প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শামীম আহমেদ জিতু: কোথাও একটা লুকোনো বিষাদ আছে

শামীম আহমেদ জিতু: [১] অহনার স্কুল থেকে চিঠি দিয়েছে যে আজকে যাতে বাচ্চারা স্কুল থেকে যার যার অস্থাবর সম্পত্তি যেমন শীতের অতিরিক্ত জামা-জুতো, ল্যাপটপ, খাতা-পত্তর ইত্যাদি গুছিয়ে নিয়ে আসে। …৩ দিনের ছুটি, তারপর স্কুল অন্তত আগামী একমাস নাও খুলতে পারে। অন্টারিওতে আবার করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা ২ ছাড়িয়ে ৩ হাজারের দ্বারপ্রান্তে এখন, মৃত্যুও ২০ জনের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। তাই এই সিদ্ধান্ত।

[২] বেশ কিছুদিন আগে যখন চারমাস সব বন্ধ থাকার পর আবার খুলে গেলো, ডাউনটাউনের দোকান-পাট শপিং সেন্টারের সামনে লম্বা লাইন লেগে থাকতে দেখা গেলো। Zara, Holt Renfrew, Hudson Bay থেকে শুরু করে H&M, Winners ইত্যাদির সামনে লম্বা লাইন। মানুষ যেন চার মাস শপিং না করে পাগল হয়ে গেছিলো। এই লাইন দেখেই আমার মনে হয়েছে আজ হোক বা দুই বছর পর, যখন করোনা হয়ে যাবে শুধুই একটা দুঃসহ স্মৃতি, তখন মানুষ যে একটা awakening এর মধ্যে দিয়ে যাবে, তা হবে না। সবাই আবার যার যার জীবনে ফিরে যাবে। গরিব আরও গরিব হবে, ধনী আরও ধনী। অপচয়, মিথ্যা, স্বেচ্ছাচারী জীবন সবই ফিরবে আগের মতো।

[৩] এই দোকান-পাট খোলার জন্য আমিও প্রায় ৩ মাস ধরে অপেক্ষা করছিলাম। বিদ্যমান প্যান্টগুলোর কোমর ঢোলা হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে গেলো যে আমার বেল্টগুলোতে নতুন নতুন ছিদ্র করেও সেগুলোকে আর কোমরের সঙ্গে ধরে রাখা যাচ্ছিলো না। শীতের মধ্যে একহাতে প্যান্ট টানতে টানতে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই দোকান-পাট খুলতেই মোটামুটি ঝাঁপ দিয়ে হাডসন বে-তে গিয়ে ৭০ কানাডিয়ান টাকা দিয়ে একটা জিন্স কিনে ফেললাম। ইচ্ছা ছিলো ২৫ টাকার মধ্যে কেনার, কিন্তু পাওয়া গেলো না, আফসোস। তবে এর বাইরে দোকান-পাটে আমার তেমন আগ্রহ নেই। মানুষের বিলাসিতাপূর্ণ জীবন দেখতে ভালোই লাগে আমার, তবে সেটা টিভিতে।

[৪] ঋতু পরিবর্তনের একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এই পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রা, রৌদ্রের প্রখরতা কিংবা গাছ-পালার রং-ঢঙ্গে নয়, বরঞ্চ আসে সামাজিকতায়, পথে-প্রান্তরেও। যেসব উদ্বাস্তু মানুষকে চৌরাস্তার মোড়ের ম্যাকডোনাল্ডসের সামনে পুরোটা শীতজুড়ে কাঁথা-কম্বল মুড়ে মদ পান করতে করতে আর খিস্তি-খাউড় উগড়ে দিতে দেখা যায়, বসন্তের আগমনে তারা সব হাওয়া। তাদের এখন দেখা যাবে বসন্তের সময় পর্যটকদের ভীড় বেশি যেখানে, সেখানে; এছাড়া তীব্র শীত থেকে বাঁচবার জন্য কোণা-কাঞ্চিও আর খুঁজতে হবে না তাদের।

[৫] বাজার করতে গিয়ে দেখি এক বিশালদেহী শাদা চামড়া এক কালো ট্যাক্সি ড্রাইভারকে চিৎকার করে ‘ইমিগ্রেন্ট’ বলে গালি দিচ্ছে। একবার ভাবলাম দাঁড়িয়ে ফেসবুকে লাইভে গিয়ে পুলিশকে কল দিই, পরে দেখলাম হাতে সময় নেই তেমন, বাজার করে বাসায় ফিরতে হবে। নাটক করার জন্য আরেকটু বেশি সময় দরকার ছিলো। সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার দেখলাম নিরাপদ অবস্থান বুঝে একটু গলা উঁচিয়ে ‘ফাঁক ইউ’ বললো। তবে সেই গলার জোরে ‘জোরটাই’ কম ছিলো, কিছু একটা প্রতিউত্তর দেওয়ার চেষ্টাটা ছিলো বেশি।

[৬] এক প্রিয় বড় ভাই পরশু ফোন দিয়ে বললেন দেশে যাবার একটা সুযোগ এসেছে। টিকিট উপহারসহ নানা কিছু। যাবেন কিনা সেটা জানতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার পরামর্শ চাইলেন। কী বলবো ভেবে পাই না আসলে। মানুষের জীবন নিয়ে তো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এই যে গত দেড় বছরে করোনায় ২৮ লাখ মানুষ মারা গেলো, সেটা অনভিপ্রেত নয়, কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত তো বটেই। গত বছর আমার একটা লেখায় উল্লেখ করেছিলাম করোনায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা ন্যূনতম ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ছুতেঁ পারে ১ কোটির ঘরও। এদিকে যারা মারা গিয়েছেন তাদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষই কী নিয়মিত মাস্ক পরেননি? হাত ধোননি? তবে? আবার যারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাদের অনেকেই তো কখনো মাস্ক পরেন না, হাত ধোন না, দূরত্ব বজায় রাখেন না, তবে? এ এক অদ্ভুত রোগরে ভাই, কেউ-ই তেমন কিছু জানে না। এখন পর্যন্ত  পৃথিবীতে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে ৬০ কোটির বেশি, ১ ডোজ করে। দুই ডোজ ভ্যাকসিন পেয়েছেন এমন মানুষ ২০ কোটির কাছাকাছি। আমার ধারণা এই বছর শেষ ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া সম্ভব হবে ৩০০ কোটির কাছাকাছি। হয়তো সর্বোচ্চ ২০০ কোটি মানুষ ভ্যাক্সিন কোর্স সম্পন্ন করবেন, তারপরও বাকি থাকবে কমপক্ষে সাড়ে ৫০০ কোটি মানুষ। তাহলে? ভ্যাক্সিন ছাড়া বাকি সব ওপায় আসলে সাময়িক, মানবসভ্যতায় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যে ভয়াবহ পিছিয়ে আছে, তার একটা করুণ নিদর্শন মাত্র!

[৭] গুগল পিক্সেল ফোন যে গত বছরগুলোর কিছু স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, বেশ লাগে। আগামী বছর এই সময়ে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু স্মৃতি তৈরি হবে তো এই বছর? সেই স্মৃতিগুলো কী সুখস্মৃতি হবে? কে জানে! ভালো থাকবেন- অনেক অনেক। খুব খুব। ভালোবাসা। শুভেচ্ছা। লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত