প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লিজিংয়ের ১০ হাজার কোটি টাকা লুট

ডেস্ক রিপোর্ট: একটি কম্পিউটারে নামসর্বস্ব একাধিক কাগুজে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে তার মাধ্যমে রাতারাতি লিজিং প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের অর্থ লোপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি শক্তিশালী চক্র এভাবে ‘ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কোম্পানি’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশ রূপান্তর

চক্রটি এসব অর্থ পাচার করেছে ভারত, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে। প্রতিবেদন পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানকে এ বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। ইতিমধ্যে এসব অর্থ পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে কমিশন।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলো জামানতবিহীন, কাগুজে জামানত ও নামমাত্র স্থাবর জামানতের বিপরীতে এসব ঋণ বিতরণ করায় তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রের অন্তত ২২ জন শনাক্ত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ এ বিষয়ে শিগগিরই কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করবেন তদন্ত কর্মকর্তা। কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত নথিতে বলা হয়, চক্রটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কোম্পানির প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লুট করে। একই চক্র প্রায় ৩০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে এফএএস ফাইন্যান্স, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও পিপলস লিজিং থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২২০০ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা এবং পিপলস লিজিং থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে নামমাত্র জামানত থাকায় তা আদায় নিয়ে খোদ কর্মকর্তারা সংশয়ে রয়েছেন।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রটি শুধু একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে কাগুজে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে তার মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ লুট করেছে। চক্রের সদস্য প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার সিঙ্গাপুর, ভারত ও কানাডায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। চক্রের কিছু সদস্য বিদেশে আত্মগোপন করলেও অনেকেই দেশে আছেন, যাদের কাছে রয়েছে বিপুল অর্থ।

বিএফআইইউ কর্মকর্তারা জানান, অর্থ লোপাটে জড়িত চক্রের ২০ থেকে ২২ সদস্য। এদের মধ্যে একজন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক এ কে এম শহীদ রেজা। তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নামে লুট করা হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা। নামস্বর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সাতটি হিসাব থেকে ৩৩টি চেকের মাধ্যমে ওয়ান ব্যাংক চট্টগ্রামের স্টেশন রোড শাখার গ্রাহক এবং ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফান আহমেদ খানের জেকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে সরানো হয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। এমটিবি মেরিন লিমিটেডের নামে থাকা ঋণের বিপরীতে সরানো হয় ৬০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির এমডি স্বপন কুমার মিস্ত্রির স্ত্রী পূর্ণিমা রানী হালদারসহ কয়েকজন এ টাকা তুলে নেন। অথচ এমটিবি মেরিন লিমিটেডের ঋণ সংস্থাটির কোনো হিসাবে জমা হওয়ার নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঋণের টাকা কয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে সরানো হয়।

দুদকে দেওয়া বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক শহীদ রেজার মালিকানাধীন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পদ্মা ওয়েভিং লিমিটেড, পদ্মা ব্লিচিং লিমিটেড ও ফ্যাশন প্লাস লিমিটেডের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে থাকা হিসাবে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা সরানো হয়েছে। ৯টি চেকের মাধ্যমে অলোক কুমার দাস ও অনিতা দাসের মালিকানাধীন প্যারামাউন্ট অ্যাগ্রো লিমিটেড এবং তাদের ছেলে রঙ্গন দাসের হিসাবে ২০১৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সরানো হয় ১৪ কোটি টাকা, যা দিয়ে মেঘনা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান শাখায় আটটি এফডিআর খোলা হয়। এমটিবি মেরিন লিমিটেডের নামে বরাদ্দ ঋণের টাকা থেকে ওকায়ামা লিমিটেড নামে আইএফআইসি ব্যাংক বারিধারা শাখায় হিসাব নম্বর ০১০২৪৬৫০০৩৬০০১-এ সরানো হয় তিন কোটি টাকা। এমটিবিএলে অটোপ্লেক্স লিমিটেডের হিসাব নং-০০০৮০২১০০১৮৮১০-এ চারটি চেকের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই সরানো হয় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। একই ঋণের বিপরীতে সৈয়দ মুনিবর রহমানের নামে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল), ধানমণ্ডি শাখার ১০৬১৪৩০২৯৭৫১৭ নম্বর হিসাবে সরানো হয় চার কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৭ সালের ৫ মার্চ এক কোটি টাকা করে স্থানান্তর করা হয় সৈয়দা শাহজাদী রহমানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ১৮১২৩৭৫২৭০১ নম্বর হিসাবে, সৈয়দা জাহানারা খানের ইবিএল ধানমণ্ডি শাখার হিসাব নং-১০৬১৪৩০৩০৭৪৭২, সৈয়দ মিজানুর রহমান; নিনা রহমান জামালীর ইবিএল ধানমণ্ডি শাখার ১০৬১৪৭০৩০৬৬৬২ নম্বর হিসাবে। ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড স্টেশন রোড চট্টগ্রাম শাখায় ইরফান আহমেদ খানের মালিকানাধীন জেকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ০৭৪১-০২০০০১৪২৬ নম্বর হিসাবে ২০১৭ সালের ১ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত সাতটি চেকের মাধ্যমে সরানো হয় ১১ কোটি টাকা।

বিএফআইইউর তথ্য বলছে, কোলাসিন লিমিটেডের চেয়ারম্যান অতশী মৃধা, যিনি প্রতিষ্ঠানটির এমডি উত্তম কুমার মিস্ত্রির স্ত্রী। অতশী মৃধা ও উত্তমের ভাই স্বপন কুমার মিস্ত্রি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে চলতি মূলধন হিসেবে ৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন। এই ঋণ কোলাসিনের নামে ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদিত হয়। কিন্তু অর্থ কোলাসিনের হিসাবে স্থানান্তরিত না করে ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ন্যাচার এন্টারপ্রাইজের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অন্যতম অংশীদার ও তাদের মনোনীত দুজন পরিচালক কোলাসিনের পর্ষদ সদস্য। তাদের নামে সরিয়ে নেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ২৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই টাকা দিয়ে ন্যাচার এন্টারপ্রাইজের একটি ঋণ (টিএল-৫০৮১২) সমন্বয় করা হয়। ঋণের টাকা থেকে চারটি চেকের মাধ্যমে ১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের মতিঝিল শাখায় ইবিএল সিকিউরিটিজে স্থানান্তর করা হয়। ইবিএল সিকিউরিটিজের হিসাব নং-২১২২০০০৩০৫৩-এ ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৫ ও ২৩ অক্টোবর এই টাকা স্থানান্তর করা হয়। এছাড়া ২০১৭ সালের ৮ ও ৯ মে ওয়ান ব্যাংকের লোকাল কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয় যথাক্রমে ৩ কোটি ৪০ লাখ ও ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুটি চেকের মাধ্যমে প্যারামাউন্ট স্পিনিং লিমিটেডের পরিচালক অলোক কুমার দাশ, অনিতা দাশ, শাখাওয়াত হোসেন ও অনিতা হকের নামে এবং ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল তিনটি চেকের মাধ্যমে প্যারামাউন্ট হোল্ডিং লিমিটেডের নামে সরানো হয় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ওয়ান ব্যাংক চট্টগ্রামের স্টেশন রোড শাখায় ইরফান আহমেদ খানের মালিকানাধীন জেকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর ও ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি সরানো হয় চার কোটি টাকা।

নথি থেকে আরও জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে শঙ্খ বেপারির মালিকানাধীন মুন এন্টারপ্রাইজের নামে চলতি মূলধন হিসেবে ৮৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা সরানো হয়। মুন এন্টারপ্রাইজ এ ঋণ নিলেও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক নওশের-উল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মার্কো ট্রেডের নামে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড পরিচালিত দুটি ঋণ হিসাবে এই টাকা স্থানান্তর করা হয়। টিএল-৯২৮১৫ ও টিএল-৪৫৯১২ নম্বরের হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ ২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা সমন্বয় করা হয়। ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনটি চেকের মাধ্যমে ১৫ কোটি ব্র্যাক ব্যাংকে থাকা সিগমা ক্যাপিটাল মানেজমেন্টের হিসাবে (১৫২০২০২১৫৮২৯৬০০১) সরিয়ে নেওয়া হয়। একই বছর ৫ সেপ্টেম্বর ও ৮ সেপ্টেম্বর ছয় কোটি টাকা ব্যাংক এশিয়ায় থাকা হাল ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছয়টি চেকের মাধ্যমে অলোক কুমার দাস, অনিতা দাসের মালিকানাধীন প্যারামাউন্ট স্পিনিং লিমিডেট ও তাদের ছেলে রঞ্জন দাসের ব্যাংক হিসাবে সরানো হয়। রঞ্জন দাসের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হিসাব নং-১১২-৯১২-১১৫৪৩১৩০৯; মেঘনা ব্যাংকে ১১০১২৫৩০০০০১৮২৪৩ নম্বর হিসাব ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ১৫০৩৫০০০১০০২২ নম্বর হিসাবে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। ব্যাংক এশিয়ার ধানমণ্ডি শাখায় মুন এন্টারপ্রাইজের হিসাব নং-০২১-৩৩০০১৫৭৯-এ বিভিন্ন সময়ে স্থানান্তর করা হয় ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে ওই হিসাব থেকে ১৫ কোটি টাকা প্রথমে হাল ইন্টারন্যাশনালে ও পরে সিগমা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নামে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের হিসাবে সরানো হয়।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রে রয়েছেন অমিতাভ অধিকারী ও উজ্জ্বল কুমার নন্দীর নাম। উজ্জ্বল কুমার নন্দী পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং অমিতাভ অধিকারী পিপলস লিজিংয়ের পরিচালক হিসেবে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। পিপলস লিজিং থেকে রেপটাইল ফার্মের চেয়ারম্যান শিমু রায়, এমডি রাজিব সোম, পরিচালক মোস্তাসিন বিল্লাহ ও উজ্জ্বল কুমার নন্দীর নামে ৬৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১৬ জুন আট কোটি টাকা ও ২৮ জুন দুই কোটি টাকা ব্যাংক এশিয়ার ধানমণ্ডি শাখায় উজ্জ্বল কুমার নন্দীর হিসাব নং-০২১-৩৪০০-৯০৯৯ এবং অমিতাভ অধিকারী হিসাবে একই ব্যাংকের ০২১-৩৪০০-৯০৯২ নম্বর হিসাবে সরানো হয়। ২০১৬ সালের ২৩ জুন ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের হিসাবে সরানো হয়। ওই টাকা দিয়ে ইমেক্সো নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ঋণ হিসাব (টিএল-৬০৫১৩) সমন্বয় করা হয়। ঋণের অবশিষ্ট অর্থের বড় অংশ শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড শাখায় স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই টাকা এঅ্যান্ডবি ট্রেডিং, ক্লিসটন ফুড অ্যান্ড একমোডেশন, এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রেপটাইল ফার্মের ৯৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে কাগুজে প্রতিষ্ঠান পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনালের নামে, যার পরিচালক উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও অমিতাভ অধিকারী। উজ্জল মল্লিক ও সোমা ঘোষ তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেন। ৯টি চেক ব্যবহার করে এফএএস ফাইন্যান্সের হিসাবে ২০১৬ সালের ২৯ জুন ৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। একই বছরের ২৯ জুন ১২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে সরানো হয়। ওই টাকা দিয়ে এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে পরিচালিত একটি ঋণ হিসাব (টিএল-৫৬৩১৩) সমন্বয় করা হয়। ১০ কোটি টাকা ব্যাংক এশিয়ায় থাকা পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনলের হিসাবে সরানোর পর ওই টাকা ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ২৯ জুন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে থাকা রেপটাইল ফার্মসের ৪০৩২১১১০০০০৫৫৯৮ নম্বর হিসাবে সরানো হয়। একই বছর ২৫ জুলাই ঋণের ছয় কোটি টাকা রেপটাইল ফার্মসের ৪০৫০১১১০০০২১ নম্বর হিসাবে সরানো হয়। এভাবে বিভিন্ন নামে নেওয়া অর্থ ব্যাংক এশিয়ায় থাকা পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনালের ৪০০৭১১১০০০১১৫৭৮ ব্যাংক হিসাবে ৭০৮ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করা হয়, যা বিভিন্ন সময় তুলে নিয়ে পাচার করা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা বিষয়টিকে অর্থপাচার আইনে অপরাধ বলছেন।

বিএফআইইউর নথি থেকে আরও জানা যায়, হাল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক স্বপন কুমার মিস্ত্রি ও এমডি অভিতাভ অধিকারী ব্যবসা সম্প্রসারণের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা পরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। একইভাবে আর্থস্কোপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিরা দেউরি ও এমডি প্রশান্ত দেউরি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নেন ৭৫ কোটি টাকা। এফএএস লিজিং থেকে তারা আরও ৭৫ কোটি টাকা লুট করেন। নিউট্রিক্যাল লিমিটেডের মালিক স্বপন কুমার মিস্ত্রি ও কাজী মমরেজ মাহমুদ লুট করেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৮০ কোটি টাকা। একইভাবে তারা এফএএস লিজিং থেকেও প্রায় ৮০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে আনান কেমিক্যালের মালিক অমিতাভ অধিকারী, পূর্ণিমা রানী হালদার, রাজিব সোম, রতন কুমার বিশ্বাস ও ওমর শরীফ কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে লুট করেছেন ৭১ কোটি টাকা। একইভাবে তারা এফএএস লিজিং থেকেও প্রায় ৭১ কোটি টাকা লুট করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস থেকে থেকে কাগুজে প্রতিষ্ঠান কণিকা এন্টারপ্রাইজের মালিক রাম প্রসাদ রায় নেন ১৬২ কোটি টাকা।

বিএফআইইউর তথ্য বলছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে কাগুজে প্রতিষ্ঠান সিগমা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের মালিক ইরফান উদ্দীন আহমেদ, শাহনাজ বেগম ও জামিল মাহমুদ নিয়েছেন ৪০ কোটি টাকা। একইভাবে তারা এফএএস লিজিং থেকেও সমঅঙ্কের অর্থ তুলে নিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ইমেক্সোর মালিক ইমাম হোসেন নেন ৬৯ কোটি টাকা। একইভাবে তিনি এফএএস লিজিং থেকেও সমপরিমাণ অর্থ তুলে নেন। সুখাদা প্রোপ্রার্টিজের মালিক দুই ভাইÑ অভিজিত অধিকারী ও অমিতাভ অধিকারী ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নিয়েছেন ৭০ কোটি টাকা। একই পরিমাণ অর্থ তারা এফএএস লিজিং থেকেও নিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে সন্দ্বীপ করপোরেশনের মালিক স্বপন কুমার মিস্ত্রি নিয়েছেন ৫৫ কোটি টাকা। এফএএস লিজিং থেকেও তিনি আরও ৫৫ কোটি টাকা নিয়েছেন। উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিডেটের মালিক অনিন্দিতা মৃধা (সুকুমার মৃধার মেয়ে) ও সুকুমার সাহা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নিয়েছেন ৬৯ কোটি টাকা এবং এফএএস লিজিং থেকেও নিয়েছেন সমপরিমাণ অর্থ। গ্রিনলাইন ডেভলপমেন্টের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন ও এমডি মিলন কুমার দাশ ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬৫ কোটি এবং এফএএস লিজিং থেকে একই পরিমাণ অর্থ তুলে নেন। মেসার্স বর্ণের মালিক অনঙ্গ মোহন রায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নেন ৬৭ কোটি টাকা এবং এফএএস লিজিং ও রিলায়েন্স থেকেও একই পরিমাণ অর্থ সরিয়ে আত্মসাৎ করেন। এছাড়া রহমান কেমিক্যালসের মালিক উজ্জল কুমার নন্দী, এমডি রাজীর সোম, তার সহযোগী স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অমিতাভ অধিকারী, কাজী মমরেজ মাহমুদ ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নিয়েছেন ৫৫ কোটি টাকা। একইভাবে তারা এফএএস এবং রিলায়েন্স থেকেও সমপরিমাণ অর্থ লুট করেন। নর্দান জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির মালিক উজ্জ্বল কুমার নন্দী, অমিতাভ অধিকারী, কাজী মমরেজ মাহমুদ, ইকবাল সাইদ, অরুন কুমার কুণ্ডু ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৩০ কোটি টাকা এবং এফএএস লিজিং ও রিলায়েন্স থেকেও সমপরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন। এছাড়া সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও সিমটেক্স টেক্সটাইলের মালিক সিদ্দিকুর রহমান, মাহফুজা রহমান বেবী, ইনসান আলী শেখ ও হাফিজা খানম ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ১২২ কোটি টাকা সরিয়ে নেন। একইভাবে এফএএস লিজিং ও রিলায়েন্স থেকেও তারা সমপরিমাণ অর্থ সরান। এমজে ট্রেডিংয়ের মালিক এনএম পারভেজ চৌধুরী ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে সরিয়ে নিয়েছেন ৫৫ কোটি টাকা।

বিএফআইইউর তথ্যমতে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে আলিফ অ্যাসেট ম্যানজমেন্টকে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজকে ২০৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, পিএফআই সিটিকিউরিটিজকে ৭৭ কোটি ৬ লাখ টাকা, প্রাইম ফিনান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা ও সিগমা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এসব ঋণ বিতরণের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জামানত নেওয়া হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে কাগুজে জামানত বা সামান্য জামানত নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পরিচালক বলেন, ‘লিজিং প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই এ বিষয়ে কমিশনে মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।’

সর্বাধিক পঠিত