প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘অবশ্যই ধর্ষণের সঙ্গে টি-শার্ট পরে রাস্তায় বের হওয়ার সম্পর্ক আছে’

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে এবং এর জন্যে দায়ী নারীবাদীরা, জাতীয় সংসদে কথাগুলো বলেছেন বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাবলু। মাওলানা শফীর ‘তেঁতুল তত্ত্ব’রও বাস্তবায়ন চেয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে টেলিফোনে তার সঙ্গে কথা হয়েছে।

প্রশ্ন : ‘নারীবাদীদের কারণেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে’— আপনার এমন উপলব্ধির কারণ কী?

উত্তর: বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেছেন। এ বোর্ড ধীরে ধীরে নারী কল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের অধিকার আদায়ে সব সময়, বিশেষ করে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের একটি সুনির্দিষ্ট কৃষ্টি-সংস্কৃতি আছে। সংসদে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। এটাকে আমরা সবাই সময়োপযোগী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশে একটি সামাজিক রীতি-রেওয়াজ আছে।

নারীবাদী বলতে আমি যা বুঝিয়েছি সেটি যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে বা সাংগঠনিকভাবে আমলে নেয়, তাহলে তা সঠিক হবে না। ধর্মীয় অনুশাসনকে প্রাধান্য না দেওয়া বা সরকারের নীতিমালার বাইরে যাওয়ার কথা বলেছি। যেমন ধরেন, রাস্তাঘাটে বের হওয়ার সময় আমি যদি একটি সাবলীল পোশাক না পরি, গেঞ্জি পরে যদি চলাফেরা করি, সেটা বুঝিয়েছি।

প্রশ্ন: সাবলীল পোশাক বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

উত্তর: সাবলীল পোশাক বলতে, একজন যুবতী নারী যদি গেঞ্জি পরে রাস্তায় চলাফেরা করে, তাহলে কেমন হবে?

প্রশ্ন: এটা কি বাংলাদেশের আইন-বিরুদ্ধ হবে?

উত্তর: আইনের একটা বিষয় আছে, আর সামাজিক একটা বিষয় আছে।

প্রশ্ন: কোনো একজন নারী বা মেয়ে যদি টি-শার্ট পরে রাস্তায় বের হন, তাহলে তার অপরাধটা কী এবং এর সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ক কী?

উত্তর: অবশ্যই ধর্ষণের সঙ্গে টি-শার্ট পরে রাস্তায় বের হওয়ার সম্পর্ক আছে। আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবেই নারী ও পুরুষের মাঝে আকর্ষণের সৃষ্টি করেছেন। যখনই কোনো যৌবনপ্রাপ্ত নারী অশালীন পোশাকে রাস্তায় চলাফেরা করবে, তখন কু-রুচিসম্পন্ন মানুষ তাদেরকে কু-দৃষ্টিতে দেখবে।

প্রশ্ন: তাহলে তো সমস্যাটা কু-রুচিসম্পন্ন মানুষের?

উত্তর: কিন্তু, এই কু-রুচিটা সৃষ্টি হয় কোথা থেকে সেটা আমাদের সবাইকে দেখতে হবে।

প্রশ্ন: কোথা থেকে সৃষ্টি হয়?

উত্তর: এটা তো আপনাকে-আমাকে বুঝতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার কাছ থেকে বুঝতে চাইছি। নুসরাত, তনুরা হিজাব পরতেন, শরীর ঢেকে রাখতেন, টি-শার্ট পরতেন না। তারাও তো ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাহলে এর ব্যাখ্যা কী?

উত্তর: সবক্ষেত্রে একটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায় না। একটি সার্বিক বিষয় আছে। কু-রুচিসম্পন্ন মানুষগুলো যখন রাস্তাঘাটে বিভিন্নজনকে বা অনলাইনে বিভিন্ন খারাপ দৃশ্য, পর্নোগ্রাফি দেখে, তখন তার ভেতরটা কু-রুচি দিয়ে ভরে যায়। তাদের কু-রুচি তৈরি হয় এক জায়গায়, আর তারা তা প্রয়োগ করে অন্য জায়গায়।

প্রশ্ন: একজন নারী যদি হিজাব পরেন বা আপনি যেগুলোকে সাবলীল পোশাক বলছেন সেগুলো পরেন, তাহলেই কি সেই কু-রুচি দূর হয়ে যাবে?

উত্তর: না, দূর হবে না। তবে, কিছুটা অংশ লাঘব হবে।

প্রশ্ন: হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির প্রয়াত শাহ আহমদ শফীর ‘তেঁতুল তত্ত্ব’র বাস্তবায়নও আপনি চেয়েছেন।

উত্তর: মাওলানা শফী সাহেব যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেটা আপনিও জানেন আমিও জানি। পাশ্চাত্যের ফ্রি সেক্সের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির তুলনা করলে তো হবে না। আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা আছে। নারীবাদী বলে আমি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা ব্যক্তিকে বোঝাইনি।

প্রশ্ন: একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই দেশ ও দেশের বাইরের খবর ভালো রাখেন। পাশ্চাত্যের ফ্রি সেক্সের কথা বললেন, পাশ্চাত্যের কোন অংশকে আপনি ফ্রি সেক্সের দেশগুলোর মধ্যে ফেলছেন?

উত্তর: ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে আমরা স্পেনে গিয়েছি, ফ্রান্সে গিয়েছি।

প্রশ্ন: স্পেন ও ফ্রান্স ফ্রি সেক্সের দেশ?

উত্তর : প্রতিটি কথার যদি আভিধানিক অর্থ খোঁজেন, তাহলে কিন্তু হবে না। এটা হলো নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা, উন্মুক্ত চলাফেরা। সেখানে ১৮ বছরের পর একটা মেয়েকে তার মা-বাবাও আর শাসন করতে পারে না। আমাদের দেশে কিন্তু এটা চলে না। আমাদের একটা পারিবারিক ও সামাজিক নিয়মনীতি আছে, সেগুলো আমাদের মেনে চলা দরকার।

প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতির কথা বলছিলেন। বাংলাদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি কোনটা, শাড়ি, হিজাব নাকি জিনস বা টি-শার্ট?

উত্তর: আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি বলতে আমি শাড়ি বা টি-শার্টকে উদ্দেশ্য করে কিছু বোঝাতে চাইনি। ভদ্রোচিত পোশাকে চলাফেরা করাটাই হলো আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি।

প্রশ্ন: আপনি ‘ভদ্রোচিত’ বলতে যা বোঝাচ্ছেন, সেটা অনেকেই নাও বুঝতে পারেন। এই ‘ভদ্রোচিত’ পোশাক আসলে কোনগুলো?

উত্তর: শুধু কাপড়ের পোশাকটাই পোশাক না। আমদের চলাফেরাটাও কিন্তু পোশাকের আওতাভুক্ত। আমাদের মাথার চুল থেকে পায়ের জুতা পর্যন্ত সবই পোশাকের অন্তর্গত। শুধু পোশাক দিয়ে ভদ্রোচিতর মানদণ্ড নির্ধারণ করা যাবে না।

প্রশ্ন: এখন কি আমরা সেভাবে চলছি না?

উত্তর: অনেকে চলছি, কোথাও কোথাও এর ব্যত্যয় দেখতে পাই।

প্রশ্ন: সে কারণেই ‘তেঁতুল তত্ত্ব’র বাস্তবায়ন চাইছেন?

উত্তর: মা-বোনেরা যখন উন্মুক্ত পরিবেশে চলাফেরা করেন, তখন কু-দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ এটাকে খারাপভাবে নেন। শালীনভাবে আমরা চলাফেরা করব, বাইরের পরিবেশে চলার সময় নিজেদেরকে সুরক্ষার মধ্যে রেখে চলব, রূপ-লাবণ্য দেখে যেন বাইরের পুরুষ আকৃষ্ট না হয়, সেভাবে চলাফেরা করাটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি বাঞ্ছনীয়।

প্রশ্ন: এজন্যই আপনি ‘তেঁতুল তত্ত্ব’র বাস্তবায়ন চেয়েছেন?

উত্তর: ওই তত্ত্বটাকেই যে নিতে হবে, তা নয়। স্বাভাবিকভাবে কথাটি হলো, যেকোনো জায়গায় গিয়ে যদি আমাদের মা-বোনেরা নিজেদেরকে পোশাক, আচরণ, চলাফেরায় মার্জিতভাবে উপস্থাপন করেন, তাহলেই বিকৃত মনের মানুষগুলো আর সুযোগ পাবে না এবং ধর্ষণে উদ্বুদ্ধও হবে না।

প্রশ্ন: এতে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে বা কমে যাবে?

উত্তর: না, তবে শালীন থাকা আমাদের সবার জন্য উচিত। এর মাধ্যমে ধর্ষণ অবশ্যই অনেক কমবে। আর সেই সঙ্গে সরকার যেভাবে আইন প্রয়োগ করছে, তাতে ধর্ষণ আরও কমবে। শুধু আইন করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এই জঘন্য অপরাধ যেন না হয়, সেজন্য সামাজিকভাবেও চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন: ধর্ষণ-বিরোধী আইনে সঙ্গে শালীন পোশাকও কি আইনের মধ্যে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন?

উত্তর: আমাদের দেশে বিয়ের সময় মওলানা সাহেবরা বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে চলে যান। বিয়ের পাত্র-পাত্রীকে কিন্তু আলাদা করে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। তেমনি সরকার যখন একটি আইন করে, তখন সেটা বাস্তবায়ন করতে গেলে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সচেতন থাকতে হবে।

প্রশ্ন: আমরা যখন সচেতন না, সেক্ষেত্রে এটাকে আইনের মধ্যে এনে সবাইকে সচেতন করতে হবে বলে মনে করেন কি না?

উত্তর: আমাদের সচেতনতার সঙ্গে আইনের বাধ্যবাধকতা অবশ্যই সম্পৃক্ত থাকতে হবে।

প্রশ্ন: পোশাকের বিষয়টি তাহলে আইনের মধ্যে আনতে হবে?

উত্তর: না, এটা আমাদের নিজেদের বিবেচনায় আনতে হবে।

প্রশ্ন: যদি না আনি, তাহলে রাষ্ট্র কী করবে?

উত্তর: এটা তো তাহলে যে বিবেচনায় আনবে না তার ব্যাপার।

প্রশ্ন: তাহলে তো ধর্ষণ কমবে না!

উত্তর: কেউ যদি আইন না মানে, আইন-বহির্ভূত কোনো কাজ করে, তখন তো প্রশাসনের সব ব্যবস্থা আছে।

প্রশ্ন: একটু অন্য প্রসঙ্গে জানতে চাই। কিছু দিন আগে আপনি ফেসবুকে অস্ত্রের ছবি দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা কী? আপনার অস্ত্রের দরকার হচ্ছে কেন?

উত্তর: অস্ত্রের দরকার হচ্ছে বলে দিয়েছি, তা ঠিক না। নিজের নিরাপত্তার জন্য সংসদ সদস্য, ঠিকাদারসহ অনেকেই অস্ত্র রাখতে পারেন সরকারের অনুমতি নিয়ে। আমিও আমার নিরাপত্তার জন্য নিয়েছি। যে ছবিটি প্রকাশ পেয়েছে, সেটা ভালো করে দেখলে দেখতে পাবেন, শো-রুমে আমি সেই অস্ত্রটা নেড়েচেড়ে দেখছি মাত্র। এরই এক ফাঁকে আমার সঙ্গে যারা ছিল, তাদের মধ্যে কেউ একজন একটা ছবি তুলে দিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার আইডি থেকেই ফেসবুকে ছবিটি দিয়েছিলেন। আপনি যা বললেন, তার মানে কি এমন যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা যথেষ্ট নয় আপনাদের মতো সংসদ সদস্য বা ঠিকাদার বা অন্যদের জন্য। ফলে নিজস্ব অস্ত্র, নিজস্ব বাহিনী রাখতে হচ্ছে?

উত্তর: আপনি যে কথাটা বললেন, সেটা অতিরঞ্জিতই বলা চলে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক নয়, এই কথাটা সঠিক নয়। বাংলাদেশ পুলিশকে বর্তমান সরকার অত্যন্ত যুগোপযোগী করেছে। তারা সব সময়ের জন্য সজাগ।

প্রশ্ন: তাহলে ব্যক্তিগত অস্ত্র লাগে কেন?

উত্তর: আমরা জনপ্রতিনিধি। রাতের আঁধারেও যখন যেখানে যেতে হয় সেখানে আমরা যাই। সব সময় তো পুলিশ সঙ্গে থাকে না। এজন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্র দরকার হয়।

সূত্র : ডেইলি স্টার বাংলা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত