প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান: ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে প্রবাহিত করতে হবে

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে নতুন প্রজম্মের কাছে পৌঁছাতে  আমরা ব্যর্থ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে জরিপ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে কী হয়েছিলো? এরপর আন্দোলনটি সফল হলো কীভাবে? কারা কী ভূমিকা রেখেছিলো? আমাদের ভাষা আন্দোলনের যে বিশালত্ব যে ব্যাপকতা, যার মধ্যদিয়ে আমাদের বাঙালি গণজাগরণের সৃষ্টি হয় সে জায়গাটিকে কিন্তু আমরা স্পষ্টভাবে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারছি না। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলাতে সভা হয় এবং সেখানে অ্যাডভোকেট গাজীউল হক ছাত্র নেতা সভাপত্বি করেন এবং সেখানে দ্বিপক্ষীয় মত থাকলেও তিনি সভাপতি হিসেবে সব সিদ্ধান্ত নেন বেশির ভাগেরই মত ছিলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবো। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা, রাজনৈতিক দলের লোকেরা ১০ জন ১০ জন করে দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়িয়েছিল। তারপর কারফিউ ভাঙা, আগুন ধরিয়ে দেওয়া, লাঠি চার্য করে আঘাত করে নানা রকম আন্দোলনের মাধ্যমে সেদিন অনেক লোক শহীদ হয়েছিলেন। তখন ঢাকা মেডিকেলের হোস্টেলগুলো ছিলো ব্যারাক, সেখানে মাইক সেট করে আহত ও নিহতদের যাবতীয় ব্যবস্থা করেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র, চিকিৎসক এবং কর্মজীবীরাও।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনটা অনেকটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রিক হয়ে যায় এবং সেখান থেকে মাইকের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা ও বক্তব্য দিতে থাকে। এরপর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা, ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার স্থাপন, রাজ বন্দীদের মুক্তি, বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে বাংলাভাষা, বাংলানববর্ষ বন্ধের দিন ঘোষণা, পহেলা বৈশাখ ছুটির দিন চালু করতে হবে।

এরকম আরও অনেক কিছু ২১ দফার মধ্যে দাবি ছিলো। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে গিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা বাস্তবায়ন হয়। ভাষা আন্দোলনের সময় ২১ এবং ২২ ফেব্রুয়ারিতে কতোজন মানুষ শহীদ হন এটা কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করতে পারিনি। একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা সবাই একত্রিত হয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই, কিন্তু অনেকেই আমরা জানি না ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কতোজন ছাত্র ও জনতা প্রাণ দিয়েছিলেন। আমাদের বাঙালির ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ইতিহাসগুলো সামগ্রিকভাবে নতুন প্রজম্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। কারণ তারা শুধু ভাষা আন্দোলন বলতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পড়ে আছে, কিন্তু এর একটি ধারাবাহিকতা আছে।

ভাষা আন্দোলনের শুরুটি হয় ১৯৪৮ সালে যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন থেকে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। এর ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ ছিলো বিশেষ দিন ওই দিনে ঢাকা শহরে হরতাল ডাকা হয় এবং সেখানে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেন প্রথম। তিনি যখন ছাত্রলীগে চলে আসেন তখন তিনি সবসময় পরামর্শ দিতেন। ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারি মাস তিনি জেলে ছিলেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এরপর ১৫ তারিখে তাকে গোপালগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় রাতের বেলা আমাদের তৎকালীন নেতারা দেখা করতেন এবং পরামর্শ নিতেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৬ তারিখ থেকে অনশনে যান। ওই সময় মোহাম্মাদ ত্বোহা, অলি আহমেদ, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতেন যান। ১৯৫২ সালে ২৭ এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরীতে ভাষা সৈনিকরা একটি সভা করে। ওই সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৫৬ সালে ২৩ মার্চ পাকিস্তানে নতুন সংবিধান চালু হয়। পাকিস্তানে ইসলামিক শাসন চালু হয় এবং সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালের যে ২১ দফা ছিলো সেগুলো পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ণ করা হয়। ভাষা আন্দোলনের এটুকু ইতিহাস সকলের মানুষের জানতে হবে। কারণ ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম শোপন। ১৯৮৯- ১৯৯১ সাল পযর্ন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমীতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেই সময় আমরা ভাষা আন্দোলনকে নতুন প্রজম্মের কাছে তুলে ধরতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিই। তখন  শিক্ষক সমীতি,  ছাত্র সংসদ এবং ডাক্তারদের ফোরামের উদ্যোগে ভাষা সৈনিক সমাবেশ করলাম দিন ব্যাপী। সেই অনুষ্ঠানে দেশে-বিদেশে এবং মফস্বলে যতো ভাষা সৈনিক আছেন সকলকে আমন্ত্রণ করা হবে। সেখানে গাজী উল হক সাহেব, জাহানারা ইমাম, শহীদ শফিউর রহমানের স্ত্রী, শহিদ ডা. মিলনের মা, আনিসুর জামানসহ আরও অনেকেই ছিলেন। এই অনুষ্ঠনের মধ্যদিয়ে আমার মূল লক্ষ্য ছিলো নতুন প্রজম্মের ছাত্র-ছাত্রীদের ইতিহাস সম্পর্কে জানানো।

বাংলাদেশের একমাত্র অনুষ্ঠান যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন সুফিয়া কামাল এবং বিশেষ অতিথি ছিলো দুজন মন্ত্রী (শিক্ষাবিষয়ক, সাংস্কৃতিক)। এই অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনের ইদিহাসের যে দন্ড বা বিতর্কে সুরাহা কারা দরকার ছিলো। কিন্তু তারাই এটি নিয়ে বির্তক করে একেকজন একেক কথা বলছেন। দন্ড ছিলো বা দন্ড থাকবে তবে কিন্তু তা দিয়ে মূল ইতিহাস তুলে ধরা ও নতুন প্রজম্মের কাছে প্রবাহ করা আমাদের দায়িত্ব। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সর্বস্তরে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করা হলো। কিন্তু এখন সর্বক্ষেত্রে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করবো সেখানে যেন কোনো জটিলত না হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজিকেও রাখতে হবে যেহেতু গ্লোবাল ভিলেজ হয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোর মতো জায়গায় পৌঁছাতে যেমন- চীন, জাপান তাদের ভাষায় সবকিছু করে এটি নির্ভর করে একটা দেশের অর্থনীতি অবস্থার ওপর। সেই পর্যায় গেলে আমরাও সেরকমই করবো।

বাংলাকে সব জায়গায় ব্যবহার করতে হবে বাংলা যেন অসম্মানিত না হয়। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের সরকারি আদেশ থাকলেও সেটি ব্যবহার হচ্ছে না। এজন্য দরকার নিবির পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার করতে হবে। কেউ যদি আইন না মানে সেক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। সংস্কৃতির মূল বিষয় হচ্ছে, ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতি একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। বাংলা ভাষার জন্য অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম, শহীদের রক্তের মাধ্যমে অর্জিত এবং তারই ধারাবাহিকতায় আমরা মুক্তি যুদ্ধে স্বাধীনতা লাভ করেছি। বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে চিকিৎসক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রথম  শহীদ মিনার ঢাকা মেডিকেলের ছাত্ররাই করেছে। ঢাকা মেডিকেলের ব্যারাকে সভার জন্য সমস্ত আয়োজন ছাত্র-ছাত্রীরাই করছে। ভাষা আন্দোলনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, আহত ভাষা সৈনিকদের সেবা করা এবং যারা নিহত হয়েছে তাদের মৃত দেহের যাবতীয় ব্যবস্থা করা। ভাষা আন্দোলনে মৃত্যু নিয়েও বিতর্ক আছে কেউ বলছে তিনজন, কেউ বলছে ৬ জন। কিন্তু পাকিস্তানি বামপন্থী লেখক ও গবেষক লাল খান বলেছেন ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারিতে ২৬ জন নিহত হয়েছেন। ওইসময় অনেক লাশ গুম করা হয়েছিল। সেখানে সে সময়ের স্বৈরাচারী সরকার ২৬ জনকে মেরে ফেলেছিলেন এবং ৪০০ জনের মতো লোক আহত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করার এবং বাস্তবায়ন করার। সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আমি শুরু থেকে দায়িত্বপালন করেছি। আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তাকে বলতে গেলে আমিই প্রথম ঘর থেকে বের করে জনসম্মুখে নিয়ে আসি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তখন, ‘একাত্তরের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম।

১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজের গ্যালারিতে আয়োজিত সে অনুষ্ঠানে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছাড়াও, ড. আনিসুজ্জামান, পান্না কায়সার, নীপা আলীম, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশে একটি মাত্র ভাষা সৈনিক সমাবেশ হয়েছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে যার আয়োজনের সঙ্গে সদস্য সচিব হিসেবে আমি যুক্ত ছিলাম। এখানে দেশে বিদেশে যতোজন ভাষা সৈনিক ছিলেন প্রত্যেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এসকল কাজে নতুন প্রজন্মকে আমাদের গৌরবের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া দায়িত্ব ।

পরিচিতি : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অনুলেখক : আবদুল্লাহ মামুন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত