।

আমদানিনির্ভরতার কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে উত্থান-পতন ভোজ্যতেলের বাজারকে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায় বলে মনে করছেন দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, যেকোনো ভোগ্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীল। একজন সাধারণ ভোক্তা অধিকাংশ সময়ই চাল ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে সজাগ থাকে। একটি চারজনের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারেও প্রতি মাসে তিন-চার লিটার ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকায় আমদানিনির্ভর পণ্যটির দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগও বেশি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নূরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ রতন বলেন, ভোজ্যতেলের বাজার প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। এ কারণে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সংকট ও দেশীয় মজুদের ওপর ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভরতার দরুন এ ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ভোজ্যতেলের বাজার বছরের অধিকাংশ সময়ই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। তাছাড়া সরকারের কর কাঠামোয় ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্কারোপের ফলেও বাজার অস্থির হয়। এক্ষেত্রে শুধু ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ দোষ দেয়া ঠিক হবে না।

গত কয়েক মাসে হঠাৎ করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে থাকায় তা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে মূল্য বেঁধে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে গত ১৫ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের দাম মিল গেটে ১২৭ টাকা, ডিলার পর্যায়ে ১৩১ ও খুচরায় ১৩৯ টাকা নির্ধারণ করে। ওই সময় পাঁচ লিটারের বোতল মিল গেটে ৬২০ টাকা, ডিলার পর্যায়ে ৬৪০ ও খুচরা পর্যায়ে ৬৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক বিষয়ক জাতীয় কমিটির সভায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম মিল গেটে ১২৩ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ১২৭ ও খুচরায় ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম মিল গেটে ৫৮৫ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ৬০০ ও খুচরায় ৬২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রতিবার দাম নির্ধারণের পরও খোলাবাজারে এর চেয়ে বেশি দরে বিক্রে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। এর আগে প্রতি লিটারের দাম ছিল মিল গেটে (খোলা) ৯৫ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ৯৮ ও খুচরা বাজারে ১০৪ টাকা।

এদিকে ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সয়াবিন ও পাম অয়েলে আরোপিত ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) প্রত্যাহার করেছে এনবিআর। দামের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানিতে এ ছাড় দেয়া হয়েছে। তবে এ সুবিধা কেবল ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে। গতকাল এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ভোজ্যতেল আমদানিতে অগ্রিম কর ৪ শতাংশ মওকুফের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশে ভোজ্যতেলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম হঠাৎ করেই কমতে শুরু করে। সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ভোজ্যতেল পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম ১ ঘণ্টার মধ্যেই ৩০-৪০ টাকা কমে যায়। পরবর্তী সময়ে আমদানিতে শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিয়ে সংশয় দেখা দিলে দাম আবার বাড়তে শুরু করে। যদিও বিকালের দিকে শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত হলে দাম আবার কমে যায়।

আগামী কয়েক দিন পণ্যটির দাম নিম্নমুখী থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন ভোজ্যতেলের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, দেশের আমদানিকারকরা ভোজ্যতেল আমদানির অনেক আগেই বাজার থেকে শত শত কোটি টাকা উত্তোলন করে নেন এসও (সাপ্লাই অর্ডার) বিক্রির মাধ্যমে। যদিও একই আমদানিকারক ভোজ্যতেলের এসও রসিদ বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করলেও ব্যাংকের মাধ্যমে নামমাত্র এলসি (ঋণপত্র) মার্জিনে (১০ থেকে ২০ শতাংশ পরিশোধের ভিত্তিতে) পণ্য আমদানি করেন। অর্থাৎ কোনো ধরনের সুদ ছাড়াই বাজারে এসও ছেড়ে দিয়ে অর্থ সংগ্রহ সত্ত্বেও ব্যাংকের সহায়তায় ঋণ নিয়ে বন্ডেড পণ্য হিসেবে ভোজ্যতেল আমদানি করায় পণ্যটির আমদানিতে খরচও বেশি পড়ে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় ক্রেতাকে। অন্যদিকে বাজারে অনেক আগেই এসও বিক্রির কারণে সেসব রসিদ একাধিক হাতবদলের মাধ্যমে দাম বাড়তে থাকে। ফলে একজন আমদানিকারক যত কম মূল্যেই এসও বিক্রি করুক না কেন মিল গেট থেকে ওই এসওর বিপরীতে পণ্য উত্তোলন হয় ভোজ্যতেলের বর্তমান দর বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশীয় সর্বোচ্চ দামে। ফলে ভোজ্যতেলের বাজার ঘিরে এক ধরনের অর্থপ্রবাহের ক্ষেত্র তৈরি করেছেন আমদানিকারকরা। এ কারণে ভোজ্যতেলের দামই দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত