প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: একজন রিকশাচালক রশীদকে খুঁজছি

স্বপ্না রেজা: রিকশাচালক রশীদ। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। ঢাকা শহর পুরোটা চেনেনি এখনো। শরীয়তপুর তাঁর আসল ঠিকানা। নদী ভাঙনে তাঁর ঠিকানা বদল হয়েছে। নতুন ঠিকানা কল্যাণপুর বস্তি। নদীতে যে ঠিকানা বিলীন হয়েছে সেখানে তাঁর তিনখানা ঘর ছিল। দুই মেয়ে শ^শুরবাড়ি থেকে বেড়াতে এলে দুই ঘরে থাকতো। আর এক ঘরে সে ও তার স্ত্রী। জমি ছিল। জমিতে ধান ছিল। গোয়ালে দুটো গরু। এসব দিয়ে সংসার ভালো চলতো। নদী ভাঙন তাঁকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। এখন কল্যাণপুর বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আছে সে। সাথে স্ত্রী। দুই মেয়েকে বেড়াতে আসতে বলার কোন সুযোগ নেই তাঁর এখন।

করোনার ভেতর নদী ভাঙন যন্ত্রণার ভেতর আর এক যন্ত্রণা। অসহায়ত্বের আরও এক করুন আর্তনাদ। কে শুনতে পেয়েছে তা কতটা। চোখ মুছে বললেন, অন্য দেশ থেকে এসে রোহিঙ্গারা সম্মান পেয়েছে, ঘর পাইছে। ভাসানচরে দালানে উঠছে। কী সুন্দর ঘর সব। ওরা এদেশের কেউ না। অথচ ওদের কতো সম্মান। ওরা সব পায়। দুধ, ঔষধ আরও কত কী। আমরা কী পাই ? করোনার ভেতর নদী ভাঙন। তারপর আবার ঝড়।

রিকশাচালক রশীদ কথা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। টিভিতে ভাসানচরের সংবাদ দেখেছিলাম। হয়ত আমার মতো সেও টিভি কিংবা পত্রিকায় ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থলের ছবি দেখেছেন। কিংবা কারোর মুখে সেই গল্প শুনেছেন, শুনে চোখের পানি ফেলেছেন। কক্সবাজারে যেভাবে সরকার, এনজিও ও আইএনজিও রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবা দিতে প্রতিনিয়ত ছুঁটে যাচ্ছে তাতে রশীদের মতো রিকশাচালকের চোখের জল পড়বার বিষয়টি অমূলক নয়। খুব স্বাভাবিক। রশীদ জানতে চেয়েছিলেন, রোহিঙ্গারা তার চাইতেও বেশি সেবা পাচ্ছেন কী কারণে। জবাবটা আমি সঠিকভাবে দিতে পারিনি। আদতে পরিস্কার জবাব আমার কাছেও নেই। সংশ্লিষ্টরা ভালো জানেন। শুরুতে অনেকেই এমন অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বড় করবার জন্য রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা দেখানো হয়েছে। মানবিক হতে হয়েছে। বিশ^ দরবারে মানবতার বড় একটা জায়গা সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এ কারণে বাংলাদেশ বিশ^ দরবারে বেশ প্রসংশিতও হয়েছে। মানবতার উদার পরিচয়ে বাংলাদেশ একটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু আদতে কী হয়েছে বাংলাদেশের, এই বিশ্লেষণ করলে কী বেরিয়ে আসে বা আসবে সেটাও সংশ্লিষ্টরা ভালো জানেন। তবে আমার সীমিত বুদ্ধিতে বলে, এটা আদতে বাংলাদেশের উপর একটা বোঝা। যে বোঝার ভার ক্রমশ বাড়বে বৈ কমবে না এবং যে বোঝা একদিন হয়ত দেশের শৃংখলা ভঙ্গের, সংস্কৃতি বিনষ্টের একটা মস্ত কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের প্রভাব সংক্রান্ত একটা গবেষনা জরুরি। দেখা দরকার ভালমন্দ কতটা সুদূরপ্রসারী এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে কতটা সহনীয়।

রোহিঙ্গারা তাদের দেশ থেকে যে বীভৎস অভিজ্ঞতা সাথে নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার একটা প্রভাব যে বাংলাদেশে পড়বে না, এমন ধারনা না করাটা রীতিমতন ছিল বোকামী। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈকি। তাদের নিয়ে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, অবৈধভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ, উশৃংখল জীবনযাপনের অনেক অভিযোগ উঠে এসেছে। বিপথগামী রোহিঙ্গা কিশোর ও যুবকরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটে গেছে। তাদের সংস্পর্শে এসে যে বাংলাদেশের কিশোর, যুবকেরা বিপথগামী হবে না, হচ্ছে না সেটা কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায় না। সামাজিক অবক্ষয়ে নতুন মাত্রা যোগ হবার পথ কিন্তু ইতিমধ্যে এতে তৈরি হয়েছে, এটা কেউ স্বীকার করুন আর নাই-ই করুন।

যাইহোক, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুর্যোগে প্রতিবছর কতজন মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হন, সেই হিসেব করলে সংখ্যাটা নেহায়েত কম হবে না। দেখা যায় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ মূখ্য হয়ে ওঠে। অথচ এটা স্থায়ী কোন পথ বা ব্যবস্থা নয় দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করবার জন্য। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে গড়িমসি, নিয়মিত বাঁধ সংস্কারে অবহেলা, বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি এমন অভিয়োগ প্রতিটি নদী ভাঙন ও বন্যায় উঠে আসে। কর্তৃপক্ষরা ক্ষতিগ্রস্থ ও মিডিয়াকে বলেন, স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে। অথচ কথা পরের বছরের জন্য তোলা হয়ে থাকে।

রশীদ কল্যানপুর বস্তিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছেন। ঘরের কোন জানালা নেই, বারান্দা নেই। এটাচড বাথরুম নেই। একটা দরজা আছে যেখান দিয়ে ঘরে ঢোকেন আর বের হন। এরই মাঝে কবে যেন আগুন লেগেছিল সেই গল্প বস্তির মানুষের কাছে শুনেছেন। ভয় ঠাঁই নিয়েছে মনে কখন না জানি পুড়ে যেতে হয়। বস্তিতে তাঁর মতো অনেকেই ঠাঁই নিয়েছে। বেঁচে থাকার তাড়া খুবই নির্মম। সকালে বের হন রিকশা নিয়ে। ফেরেন রাতে। রিকশার মালিককে জমা দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে দুটো পেট চলে কোনরকম।

বাংলাদেশে ঠাঁই নেয়া কোন রোহিঙ্গার সাথে আমার এই পর্যন্ত কথা হয়নি। রিকশাচালক রশীদের মতন তার কোন অস্বস্তি, কষ্ট, দুঃখবেদনা আছে কিনা জানি না। রোহিঙ্গাদের সুন্দরভাবে আশ্রয় দেবার মানসিকতা, জনগণের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বড় বড় উড়ালসেতু, অত্যাধুনিক নগরের জন্য বড় বড় স্থাপনা ইত্যাদির মাঝে বাংলাদেশের বিজয়ের উনপঞ্চাশ বছরে রিকশাচালক রশীদ কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, তা স্পষ্ট দেখা গেলো না।

স্পষ্ট হওয়া দরকার বৈকি।

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত