প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্বে ধনী দরিদ্রের পার্থক্য কমছে, ব্লুমবার্গ প্রতিবেদন

রাশিদ রিয়াজ : আয়ের মধ্যে ধনী ও গরিবের বৈষম্য সবসময়েই সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কের বিষয়। একই সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে সর্বাধিক ভুল বোঝাবুঝিও রয়েছে। বছরের পর বছর বাম ধারার অর্থনীতিবিদরা এ বৈষম্যের কারণেই অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে বলে এর নিন্দা করছেন। কিন্তু এনিয়ে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে আয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য কমেছে। তবে কোভিড মহামারীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে সার্বিকভাবে উদ্বেগ বিরাজ করছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, অর্থনীতিতে নোবেল লরিয়েট জোসেফ স্টিগলিজ এবং জাতিসংঘ শঙ্কা প্রকাশ করছেন এ কারণে যে কোভিড মহামারীতে যে অর্থনৈতিক সংকট চলছে তা ধনী ও গরিবের ব্যবধানকে আরো প্রকট করে তুলবে। তাদের ধারণা ধনীদেশগুলোর পক্ষেই এ সংকট ভালভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

কিন্তু এ শঙ্কা বা ধারণা সঠিক নয়। প্রিন্সটন বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও নোবেল লরিয়েট অ্যাঙ্গাস ডেটন বলছেন অন্তত গতবছর ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্যের ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটবে। কারণ কোভিড মহামারী উচ্চ আয়ের অর্থনীতিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ধাক্কা দেওয়ায় ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য বরং কিছুটা কমেছে। ধনী দেশগুলোর তুলনায় গরিব দেশগুলো কোভিড মহামারীর মধ্যেও অথনীতির গতিকে বরং ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ধনীদেশগুলোতে গরিবের সঙ্গে বৈষম্যের ফারাকও বিরাট। দুর্ভাগ্যবশত এধরনের পার্থক্য কমে যাওয়া কোনো উদযাপনের মত বিষয় নয় যে তা হতাশাপূর্ণ কোভিড বছর শেষে আমরা উদযাপিত করতে পারি। কিন্তু ধনী দেশগুলো তাদের জনগণকে কোভিড থেকে রক্ষা বা অর্থনীতিকে সামাল দিতে যতটা পেরেছে তারচেয়ে বরং ভাল ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছে গরিব দেশগুলো। এই পার্থক্যই ধনী ও গরিবের বৈষম্য হ্রাস করার ব্যাপারে একটি ব্যবধান তৈরি করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গরিব দেশগুলোর তুলনায় করুণ পার্থক্যই তুলে ধরেছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও গণনীতি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম উন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু আয় ও গড় প্রবৃদ্ধির হার বেশি থাকায় বৈষম্য হ্রাসের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কোভিডে উন্নত দেশুগুলোর প্রবৃদ্ধি কমেছে, অর্থনৈতিক সংকট আরো প্রকট হয়েছে। কিন্তু মধ্যমেয়াদে বা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনে বৈষম্য হ্রাস পাওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না তা দেখার বিষয়।

তবে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত মনে করেন বৈষম্য অব্যাহতভাবেই বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে নিউ নরমাল তত্ত্বের কথা বলছেন সেও বৈষম্যের আগের অবস্থানেই ফিরে যাওয়া। কারণ সামরিক বাজেট কমেনি এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ অব্যাহত থাকছেই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের র‌্যানডম করপোরেশনের হিসেব অনুযায়ী গত ৪০ বছরে গরিব ও মধ্যবিত্তদের হাত থেকে সম্পদ ধনীদের হাতে চলে গিয়েছে ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার, কর ছাড়ের আওতায় আরো ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে ধনীরা এবং রেগুরেটরি মেকানিজমের আওতায় যে সম্পদ ধনীরা লুটে নিয়েছেন তা হিসেবের মধ্যেই আনা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া গত চার দশকে কম উন্নত দেশের শিক্ষা, আয়, সম্পদ ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য সাংঘাতিক বেড়েছে।

এদিকে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে লক্ষণীয়ভাবে ডেটন দেখতে পেয়েছেন যে উচ্চ মাথা পিছু আয়ের দেশগুলোতে কোভিডে মৃত্যু হার ব্যাপক হওয়ায় তাদের ভুগতে হয়েছে বেশি। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমানও রয়েছে বেশি। এই ফলাফল এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর তরুণদের মধ্যে ধনীদেশগুলোর প্রতিপক্ষকে অতিক্রমের এক ধারা সৃষ্টি করতে সাহায্য করতে পারে। একই ফলাফল পাল্টে যেতে পারে টিকাদান কর্মসূচির বৈষম্যে। এ বৈষম্য মানে ধনীদেশগুলো তাদের জনগণের জন্যে যত দ্রুততার সঙ্গে পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা করে তা দিতে শুরু করেছে তার তুলনায় গরিব দেশগুলো এখনো টিকাদান কর্মসূচি শুরুই করতে পারেনি। তারপরও কোভিডে ব্যাপক মৃত্যুহার একটা বিরাট পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সুইডেনের মত দেশগুলোতে। এবং এধরনের দেশগুলোতে এখনো কোভিড সংক্রমণের হার উঁচুতে রয়েছে।

ডেটনের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যেসব দেশ মহামারীতে অর্থনীতিকে রক্ষার জন্যে লকডাউন আরোপে গড়িমসি করেছে তারা বেশি লাভবান হতে পারেনি। যেসব দেশে কোভিডে মৃত্যু হার বেশি সেসব দেশে জিডিপি হ্রাসও পেয়েছে বেশি। আইএমএফ’র হিসেবেও এটি ধরা পড়েছে। বিশে^ বৈষম্য হ্রাসের এই ধারা লক্ষ্য করা যায় ২০০৭ সাল থেকে। তবে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গত বছর কোভিড মহামারীর আগেই। বিভিন্ন দেশের বসতির মধ্যে খেয়াল করলে দেখা যায় বৈষম্য কিছুটা বাড়ছে ধীরগতিতে। তার মানে এই নয় যে বিশ^ অনেক বেশি বৈষম্যহীন হয়ে উঠছে বিশেষত তা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে মহামারিতে দেখা গেছে উচ্চ আয়ের মানুষের চেয়ে বরং কম আয়ের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেশি। সুইডেনে বরং ধনী লোকের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটির দুর্বল আর্থিক নীতির কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন খাতের কাজের ধরনের ক্ষেত্রে যে পার্থক্য রয়েছে তা বৈষম্য বৃদ্ধি বা হ্রাসের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। যেমন পর্যটন খাতে যারা কাজ করে তারা মহামারীতে নিজেদের কাজ অব্যাহত রাখতে না পারলেও লকডাউনে ঘরে বসে যারা কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তারা তাদের আয় অব্যাহত রাখতে পেরেছেন। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল বিশে^র উন্নতি বিবেচনার সময় একক কোনো দেশের উন্নয়ন বিবেচনাও জরুরি। ধনীদেশগুলোর তুলনায় কম উন্নতদেশগুলোতে আয় কম হ্রাস পেলেও তা অধিক বেদনাদায়ক কারণ কম আয়ের দেশগুলোতে জনসংখ্যার অনেক বেশি অংশ দারিদ্র সীমার কাছাকাছি বাস করে। বিশ^ব্যাংক শঙ্কা করছে মহামারীতে ৮৮ থেকে ১১৫ মিলিয়ন মানুষ গত বছর চরম দারিদ্র সীমায় নেমেছে। এছাড়া মহামারীর কারণে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্র সম্পূর্ণ পেতে সময় লাগবে। বিশেষ করে যেসব দেশে গরিব ছেলেমেয়েগুলো স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে থেকেছে তাদের আরো বেশি ক্ষতির মুখ পড়তে হয়েছে। ডেটনের প্রতিবেদন অনুযায়ী মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরুপণের আগে পরিসংখ্যানগুলোকে আরো ভালোভাবে বিবেচনা করা জরুরি। মানবদেহের মতই কোভিড মহামারী বিশ^অর্থনীতিতে আরো বিস্ময়করভাবে আঘাত করেছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত