প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সড়কে অভিনেত্রী আশার মৃত্যু,
১২৫ মিনিটের জট খুলছে না

ডেস্ক রিপোর্ট: অভিনেত্রী আশা চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে। সিসি ক্যামেরার দু’টি ফুটেজে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে ট্রাকের ধাক্কায় এই অভিনেত্রীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু রহস্য দেখা দিয়েছে রাত ১১টা ১৫ মিনিট থেকে রাত ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা সময়ের। এই সময়টা তারা কোথায় ছিলেন, কেন ছিলেন- এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। কেনইবা তারা রুট পরিবর্তন করে টেকনিক্যাল সড়কের দিকে এসেছিলেন। কারণ বনানী থেকে কালশী হয়ে রাত ১২টার ভেতরেই তাদের ফেরার কথা ছিল রূপনগরের বাসায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানতে পেরেছে ওই রাতে চিকেন ফ্রাই কিনতে মিরপুর ও আশেপাশের এলাকায় তারা ঘুরেছিলেন। চিকেন ফ্রাই কিনতে তারা শ্যামলী পর্যন্ত গিয়েছিলেন।
ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ ঘাতক ওই ট্রাক ও চালককে শনাক্ত করতে পারেনি। এদিকে আশার পরিবারও প্রথমে এই ঘটনায় মামলা করতে চায়নি। মামলা না করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তারা মরদেহ নিতে চেয়েছিলেন। পরে পুলিশের পরামর্শে তারা মামলা করেছেন। আশাকে বহনকারী মোটরসাইকেল চালক শামীম আহমেদের বিভ্রান্তিকর তথ্যে পুলিশ ও তার পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হচ্ছে। শামীম একেকবার একেক তথ্য দিয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে আশার সর্বশেষ কথা ও মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগ পর্যন্ত সময়টায় কি ঘটেছিল সেটিকে ঘিরেই তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে সেটিকে ঠিকঠাক তথ্য হিসেবে তারা নিচ্ছেন না। এসব তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। শামীম পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই রাতে বনানী থেকে রওয়ানা হয়ে তারা কালশী হয়ে মিরপুর-১২, মিরপুর-১, শিয়ালবাড়ি, মিরপুর-৬ প্রশিকার অফিসের দিকে ঘুরেছেন। তারপর তারা শ্যামলী পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আর এসব ঘুরাঘুরির মূল উদ্দেশ্য ছিল আশার জন্য সিপি চিকেন ফ্রাই কেনা। গভীর রাতে দোকান খোলা না পেয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তারা ঘুরেছেন। মাঝে মিরপুরের একটি জায়গায় তারা চা পান করেন।

পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে এসএসসি পাস করে এইচএসসিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আশা ৬/৭ বছর আগে মিরপুর বাঙলা কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানে শামীম আহমেদ নামের এক সিনিয়র শিক্ষার্থী তাকে ভর্তি হতে সহযোগিতা করেছিলেন। ওই সময় আশার বড় ভাই পানিতে পড়ে মারা যান। তারপর থেকে শামীমের সঙ্গে আশার পরিবারের সখ্যতা গড়ে উঠে। একমাত্র ছেলে অকালে মারা যাওয়াতে আশার পরিবার শামীমকে ছেলে হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তারপর থেকে শামীম নিয়মিত আশাদের বাসায় আসা-যাওয়া করতেন। আশার প্রয়োজনে তাকে বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলে নিয়ে যেতেন। শুটিং স্পট থেকে শুরু করে বই কেনার জন্য নীলক্ষেত, ইডেন কলেজসহ অন্যান্য স্থানে। আশার পরিবার দাবি করছে- এর আগে শামীম আশাকে নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরেনি।

ঘটনার দিন সকালে ইডেন কলেজে একটি পরীক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে আশা সকাল আটটায় বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে দুপুর ২টার দিকে তিনি তার মা পারভিন আক্তারকে ফোন দিয়েছিলেন। তখন জানিয়েছিলেন পরীক্ষা শেষ হয়েছে এখন কোনো একটি অফিসে যাবেন। কারণ তার মা জানেন প্রায়ই সে নাটক নির্মাতাদের অফিসে যাতায়াত করতেন। দুপুর ২টার পর রাত ১১টা ১৫ মিনিটে আশার সঙ্গে তার মায়ের সর্বশেষ কথা হয়। ওই সময় তিনি তার মাকে জানিয়েছিলেন বাড়ির কাজের বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে। বাড়ির কাজ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। শামীমের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বাসায় চলে আসবেন। ওই সময় শামীমও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। শামীম আশার মাকে বলেছিলেন, আপনার মেয়ে যেভাবে বলে সেভাবে কাজ করেন তাহলে ভালো হবে। তার কিছুক্ষণ পর আশার বাবা আবুল কালামও মেয়ের সঙ্গে বাড়ির কাজের বিষয়ে কথা বলেন। যদিও সন্ধ্যার দিকে আবুল কালাম মেয়ে কোথায় আছে, খাওয়া-দাওয়া করেছে কিনা সে বিষয়ে কথা বলেছেন। তারপর আশার মা ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে শামীমের ফোনে ঘুম ভাঙে আশার মা পারভিন আক্তারের। তখন শামীম পারভিন আক্তারকে বলেছিলেন টেকনিক্যালে যাবার জন্য। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে শামীম বলেছিলেন আশা আর নেই। অজ্ঞাত একটি ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

পুলিশ বলছে, মূল তদন্তটা দুর্ঘটনার আগের দুই ঘণ্টা নিয়ে। ওই সময়টা কি হয়েছিল? বনানী থেকে তারা দেরি করে রওয়ানা দিয়েছিলেন কিনা। মিরপুরের কোথায় তারা চা খেয়েছিলেন, চিকেন ফ্রাই কিনতে শ্যামলীর কোন হোটেলে গিয়েছিলেন। ওই হোটেল অথবা আশেপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ। শামীম ওই রাতে বেপরোয়া ড্রাইভ বা অসৎ উদ্দেশ্য নেশা জাতীয় কিছু খাইয়েছিলেন কিনা। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসল রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা কাজ করছেন।

দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি শ্যামলীর কোনো এক হোটেলে তারা রাতের বেলা খেয়েছেন। তবে ঠিক কোন সময়ে বনানী থেকে রওয়ানা হয়েছেন সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ, নেশা জাতীয় কিছু আশাকে খাওয়ানো হয়েছে কিনা? এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করছি। রিপোর্ট আসলে বোঝা যাবে নেশাজাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছে কিনা। আপাতদৃষ্টিতে আমরা মনে করছি এটি সড়ক দুর্ঘটনা। বাদীও সেভাবে অভিযোগ করেছে। শামীমের দায় ও তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, যদি কেউ বেপরোয়া ড্রাইভ করে তাহলে সে অন্যকেও মারতে পারে, নিজেও মরতে পারে। আশার পরিবারও অভিযোগ করেছে শামীম বেপরোয়া ড্রাইভ করেছে- এজন্য তার মেয়ে দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে। তদন্তে কার কতটুকু দায় সেটি বের হয়ে আসবে। শামীম তাদের কাছে বলেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়ই আশা মারা গেছেন। তিনি বলেন, আশার পরিবার মামলা করতে চায়নি। ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নিতে চেয়েছিল। বিভিন্নভাবে তারা মামলা না করার জন্য তদবির করেছে। একমাত্র আমার কারণেই তারা মামলা করেছে।

আশার মা পারভিন আক্তার বলেন, শামীমকে সন্দেহ করছি না। বহু বছর ধরে তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। আর ভিডিওতে ঘটনা স্পষ্ট দেখা গেছে, ট্রাকের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়েছে। তবে আমাদের কথা হলো ২ ঘণ্টা তারা কোথায় ছিল? শামীম সেটা ভালোভাবে বলতে পারছে না। যে ট্রাক তাদের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছে সেই ট্রাকটাও ধরা যায়নি। ২ ঘণ্টার কি ব্যাখ্যা শামীম দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শামীম আমাদেরকে বলছে তার দুজন মিলে ঘুরেছে। আবার বলছে কিছু মনে করতে পারছি না। হয়তো তার সামনে দুর্ঘটনাটি ঘটার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, গাজীপুরের বোর্ডবাজারে আমাদের একটি জমি আছে। সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের। আশা বলেছিল বাড়ি করলে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শে বাড়ি করার জন্য। না হলে বাড়ির কাজ সুন্দর হয় না। বিভিন্ন কারণে বাড়ি ভাঙা পড়তে পারে। রাত ১১টার পরে তার সঙ্গে আমার এটি সর্বশেষ কথা ছিল। তখন বলেছিল শামীমের সঙ্গে সে কিছুক্ষণের ভেতরে বাসায় ফিরছে। আমরা শামীমের শাস্তি চাই না। কারণ কখনও আমরা তাকে খারাপ দেখিনি। শুধু ২ ঘণ্টা কি হয়েছিল সেটা জানার জন্য মামলা দিয়েছি।
পেশায় আইনজীবী শামীমের বাড়ি যশোরে। কল্যাণপুরের একটি বাসায় ভাগ্নের সঙ্গে ব্যাচেলর হিসেবে থাকতেন। তার স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে থাকেন। সূত্র: যায় যায় দিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত