প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘বিদ্রোহ’ এবং ‘দেশদ্রোহ’ নিয়ে সৈনিকদের সতর্ক করেছেন মার্কিন কমান্ডাররা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সবসময় রাজনীতি এড়িয়ে চলে। রাজনীতির গন্ধ থাকলে তা নিয়ে সাধারণত তারা মুখ খোলেনা। কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল ভবনে হামলার সাথে বেশ ক’জন সাবেক এবং কর্মরত সেনা সদস্য জড়িত থাকার অভিযোগ উঠতে থাকায়, সেনা নেতৃত্ব স্পষ্টতই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে পেন্টাগনের ওপর চাপও তৈরি হয়েছে।

ফলে, ৬ই জানুয়ারির সেই নজিরবিহীন তাণ্ডবের এক সপ্তাহ পর মঙ্গলবার ঐ ঘটনা নিয়ে স্থল, নৌ এবং বিমান বাহিনীসহ মার্কিন সেনাবাহিনীর সব শাখার শীর্ষ কমান্ডাররা যৌথভাবে সব সেনা সদস্যদের প্রতি এক বার্তা পাঠিয়েছেন।

যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলিসহ সাতজন শীর্ষ জেনারেল এবং একজন অ্যাডমিরালের সই করা ঐ বার্তা বা বিবৃতিটি সৈনিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া তা প্রকাশ করেছে।

বার্তায় সেনা নেতৃত্ব বলেছেন, ক্যাপিটল ভবনে হামলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এবং সংবিধানের ওপর ‘সরাসরি হামলা’, এবং সেনাবাহিনী দেশের ‘সংবিধান রক্ষায় সবসময় প্রস্তুত।’

‘ওয়াশিংটন ডিসিতে ৬ জানুয়ারির সহিংস দাঙ্গা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, ক্যাপিটল ভবন এবং আমাদের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি হামলা।’

‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জমায়েতের অধিকার কাউকে সহিংসতা, দেশদ্রোহিতা এবং বিদ্রোহের অধিকার দেয়না।’

কমান্ডাররা সৈনিকদের বলেছেন, ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবেন জো বাইডেন এবং তিনি সেনাবাহিনীর নতুন কম্যান্ডার-ইন-চিফ হবেন। ‘সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির কোনো চেষ্টা আমাদের (সেনাবাহিনীর) মূল্যবোধ, রীতি এবং শপথের খেলাপ, এবং বেআইনি।’

সেনা নেতৃত্বের ওপর চাপ

ওয়াশিংটনের ঘটনা নিয়ে সারা বিশ্ব জুড়ে বিস্ময়,উদ্বেগ প্রকাশ করা হরেও জেনারেল লি একদম চুপ ছিলেন। তবে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে হামলার সাথে বেশ কজন সাবেক এবং কর্মরত সেনা সদস্যের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর পেন্টাগনের ওপর চাপ বাড়ছে।

এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য গতকাল (মঙ্গলবার) প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট সেনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থ পেন্টাগনের প্রতি আহ্বান জানান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ক্রিস মিলারকে লেখা এক চিঠিতে সেনেটর ডাকওয়ার্থ বলেন, ‘ অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে সেনাবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ যে অংশ গর্বের সাথে দেশকে সেবা করছেন এবং সেনাবাহিনীর মূল্যবোধ ধরে রাখছেন তাদের প্রতি চরম অসম্মান করা হবে।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ঐ ঘটনা নিয়ে অনেক সেনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। এমনকি তাদের অনেকে এমন উদ্বেগও প্রকাশ করেন যে ৬ জানুয়ারির নজিরবিহীন ঘটনার পর কমান্ডাররা কোনো দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন না।

যেমন, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার টুইট করেন, ৬ জানুয়ারির ঘটনা ছির “বিদ্রোহের অপচেষ্টা।“জেনারেল রবার্ট অ্যাব্রামস বলেন, “আপনি যদি ইউনিফর্ম পরা সৈন্য হন এবং ঐ ঘটনাকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে আমি আপনাদের অনুরোধ করবো বসে ঠান্ডা মাথায় সংবিধানটি খুলে পড়ুন – যে সংবিধান রক্ষার জন্য আপনি শপথ নিয়েছেন।“

‘হামলাকারীদের মধ্যে সেনাবাহিনীর লোক ছিল’
ক্যাপিটল ভবনে ঐ তাণ্ডবের পর সেনাবাহিনীর মধ্যে কট্টর মতবাদের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে হামলাকারীদের অনেকেই সেনাবাহিনীর সাবেক সৈনিক ছিলেন।

অনেক মিডিয়া এমন কথাও বলছে – হামলায় অংশ নেওয়া মানুষদের কেউ কেউ এখনও সেনাবাহিনী এবং পুলিশে কাজ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের টিভি নেটওয়ার্ক সিবিএস খবর দিয়েছে, নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে একদল ট্রাম্প সমর্থককে নেতৃত্ব দিয়ে ওয়াশিংটনে আসার জন্য সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন র‌্যাংকের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী তদন্ত শুরু করেছে।

এমিলি রেইনি নামে ঐ সেনা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, সেনাবাহিনীর নিয়মনীতি মেনেই তিনি ওয়াশিংটনে জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন এবং তার সাথের লোকজন কোনো সহিংসতায় অংশ নেননি।

পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সিবিএস বলছে, নর্থ ক্যারোলাইনার পোর্ট ব্রাগ থকে কতজন সৈনিক ক্যাপ্টেন রেইনির সাথে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনী তা তদন্ত করছে। জানা গেছে, ক্যাপ্টেন রেইনি পদত্যাগ করেছেন।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রয়টর্সকে জানানো হয়েছে ৬ জানুয়ারির হামলার সাথে কোনো সেনা সদস্য যুক্ত ছিলেন কিনা তা বের করতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সাথে সেনাবাহিনী কাজ করছে।

এমনকি, ন্যাশনাল গার্ডের যে ১০,০০০ সদস্য ২০ জানুয়ারি জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন তাদের অতীত কর্মকাণ্ড পরীক্ষার প্রয়োজন কিনা – তা নিয়ে এফবিআইয়ের সাথে সেনা নেতৃত্ব কথা বলছেন।

‘সেনাবাহিনীর মধ্যে কট্টর ডানপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী লোকজন রয়েছে’
ক্তরাষ্ট্রের সেনা নেতৃত্ব বিরল এই বার্তা এমন সময় দিলেন যখন এফবিআই সতর্ক করছে যে ২০ জানুয়ারি জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান পণ্ড করতে ওয়াশিংটন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী শহরে সশস্ত্র তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সপ্তাহে ক্যাপিটলে হামলা এবং তাণ্ডবে নিশ্চিতভাবে বেশ কজন অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকুরিরত সেনা সদস্যের অংশগ্রহণ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে সেনাবাহিনীর মধ্যে কট্টর ডানপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী লোকজন রয়েছে – যারা বিশ্বাস করে যে নভেম্বরের নির্বাচনে কারচুপি করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারানো হয়েছে।

সেনাবাহিনীর মধ্যে এ ধরণের লোকজনের উপস্থিতি নতুন না হলেও, ক্যাপিটলে হামলার ঘটনায় সেনাবাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু লোকজনের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণে উদ্বিগ্ন সেনা নেতৃত্ব স্পষ্ট একটি বার্তা দেওয়া জরুরী বলে মনে করেছেন।

নিজেদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাস থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে অ-রাজনৈতিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাখতে সবসময় সচেষ্ট।

সিএনএনের পেন্টাগন সংবাদাদাতা বারবারা স্টার বলছেন সেনা কমান্ডাররা তখনই একযোগে কোনো কথা বলেন যখন মারাত্মক কোনো ঘটনা হাজির হয়। বারবারা স্টার তার এই টুইটে বলেন, ‘কখন কথা বলতে হবে সে ব্যাপারে তারা (সেনা নেতৃত্ব) দক্ষ একটি রাজনৈতিক রেডার অনুসরণ করেন।’ ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনাকে সেনা নেতৃত্ব তেমন একটি মারাত্মক ঘটনা হিসাবেই বিবেচনা করছে।

যেমন, ২০১৭ সালে শার্লটভিলে কট্টর ডানপন্থীদের এক জমায়েতে অংশ নেওয়া লোকজনকে যখন প্রেসিডেন্ট যখন “খুব ভালো মানুষ“ বলে বর্ণনা করেন, পরপরই যৌথ সেনা নেতৃত্ব বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

জেনারেল মিলি, যিনি তখন সেনা প্রধান ছিলেন, বলেছিলেন, “সেনাবাহিনী কখনেই তাদের প্রতিষ্ঠানে বর্ণবাদ, কট্টরবাদ এবং ঘৃণা সহ্য করেনা। ১৭৭৫ থেকে সেনাবাহিনী যে মূল্যবোধ রক্ষায় তৎপর এসব আচরণ তার পরিপন্থী।“

মঙ্গলবারের বিরল এই যৌথ বার্তার ভেতর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নেতৃত্ব হয়তো পরিষ্কার করতে চাইছেন যে জোর করে গণতন্ত্রকে খাটো করার কোনো চেষ্টা তারা বরদাস্ত করবে না। সূত্র: বিবিসি বাংলা

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত