প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : অ্যাস্ট্রাজেনেকার চেয়ে ভ্যাকসিন তৈরির অভিজ্ঞতায় সেরাম ইনস্টিটিউট অনেক এগিয়ে

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : এ মাসের ২৩ তারিখ আমি দারুণ একটি এসএমএস পেয়েছি। প্রেরক বিএসএমএমইউর রেজিস্ট্রার কার্যালয়। ভ্যাকসিন মৈত্রীর মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘মেঘ না চাইতে জল’-এর মতো যে ২০ লাখ ডোজ কোভিড ভ্যাকসিন পেয়েছে, সেখান থেকে কপালে শিকা ছিড়তে যাচ্ছে আমারও। শুধু একটি ফিরতি টেক্সট পাঠানোর অপেক্ষা। ফ্রন্টলাইনার হিসেবে ভ্যাকসিন পেতে পৃথিবীর বেশির ভাগ উন্নত দেশের সমগোত্রীয়দের মতো আমাকে মাসের পর মাস প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে হচ্ছে না। জীবনে কোনো এসএমএস পেয়ে এতো বেশি আহ্লাদিত হয়েছি কি না মনে পড়ছে না। আমাকে যে ভ্যাকসিনটি দেওয়া হবে তা তৈরি করেছে বিশে^র বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া লিমিটেড। এরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক। বছরে দেড়শো কোটি ডোজ টিকা বানায়, আর বাংলাদেশ তো বটেই; বিশ্বজুড়ে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে যে ভ্যাকসিনগুলো ছোট ছোট বাচ্চাদের দেওয়া হয়, তার ৭০ শতাংশই আসে সেরাম ইনস্টিটিউটের পুনের কারখানা থেকে। অনেকের মতো ভ্যাকসিনটি নিয়ে আমার কিন্তু কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আমি বরং খুশি যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার নয়, আমাকে দেওয়া হবে সেরাম ইনস্টিটিউটের ভ্যাকসিন। কারণ অ্যাস্ট্রাজেনেকার চেয়ে ভ্যাকসিন তৈরির অভিজ্ঞতায় সেরাম ইনস্টিটিউট অনেক এগিয়ে। আর চিকিৎসক হিসেবে আমি খুব ভালোই বুঝি এই লাইনে অভিজ্ঞতার মূল্য কতখানি। তা ছাড়া ঔষধ প্রশাসনের ইমার্জেন্সি ইউজ অথোরাইজেশন কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে কোভিশিল্ডের জরুরি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছে, বাংলাদেশে এই ভ্যাকসিনটির অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া ৯ হাজার পৃষ্ঠার ডোশিয়ার ঘেঁটে দেখার।

অনেকে যুক্তি দেন কোভিশিল্ডের ট্রায়াল হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশেও। যুক্তি মন্দ না, তবে ওপথে হাঁটলে আজকের দিনটি এ দেশে আসত কমপক্ষে আরো ছয় মাস পর। দেশে দেশে মানুষের ভ্যাকসিন নেওয়ার সেলফি দেখেই হয়তো কেটে যেত আমাদের ২০২১। তা ছাড়া ওই কমিটিতে বসে কোভিশিল্ডের ভারতে এক হাজার ৭০০ মানুষের ওপর যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি হয়েছে তার খুঁটিনাটি আমরা খুঁটিয়ে দেখেছি। কাজেই কোভিশিল্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে আমার দুই সেকেন্ড সময় লাগেনি। আমার আরেকটা স্বস্তির জায়গা, আমি যে ভ্যাকসিনটি পাব তা ভারতের উপহার। ১৯৭১ সালে ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। আমার জন্ম ১৯৭০-এর শেষে। কাজেই বাঙালি আর ভারতীয়দের মিলিত রক্তধারায় যে বাংলাদেশের জন্ম, তার জঠর যন্ত্রণা বোঝার জ্ঞান আমার সেদিন ছিল না। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের আরেক ক্রান্তিলগ্নে ভারত আমাদের দুই আপার পাশে সেদিন না দাঁড়ালে আজকের বাংলাদেশ যে আমি পেতাম না, তা পাঁচ বছরের আমি সেদিন না বুঝলেও আজ খুব ভালোভাবেই বুঝি। এবার বাংলাদেশ যখন আবারও একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন ভারতের এই ভ্যাকসিন মৈত্রী যে কত বেশি তাৎপর্যবহ তা বোঝার মতো যোগ্যতা এখন আমার হয়েছে। আর সে কারণেই আমার স্বস্তিটা এত বেশি, কারণ আমিও এখন এই লিগাসির সরাসরি অংশীদার। বাংলাদেশের আরো প্রায় দেড় কোটি মানুষ পাবেন সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কিনে আনা কোভিশিল্ড। কোভিডে বিশ্বব্যাপী মৃত্যু আর বাণিজ্যের যে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা, সেখানে বাংলাদেশে কোভিশিল্ডের এই আমদানিতে বাণিজ্যের চেয়ে মানবিকতাই প্রবল। বাংলাদেশের মানুষ কোভিশিল্ড পাবে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। সরকারি উদ্যোগে আনা ভ্যাকসিন অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করে পাওয়া যাবে একটা টাকাও খরচ না করেই। ভ্যাকসিন কেনায়ও হয়নি কোনো নয়-ছয়। টাকা গেছে সরকারি কোষাগার থেকে সোজা সেরাম ইনস্টিটিউটের অ্যাকাউন্টে। বাংলাদেশে কোভিশিল্ডের দাম নিয়ে অনেকে অনেকভাবেই স্বচ্ছ জল ঘোলা করার চেষ্টা করছেন। পশ্চিমা দেশগুলো ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্টের জন্য যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আগেভাগে ইনভেস্ট করেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার আর মডার্নার মতো কোম্পানির পেছনে, সেখানে ভ্যাকসিন বাবদ বাংলাদেশ সরকারের আগাম ইনভেস্টমেন্ট সাকুল্যে ৫০ হাজার ডলার, তা-ও কোভ্যাক্স ইনেশিয়েটিভে, কোনো বিশেষ ওষুধ কোম্পানির পেছনে নয়। অ্যাস্ট্রাজেনেকা বা সেরাম ইনস্টিটিউটে চার আনা পয়সাও আগাম বিনিয়োগ না করেই এই যে বাংলাদেশ এত সস্তায় কোভিশিল্ড পাচ্ছে, তা-ও সম্ভব হচ্ছে শুধু বাংলাদেশ আর ভারতের রক্তের বন্ধনের জোরেই।

আসলে সত্যি বলতে কী, আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের যে গভীরতা, শুধু এই একটি মাত্র কারণেই আমরা পৃথিবীর বহু দেশের চেয়ে এতো আগে ভ্যাকসিনগুলো পেয়ে গেছি। ব্রাজিল সরকার সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনের পেছনে টাকা ঢেলে আর ট্রায়াল করে এখন মাথা চাপড়াচ্ছে। কারণ সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশের আশপাশে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট তাই এসওএস বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। একই দশা কানাডা আর ইউরোপের অনেক দেশেরই। আগেভাগে টাকা দিয়েও তারা এখন পাচ্ছে না ফাইজারের ভ্যাকসিন, অথচ ওই সব দেশে অনেক মানুষই এরই মধ্যে নিয়ে বসে আছেন ফাইজারের ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ। এখন কোথা থেকে আসবে সেকেন্ড ডোজ, তাই নিয়ে চলছে দৌড়ঝাঁপ। আসলে পৃথিবীর কোথাও ভ্যাকসিনের কোনো হাট বসেনি যে ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে গেলেই ভ্যাকসিন নিয়ে দেশে ফেরা যাবে। কোভিড নিয়ে আমার ভাবনাগুলো যতই জট পাকানো হোক না কেন, ভ্যাকসিন নিয়ে আমি খুব ফুরফুরে। এ নিয়ে আমার বোঝায় আর জানায় আমি কোনো জটিলতা দেখি না। বেজায় খুশি। এই আমার সবটুকু ভ্যাকসিন ভাবনা জুড়ে তাই শুধু ভ্যাকসিন মৈত্রী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বিএসএমএমইউ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত