প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এনটিআরসিএ তিন বছরে একজন শিক্ষকও নিয়োগ দিতে পারেনি

পূর্বপশ্চিম: থমকে গেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ। প্রতি বছরই সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও গেল তিন বছরে একজন শিক্ষকও নিয়োগ দিতে পারেনি তারা।

যেখানে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্যপদে লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা সেখানে কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতার অভাব ও মামলা জটিলতায় কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না এ প্রতিষ্ঠান। এমনকি ১৩তম ব্যাচের চাকরি প্রার্থীদের করা মামলার রায় আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্তভাবে দিলে মামলার সংখ্যা আরো বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আকরাম হোসেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যাচের করা চার শতাধিক মামলা থেকে মুক্তির কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেও কোনো কাজ হচ্ছে না বলেও জানান চেয়ারম্যান। ফলে একরকম অকার্যকর হতে চলেছে সরকারের এ প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে নেওয়া এনটিআরসিএ’র ১৩তম শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ চাকরি প্রার্থীর মধ্যে থেকে শূন্যপদের অনুকূলে ১৭ হাজার ২৫৪ শিক্ষার্থীকে পিএসসির আদলে তিন ধাপে পরীক্ষা নিয়ে বাছাই করে এ প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও তার দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছিলেন, এনটিআরসিএ’র পরীক্ষায় চাহিদা অনুযায়ী ১৫ হাজার চাকরি প্রার্থীকে বাছাই করে স্কুলের নাম উল্লেখ করে তালিকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি শুধু তাদের যুক্ত করে নেবে। এর বাইরে তাদের আর কোনো কাজ নেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে জটিলতা তৈরি করে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে ৮০% নিয়োগ পাওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে এই ৮০ শতাংশের মধ্যে যারা যোগদান করতে পারবে না সেই সংখ্যক পদে পরবর্তী ২০ শতাংশের মধ্যে থেকে উত্তীর্ণদের ওই পদে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে সুপারিশ করা হবে। কিন্তু এ নিয়ম অনুসরণ না করেই পরবর্তী সময়ে ১৪তম ব্যাচের পরীক্ষা নিয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার সুযোগে ২০১৭ সালে এক দফা শিক্ষক নিয়োগ দেয় এনটিআরসিএ। এরপর থেকে এ পর্যন্ত আর কোনো শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত করতে পারেনি এ প্রতিষ্ঠান।

এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যান মো. আকরাম হোসেন বলেন, কীভাবে কাজ করবো? শুধু ঢাকাতেই চার শতাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলো আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার মধ্য থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে এমন মামলার মুখোমুখি কেন এনটিআরসিএ? এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, মামলা করার জন্য একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এদের মূল কাজ হচ্ছে মামলা তৈরি করা। চাকরি প্রার্থীদের নানাভাবে উসকে দিচ্ছে এ সিন্ডিকেট। ঠুনকো বিষয়ে আদালতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এসব চাকরি প্রার্থীকে। এসব গ্রাম পর্যায়ের সাধারণ সহজ-সরল চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত তারা নিচ্ছে। আর এ টাকা দিয়ে কতিপয় আইনজীবী ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছে। এর বিরুদ্ধে এনটিআরসিএ’র কিছু করার আছে? এমন প্রশ্নও করেন সংস্থার চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, একদিকে মামলা করছে, অপরদিকে তারা চাঁদা আদায় করছে। এভাবে তারা (আইনজীবীরা) কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছে। এসব চাকরি প্রার্থীর মধ্যে কেউ আমাকে ফোন করলে আমি অনেককেই ধমক দিয়ে বলেছি তারা কেন এমন প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়া কী হবে তা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করার পরও যথাযথ প্রক্রিয়ায় ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চাকরিতে নিয়োগ না দেওয়ার কারণেই এই মামলার প্রচলন শুরু হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এনটিআরসিএ’র সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মু. আবদুল আউয়াল হাওলাদার (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, শুধু একটা ব্যাচের বিপরীতে কোনো প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। যৌথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে সেখানে নির্দেশনা ছিল। এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৩৪ হাজার শিক্ষার্থী এনটিআরসিএ থেকে পাস করেছে। যদিও এর মধ্যে অনেকের নিয়োগ হয়েছে। কোর্টের রায় অনুযায়ী কম্বাইন্ড মেরিট লিস্ট তৈরি করতে হবে। সেখান থেকে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ১৩তম একটি মাত্র ব্যাচ। যেহেতু কোর্টের রায়ে কম্বাইন্ড মেরিট লিস্ট তৈরি করতে বলা হয়েছে, তাই শুধু ১৩তম ব্যাচের চাকরি প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে গেলে রায়ের সঙ্গে কনফ্লিক্ট তৈরি করে। ফলে এখন কম্বাইন্ড মেরিট লিস্টের মধ্যে সবাই প্রবেশ করেছে। এ জন্য আমরা রিভিউতে বলেছি একটি ব্যাচকে নিয়োগ দিলে বাকিরা মামলা করতে কোর্টে যাবে। এটা কি আদালত খেয়াল করেছেন?

এক্ষেত্রে আদালতের রিভিউয়ে যদি পূর্ববর্তী রায় বহাল রাখে সে ক্ষেত্রে আপনাদের করণীয় কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তখন আমাদের স্ট্রাকচারালি অন্য চিন্তা করতে হবে। আমাদের ভেবে দেখতে হবে কোনো উপায়ে এটার সমাধান করা যায়। তবে কোর্ট যা বলে সেটা তো মানতেই হবে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও পঞ্চাশের অধিক মামলা তৈরি হবে। এ সময় এনটিআরসিএ’র বর্তমান চেয়ারম্যান বলেন, এভাবে মামলা তৈরি হতে থাকবে সেখানে আমাদের করার কী? আমরা চাকরি করছি বেতন পাচ্ছি। লাখ লাখ সাধারণ চাকরি প্রার্থী চাকরি পাচ্ছে না, সোজা কথা, এটা সাধারণ হিসাব।

তিনি বলেন, এসব মামলা মোকদ্দমা না থাকলে মুজিববর্ষকে লক্ষ্য করে এই মুহূর্তে আমরা এক লক্ষাধিক চাকরি প্রার্থীকে চাকরি দিতে পারতাম। মামলা জটিলতা না থাকলে পাস করা এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে থেকে এক লাখ আবেদনকারীকে চাকরি দেওয়া যেত। বাংলাদেশে এমন কোনো সংস্থা নেই যে তারা একই সময়ে এ সংখ্যক চাকরি প্রার্থীকে চাকরি দেবে।

এ অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে আক্ষেপ প্রকাশ করে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান মো. আকরাম হোসেন বলেন, কীভাবে সম্ভব? আদালত কি আমাদের কথা শোনে?

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অসম্ভব। তাহলে এমন অচলাবস্থা কতদিন চলবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কী করার আছে? এটাই সিস্টেম। এখানে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

এনটিআরসির এখনকার অচলাবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে আপনারা অবহিত করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো মন্ত্রণালয় করবে, আমরা তো জানিয়েছি মন্ত্রণালয়কে। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনারা তুলে ধরবেন। এটা আপনাদের কাজ। আমরা মন্ত্রীকে অবহিত করেছি।

এ বিষয়ে কথা হয় এনটিআরসিএর দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশিদ আমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কম্বাইন্ড লিস্ট করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়াও আমরা অ্যাপিলেট (আদালতে) বিভাগে রিভিউ করেছি, অ্যাপেলেট ডিভিশন থেকে চূড়ান্ত রায়ের উপর নির্ভর করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। দেখুন এখানে একটি কম্বাইন্ড লিস্ট করতে বলা হচ্ছে। একটা গ্রুপ হচ্ছে লিখিত পরীক্ষায় পাস করা, আরেকটা হচ্ছে মৌখিক পরীক্ষায় পাস করা এবং আরেকটি গ্রুপকে চাকরির ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে এ তিনটাকে একসঙ্গে মিলানোর উপায় কী? এটা কি মিলানো সম্ভব? হাইকোর্টের দেওয়া রায় অনেক বেশি জটিলতা তৈরি করেছে। এনটিআরসিএ মাননীয় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে, এখন আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয় তার ওপর বাকি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অ্যাপিলেট ডিভিশনের রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত পাওয়ার আগে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।

এনটিআরসিএ মূলত ২০০৫ সাল থেকে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিবন্ধন পরীক্ষার আয়োজন করে। এ পর্যন্ত একটি বিশেষ পরীক্ষাসহ মোট ১৫টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা হয়েছে। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা এনটিআরসিএ আয়োজন করে থাকলেও নিয়োগ চূড়ান্ত করত সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএকে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নীতিমালায় বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক চাহিদা পাঠাবে এনটিআরসিএতে। সেখান থেকে নির্বাচিত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তালিকা পাঠানো হবে প্রতিষ্ঠানে। সে তালিকা থেকেই শিক্ষক নিয়োগ দেবে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ এখন শুধু শিক্ষকের নিয়োগপত্র জারি করবে।

এ পর্যন্ত দুটি গণবিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে দুই দফায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে এনটিআরসিএ। এতে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নিয়োগ পেয়েছেন প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষক। এখন তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তি জারির অপেক্ষায় এনটিআরসিএ।

শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে প্রিলিমিনারি। এতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের দ্বিতীয় ধাপে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।

পরবর্তী ধাপে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরপর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে সব পরীক্ষায় পাস করার পর যাঁদের বয়স ৩৫ অতিক্রম করে না, তারাই চাকরির যোগ্য বলে বিবেচিত হন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত