প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুজন মেহেদী হাসান: বয়কটের চেয়ে আত্মসমালোচনা জরুরি

সুজন মেহেদী হাসান: গত বছর আমি ‘পাবলিক রিলেশনস ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট” কোর্স নিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের শেখানো হয়েছিলো, যখন তোমার কোম্পানি বা কম্যুনিটির ওপর ক্রাইসিস আসে, তখন প্রথম কাজ হচ্ছে রিসার্চ করা। প্রথম রিসার্চ হবে, নিজের দোষ খতিয়ে দেখা বা আত্মসমালোচনা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে যখন আমাদের মুসলিম সমাজ বা আমাদের বাংলাদেশের ওপর কোন সঙ্কট আসে, তখন কি আমরা কোন ধরণের আত্মসমালোচনা করি? যে, কেন এমনটা হচ্ছে? না, আসলে করি না। কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের ধর্মই হচ্ছে যে কোন পরিণতির জন্য আমরা অন্যদেরকে দায়ী করার বাহানা খুঁজি।

আজ কার্বনডেল মসজিদে জুমার নামাজে ইমাম সাহেব একটি গল্প বলছিলেন। গল্পটি হলো, একজন সাধারণ আমেরিকানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো যদি পৃথিবীতে এলিয়েন আসে আর সমস্ত ভারতীয়দের মেরে ফেলে তাহলে কি হবে? আমেরিকান বললো, আইটি বা তথ্য প্রযুক্তি সেক্টর ধংস হয়ে যাবে। যদি সমস্ত চীনাদের মেরে ফেলে তাহলে কি হবে? আমেরিকান বললো, পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যাবে। যদি এলিয়েনরা সমস্ত ইহুদিদের মেরে ফেলে তাহলে কি হবে? আমেরিকান জানালো, পৃথিবীর ফাইন্সিয়াল সেক্টর বা অর্থ ব্যবস্থা ধংস হয়ে যাবে। শেষ প্রশ্ন করা হলো, যদি সমস্ত মুসলমানদের মেরে ফেলে? আমেরিকান বললো, মনে হয় কিছুই হবে না। ইমাম সাহেব বললেন, এ কারণেই আমরা দেখি মাত্র দুই কোটি ইহুদিদের ব্যাপারে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না, অথচ দুইশ কোটি মুসলমানকে খুব সহজেই আঘাত করা যায়। কারণ হচ্ছে এই পৃথিবীর কাছে মুসলমানরা ম্যাটার করে না।

ইমাম সাহেব বলছিলেন, আপনি পৃথিবীতে কী অবদান রাখছেন তার ওপর আপনার নেতার সম্মান নির্ভর করছে। আপনি যদি মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হন, আপনার নেতাও মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে। আপনি যদি নির্বোধ হন, আপনার নেতাকেও মানুষ অসম্মান করবে।

ইমাম সাহেব ইতিহাসের কিছু ঘটনা উল্লেখ করলেন। একসময় মুসলমানরা ম্যাটার করতো, তাই কলোনিয়ালাইজেশন এর সময় মুসলমানের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। এরপর মুসলমানরা উপনিবেশ শাসনে, সীমিত আকারে ধর্ম চর্চা করার সুযোগ পেত। এখনও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

তিনি ফ্রান্সের কথা বললেন, যেখানে মুসলমানরা বেশি গিয়েছে তার উপনিবেশগুলো থেকে। আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মালি এসব দেশ থেকে – সেদেশে শ্রমিক হিসেবে। একদিকে উপনিবেশবাদের ক্ষত অন্যদিকে দিনের পর দিন ফ্রান্স এসব লোকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে আসছে। সবমিলিয়ে ফ্রান্স তার কলোনিয়াল মানসিকতায় যেমন মুসলমানদের আপন করে নিতে পারেনি। নানাভাবে বঞ্চিত মুসলমানরাও ফ্রান্সের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে একাত্ন হওয়ার সুযোগ পায় নি। ইমাম সাহেব বলছিলেন, নানা ধরণের বাধা-বিপত্তির পরও যদি ফ্রান্সে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারতেন— তা হলে বারবার কেউ মুসলমানদের বা আমাদের নবীকে অসম্মান করার সাহস দেখাতো না।

ইতালিও দার্শনিক এন্তনিও গ্রামসি বলেছেন, সমাজের ধারণা বদলাতে বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন হয়। পৃথিবীতে ইসলামিক স্কলারের অভাব আছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সব কিছুতেই মুসলমানরা পিছিয়ে আছে। নোবেল পুরস্কারের তালিকা দেখলেই তা বুঝতে পারবেন। মেনে নিলাম, এটা পক্ষপাতদুষ্ট পুরস্কার। তাহলে পঞ্চাশটি মুসলিম দেশ মিলে মৌলিক আবিস্কারের জন্য একটা পুরস্কার চালু করে না কেন? চীনের উইঘুর ও ভারতের কাশ্মীরে মুসলমানরা নিষ্পেষিত হলেও কেউ টু-শব্দ করে না। শুধু তাই নয়, তারা একে অপরের সাথে লড়ছে। ইয়েমেনকে পোড়া মাটির দেশে পরিণত করেছে সৌদি আরব। আমরা ক’জন সৌদির এই কাজের নিন্দা করি, সৌদি পন্য বয়কট করি? ( কারণ বুঝি, সৌদি তেল বয়কট করলে আমরা নিজেরাই মুসকিলে পড়বো)। আমি বলতে চাই যে যতক্ষণ আপনি নিজে সংগঠিত, সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাশীল না হবেন ততক্ষণ আপনি বা আপনার নেতাকে মানুষ সম্মান করবে না। আপনার কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ আপনার ধর্ম ও আপনার নেতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

আমি ও আপনি যদি আমাদের না শোধরাই, শুধু গণমাধ্যমকে দোষ দিয়ে লাভ হবে না। তাতে ইসলামফোবিয়া আরও বাড়বে। ফ্রান্সের পণ্য বয়কট করার আগে, নিজে সৎ ও সহনশীল হোন। বাংলাদেশের লালমনিরহাটে একজন লোক কুরআন শরীফে পা দেয়ায় তাকে পিটিয়ে মেরে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায়-আমাদের সর্ম্পকে অমূসলমানরা কি ধারণা পেল? বুখারি শরীফে আছে-একবার এক লোক মদিনায় মসজিদে নববীতে প্রস্রাব করেছিলো। সাহাবীরা তাকে মারতে উদ্যত হলো। নবীজি সাঃ বললেন, পানি ঢেলে দাও। তোমাদের কাজ সমস্যা বাড়ানো নয়, সমস্যা সমাধান করা।

মুসলমানদের একজন কাউকে হত্যা করলে এর দায় সমস্ত মুসলমানদের ওপর পড়ে না। কিন্তু ফ্রান্স সরকার একটি অন্যায়দের বদলে আরেকটি অন্যায় শুরু করেছে। তারা আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ)কে ব্যঙ্গ করছে-যেটাকে তারা বলছে মত প্রকাশের অধিকার। তারা এটা করতে পারছে কারণ দুইশ কোটি মুসলমান তাদের ওপর কোন প্রভাব ফেলে না বলে তারা মনে করে। ফ্রান্সের অন্যায়ের প্রতিবাদের পাশাপাশি আমাদের আত্মসমালোচনাও করতে হবে। তবে কোন প্রতিবাদ যেন আরেকটি অন্যায়ে পরিণত না হয়। তাহলে ইসলামফোবিয়া আরও বাড়বে।

কার্ল মার্ক্স বলেছেন, সমাজের রুলিং ক্লাস শাসক শ্রেনি (বর্তমান সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড)সমাজের সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করেন। নিও মার্ক্সসিস্টরা এই ধারণার সাথে অনেক উপাদান যোগ করলেও এই ধারণা বাতিল করতে পারেন নি। তার মানে হচ্ছে এই যে দেশে দেশে সাধারণ মানুষের যে প্রতিবাদ হচ্ছে বা বয়কট হচ্ছে তা যতটা না প্রভাব পড়বে, তারচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তো দেশি পঞ্চাশটিরও বেশি মুসলিম দেশের সরকার প্রধান ফ্রান্সের কর্মকান্ডের নিন্দা ও ক্ষোভ জানাতেন। এক এরদোগানের মন্তব্যেই ম্যাক্রো’র গায়ে বড় ফোস্কা পড়েছে।

ইসলামে ভালো মুসলমান বলতে বোঝায় ভালো মানুষ হওয়া, উন্নত মানুষ হওয়া। উন্নত মানুষ হতে হলে আপনাকে একদিকে আচরণে ও অন্যদিকে জ্ঞান চর্চায় উন্নত হতে হবে। আমরা রাতারাতি মূসলমানদের প্রতি বিশ্ববাসীর আচরণের পরিবর্তন দেখতে পাবো না। তবে যদি সবাই আত্মসমালোচনা করি, নিজেদের শোধরাই, লেখাপড়ায় মনোযোগী হই—আমাদের আচরণের মাধ্যমেই আমাদের নবীর (সাঃ) সম্মান ছড়িয়ে পড়বে—আমি এটাই বিশ্বাস করি। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত